একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

প্রকাশিতঃ 11:04 am | October 23, 2022

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার :

১৪ অক্টোবর ২০২২ যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের গণহত্যা চালিয়েছে উল্লেখ করে একটি রেজুলেশন আনা হয়েছে। ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি’ নামে ওই রেজুলেশন উত্থাপন করেন স্টিভ ক্যাবট। তার ওই রেজুলেশনে একাত্তর সালে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে যে গণহত্যা চালানো হয়েছে তার স্বীকৃতি প্রদানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি তার আনা ওই রেজুলেশনে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহবানও রয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানের বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া, যেসব অপরাধী বেঁচে আছে তাদের বিচারের দাবি ওই রেজুলেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশে একাত্তর সালে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে বলে যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করছে তা আদায়ে স্টিভ ক্যাবট উত্থাপিত উপযুক্ত রেজুলেশন সহায়ক হবে, এটি সত্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের গণহত্যার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বাংলাদেশকে আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। তখন বহু তথ্য-উপাত্ত গবেষণাকর্ম উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিবছর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা নিয়ে অসংখ্য বই প্রকাশ হলেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্য হবে এমন সায়েন্টিফিক প্রকাশনা হওয়ার ঘটনা বিরল।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা নিয়ে সাম্প্রতিক যেসব গবেষণা আমার চোখে পড়েছে তার অধিকাংশই ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ’ পর্যন্ত। ওইসব গবেষণার দৌড় শাহবাগ পর্যন্ত। বাংলাদেশের বাইরে আন্তর্জাতিক একাডেমিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে এমন প্রকাশনা খুবই কম। এই ব্যর্থতার কারণ অবশ্যই গবেষণা পদ্ধতি ও গবেষণার মানের দুর্বলতার কারণে হয়েছে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে যারা একাত্তরে বাংলাদেশের গণহত্যা অস্বীকার করতে চায় তারা দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। তারা জানে আজ হোক কাল হোক বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতির দাবি নিয়ে লড়বে। তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে তথ্য-উপাত্ত ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানের ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য গবেষণা কর্ম। তাই বাংলাদেশের গণহত্যা অস্বীকারকারী পাকিস্তানপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ওই বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজ করছে। শর্মিলা বসুর ‘ডেড রেকনিং: ১৯৭১ এর বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি’ বইটি প্রকাশ পাকিস্তানপন্থীদের ওই প্রজেক্টের অন্যতম অংশ।

আজ আন্তর্জাতিক একাডেমিয়ায় বাংলাদেশের গণহত্যা বিরোধী যেসব কথাবার্তা হচ্ছে তার ভিত্তি গড়ে দিয়েছে শর্মিলার এই গ্রন্থ।

বাংলাদেশের দরকার ছিল শর্মিলার গ্রন্থ প্রকাশিত হবার পর কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করা, তাহলে আজকে সহজে বাংলাদেশের গণহত্যার বিপক্ষে যেসব প্রচারণা হচ্ছে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক পাকিস্তানি বিহারী নারী ধর্ষণ ও হত্যার বিষয়টি উত্থাপিত হচ্ছে, তার পাল্টা জবাব দেওয়া বাংলাদেশের জন্য সহজ হতো। শর্মিলার উপযুক্ত বইয়ের কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করার বাংলাদেশের সরকারি তরফে কোনও তৎপরতা না থাকায় অন্য পাকিস্তানপন্থীরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরের গণহত্যাকে বিকৃত করার নতুন নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করার সুযোগ পাচ্ছে। ‘রিফিউজি’ বইটি তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ।

বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে কোনও উদ্যোগ না নেওয়া হলেও আমি ব্যক্তিগতভাবে শর্মিলা বসুর চিন্তাধারার কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা করেছিলাম আমার লেখা ‘একাত্তরের নারী নির্যাতন সম্পর্কিত শর্মিলা বসুর চিন্তাধারার পুনর্মূল্যায়ন’ শীর্ষক প্রবন্ধে। ২০১২ সালে সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল আয়োজিত সেমিনারে এই প্রবন্ধ উত্থাপন করি এবং পরবর্তী সময়ে ওই প্রবন্ধটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলা অনুষদের গবেষণা জার্নালেও প্রকাশিত হয়। ইচ্ছে ছিল, শর্মিলা বসুর উত্থাপিত সব প্রশ্ন ও বক্তব্যের জবাব দিয়ে কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করে ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় বই প্রকাশ করা। ফান্ডের অভাবে তা শেষপর্যন্ত সম্ভব হয়নি। কারণ ওই কাজ করার জন্য শর্মিলা বসুর মতো ফিল্ডে যাওয়া এবং দেশ-বিদেশের আর্কাইভ ও লাইব্রেরি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। আর অমনটি করা সম্ভব হলেই তখন তা কাউন্টার ন্যারেটিভ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। তাই আপাতত একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করার মাধ্যমেই আমার ওই ইচ্ছের ইতি টানতে হয়েছে। অবশ্যই যারা পাকিস্তানপন্থীদের হয়ে লিখতে চায় তাদের দেশে ও বিদেশে ফান্ডের অভাব হয় না বোধ হয়। এটাই সম্ভবত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার চরম ট্র্যাজেডি। যারা মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার প্রকৃত ইতিহাস চর্চা করতে চায় তাদের পক্ষে ফান্ড জোগাড় করা সত্যি কঠিন।

দুই.

আজ পাকিস্তানপন্থী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয় মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক পাকিস্তানি নারী হত্যা ও ধর্ষণের যে অভিযোগ উত্থাপন করা হচ্ছে তা হঠাৎ করে তারা করছে বিষয়টি এমন নয়। পাকিস্তানপন্থী একাডেমিশিয়ানরা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক একাডেমিয়ায় ওই বিষয়ে কথা বলছেন। তারা জানে, বাংলাদেশের গণহত্যার দাবিকে কলঙ্কিত করতে হলে অমন পাল্টা অভিযোগ উত্থাপন করা দরকার। শর্মিলা বসুর লেখা ‘ডেড রেকনিং’ গ্রন্থ ওই পাল্টা অভিযোগের ন্যারেটিভের মূল ভিত্তি, যা আজ পাকিস্তানপন্থীরা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।

শর্মিলা বসুর বই ও প্রবন্ধ পড়ায় এর ভবিষ্যৎ অপব্যবহার উপলব্ধি করে আমার প্রবন্ধে লেখিকাসহ পাকিস্তানিদের মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত নারী হত্যা ও ধর্ষণের দাবি বাতিল করে কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করেছি। কিন্তু আমার ওই একটি গবেষণা প্রবন্ধই এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। বরং দরকার শর্মিলা বসুসহ ওই বিষয়ে লিখিত সব ন্যারেটিভের বিপরীত কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করা এবং তা ইংরেজি ভাষায় লিখে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রকাশ করা। আর এমনটি অসম্ভব নয়, বাংলাদেশের একাত্তরের গণহত্যাকে কলঙ্কিত করা শর্মিলা বসুর ন্যারেটিভসহ অন্য পাকিস্তানপন্থী বুদ্ধিজীবীদের বিপরীত ন্যারেটিভ তৈরি করার মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত আছে। এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও ফান্ড। অবশ্যই তার জন্য নতুন করে ফান্ড বরাদ্দের প্রয়োজন নেই বরং প্রচলিত বরাদ্দকৃত ফান্ডকে যথাযথভাবে ব্যবহার করলেই হবে।

খোঁজ নিলে দেখা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চার জন্য সরকারের তরফ থেকে অনেক প্রকল্প প্রায়ই অনুমোদন করা হয়। বিভিন্ন জাদুঘর বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে যেসব ফান্ড দেওয়া হয় তার প্রায় অনেকগুলোই দায়সারা গোছের কাজে ব্যয় হয়। অনেকগুলো তো নিম্নমানের প্রকাশনা দিয়ে শেষ হয়। আন্তর্জাতিক একাডেমিয়ায় গ্রহণযোগ্যতা পায় না বা পাওয়ার মতো কোনও গবেষণাও ওই সব ফান্ড দিয়ে হয়েছে এমন দাবি করা কঠিন।

খুলনায় প্রতিষ্ঠিত একটি গবেষণা কেন্দ্র থেকে প্রতি বছর ডজন-ডজন বই প্রকাশ করা হচ্ছে। ওই বই প্রকাশের জন্য তারা যাকে তাকে ধরে এনে ইতিহাসবিদ বানিয়ে দিচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে তাদের ওই কাজ গণহত্যার ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠিত করছে বলে মনে হলেও দুর্বল গবেষণা পদ্ধতির কারণে তাদের ওই কাজ মূলত বাংলাদেশ বিরোধীদের হাতকে শক্তিশালী করছে। কিন্তু তারা ইতিহাস গবেষণার গুরুত্ব না বোঝার কারণে ইতিহাসবিদদের বদলে অন্যদের দিয়ে ইতিহাস লেখার কারণে তাদের কাজগুলো খুবই দুর্বলমানের হচ্ছে, যা শেষবিচারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার ইতিহাস চর্চার ক্ষতি করছে। তাই ইতিহাসবিদসহ সবার উচিত হবে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা। মৌলিক ইতিহাস গবেষণা বোঝে, ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারে এমন ব্যক্তি ছাড়া গণহত্যার ইতিহাস চর্চায় যাকে তাকে যুক্ত না করা।

প্রতিবছর মুক্তিযুদ্ধের ওপর, একাত্তরের গণহত্যার ওপর হাজার হাজার বই লিখে গবেষণা পরিচালনা করে কোনও লাভ নেই। বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একাত্তরের গণহত্যার দাবি আদায়ের জন্য কী ধরনের লিটারেচার প্রয়োজন তা সবার আগে জানা দরকার। অতঃপর ওই বিষয়টি মাথায় রেখে ফান্ড প্রদান, গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশ করা দরকার। সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে শর্মিলা বসুর মতো যেসব বাংলাদেশের গণহত্যা বিরোধী লিটারেচার, ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে তার তালিকা করে কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করা।

উপযুক্ত কাজের জন্য এখনই দেশি-বিদেশি যোগ্য একাডেমিশিয়ানদের গবেষণা কর্মে নিয়োগ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের একাত্তরের গণহত্যার পক্ষের লিটারেচার ও ন্যারেটিভ প্রচার করা। সময় গেলে সাধন হয় না। একবার যদি বাংলাদেশ বিরোধীদের ন্যারেটিভ আন্তর্জাতিক একাডেমিয়া গ্রহণযোগ্যতা পায় তবে তার বিপরীত ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করা বেশ কঠিন হবে। ইতিহাস চর্চা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মতো নয় যে, সকালে আবিষ্কৃত প্রযুক্তির চেয়ে উন্নত মানের প্রযুক্তি বিকেলে আবিষ্কৃত হলে তাই সার্বজনীনভাবে গৃহীত হবে। ইতিহাসের ন্যারেটিভ একাডেমিয়ায় স্বীকৃতি পেতে বেশ সময় লাগে। তার জন্য একাডেমিয়া পরিসর ও জনপরিসর তৈরি করা লাগে।

তাই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের একাত্তরের গণহত্যা বিরোধী যেসব লিটারেচার বা ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে তার কাউন্টার লিটারেচার ও ন্যারেটিভ তৈরি করা অতি জরুরি। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, শুধু কাউন্টার ন্যারেটিভ বা লিটারেচার তৈরি করলেই হবে না তা অবশ্যই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি করতে হবে। ওই কারণে যারা প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক গবেষণা বোঝেন, মৌলিক ন্যারেটিভ তৈরি করার মতো মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতা রাখেন তাদেরকে দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। অন্যথায় দুর্বল যুক্তি ও তথ্য-উপাত্ত নির্ভর গবেষণা প্রতিপক্ষের দাবিকেই প্রতিষ্ঠিত করবে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিহাস চর্চাকে নিয়ে যেতে হবে। তথ্য-উপাত্ত ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা ও ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারলেই বাংলাদেশ গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির যে দাবি করছে, তা আদায় করা সম্ভব হবে। মনে রাখা দরকার, অ্যাকটিভিস্টরা দাবি উত্থাপন করে কিন্তু দাবি আদায়ের জন্য যে তথ্য-উপাত্ত ভিত্তিক ন্যারেটিভ, লিটারেচার লাগে তা গবেষকদের নিকট থেকে আসে। তা হঠাৎ করে হয় না, দীর্ঘসময় ধরে ওই বিষয়টি পরিকল্পিতভাবে চর্চা করতে হয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email