সংবাদ সম্মেলনে চেনা স্টাইলে প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিতঃ 11:30 pm | October 06, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ও যুক্তরাজ্য সফর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলন। চেনা স্টাইলেই সংবাদ সম্মেলনে সফরের আদ্যোপান্ত উপস্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের সরাসরি জবাবও দিলেন। মূলত প্রশ্নোত্তর পর্ব থেকেই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জানা গেলো আগামী দিনের বাংলাদেশের গতি প্রকৃতি। উঠে এলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত, র‌্যাবের নিষেধাজ্ঞা, আগামী বছরে বিশ্বব্যাপী মহাসঙ্কট, সরকারের প্রস্তুতি ও সব দলের অংশগ্রহণে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে তাঁর প্রত্যাশার কথা।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে : প্রধানমন্ত্রী

সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন ভোটের আগে কোন সংলাপ হবে না। বৃহস্পতিবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে গণভবনে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলন মঞ্চে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন উপস্থিত ছিলেন।

রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে প্রস্তুত
রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগের একজন কাউন্সিলরও না চাইলে তিনি কোনোদিনও পদে থাকবেন না।
তিনি নিজেও আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্ব চান উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, আওয়ামী লীগের একটি কাউন্সিলরও যদি বলে আমাকে চায় না, আমি কোনোদিনও থাকবো না। যেদিন আমার অবর্তমানে আমাকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট করেছিল তখন থেকেই এই সত্যটা মেনে যাচ্ছি। এটা ঠিক দীর্ঘদিন হয়ে যাচ্ছে। আমি চাই নতুন নেতৃত্ব আসুক। নেতৃত্ব কাউন্সিলররা নির্বাচিত করেন। তাদের সিদ্ধান্তটাই চূড়ান্ত। আর আমার তো আসলে সময় হয়ে গেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে আর্থসামাজিক অগ্রগতি করে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা দিয়ে যান। এই স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদার স্বীকৃতি কিন্তু জাতিসংঘই দিয়েছিল। এরপরে দেশে হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্রের রাজনীতি হয়েছে। ক্ষমতা ছিল বন্দি, গণতন্ত্র ছিল না। ছিল মার্শাল ল, মিলিটারি শাসন, কারফিউ ইত্যাদি ইত্যাদি।

আরও পড়ুন: সন্ত্রাসীদের মদত দিতেই কী যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রীর

আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে এনেছেন উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আমরা গণতন্ত্র উদ্ধার করি। আমরা একটানা তিনবার ২০০৯ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় আছি, গণতান্ত্রিক ধারা বাংলাদেশে অব্যাহত আছে। এর বাইরে অনেক চড়াই-উতরাই, খুন-খারাবি, অগ্নিসংযোগ, অগ্নিসন্ত্রাস অনেক কিছু হয়েছে। এরপরেও আমরা ক্ষমতায় ছিলাম বলে আজ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এই সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। এখন বিদায় নেওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত।

সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের প্রত্যাশা
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করবে বলে প্রত্যাশার কথা জানান সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, নির্বাচন বিষয়টা রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত। কে নির্বাচন অংশগ্রহণ করবে, কে করবে না; এখানে আমরা তো কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না। রাজনীতি করতে হলে দলগুলো সিদ্ধান্ত নেবে। হ্যাঁ আমরা অবশ্যই চাই যে, সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। কার কোথায় কতটুকু যোগ্যতা আছে; অন্তত আওয়ামী লীগ কখনো ভোট চুরি করে তো আর ক্ষমতায় আসবে না, আসেওনি। আওয়ামী লীগ কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতায় আসে।

আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্ব চান বঙ্গবন্ধুকন্যা

শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের কাজ করে, জনগণের মন জয় করে, জনগণের ভোট নিয়েই কিন্তু আওয়ামী লীগ বারবার ক্ষমতায় এসেছে। আওয়ামী লীগ কখনো কোনো মিলিটারি ডিরেক্টর এর পকেট থেকে বের হয়নি। কারো ক্ষমতা দখল করেও কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসেনি। আওয়ামী লীগ যতবার ক্ষমতায় এসেছে ভোটের মাধ্যমেই এসেছে, নির্বাচনের মাধ্যমেই এসেছি।

বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নয়নে আওয়ামী লীগের অবদানের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এ দেশে নির্বাচনের যতটুকু উন্নতি যতটুকু সংস্কার এটা কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং আমরা মহাজোট করে সবাইকে নিয়েই করেছি। এরপরও যদি কেউ না আসে সেখানে আমাদের কি করণীয়। হারার ভয়ে আসবে না, একেবারে সবাইকে লোকমা ধরে খাইয়ে দিতে হবে তবেই আসবে এটা তো আর হয় না।

আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগ কখনও ভোট চুরি করে ক্ষমতায় আসেনি : প্রধানমন্ত্রী

শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি ভুলে গেছে তাদের অতীতের কথা। বিএনপির সৃষ্টি যেভাবে একটা মিলিটারি ডিক্টেটর এর পকেট থেকে বিএনপির সৃষ্টি আর তারপরে নির্বাচনের যে প্রহসন সেটা তো তাদেরই সৃষ্টি। বরং আমরা নির্বাচনটাকে এখন জনগণের কাছে নিয়ে গিয়েছি। ছবিসহ ভোটার তালিকা ও স্বচ্ছ ব্যালট বক্স দেওয়া হচ্ছে এবং মানুষ যাতে তাদের ভোটটা দিতে পারে ভোটের পরিবেশ বা ভোট সম্পর্কে মানুষের যে সচেতনতা সেটা কিন্তু আওয়ামী লীগই সৃষ্টি করেছে।

জনগণের প্রতি আস্থা নেই বলেই বিএনপি বিদেশিদের কাছে ধরনা দিয়ে বেড়াচ্ছে মন্তব্য করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বিএনপির ধরনা দিয়ে বেড়াচ্ছে- কারো যদি মাটিতে জোর থাকতো, নিজের দেশের মাটিতে তাদের যদি সেরকম সমর্থন থাকতো, আর ওই যে বলে না খুঁটায় যদি জোর থাকতো নিজের শিকড়ের জোরটা যদি থাকতো তাহলে তো বিদেশে ধরনা দেওয়ার প্রয়োজন হতো না।

আরও পড়ুন: জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সফল : প্রধানমন্ত্রী

শেখ হাসিনা বলেন, জনসমর্থন থাকলে জনগণের ওপর আস্থা থাকলে বিশ্বাস থাকলে জনগণের কাছে যেত। বিদেশিদের কাছে দৌড়ে বেড়াতো না, এটা হলো বাস্তব কথা। কিন্তু সেই শক্তি নেই বলেই তারা ধরনা দিচ্ছে। তারপর কোন মুখে জনগণের কাছে ভোট চাইতে যাবে? আগুন দিয়ে পোড়ানো, মানুষ খুন করা, বোমা মারা, গ্রেনেড মারা, তারা যদি সামনে এসে দাঁড়ায় ভোট চাইছো, দেখো আমার এই অবস্থা; তখন বিএনপি কি জবাব দেবে। ওই জন্যই তারা বিদেশিদের কাছে ধরনা দিয়ে বেড়ায়। নিজের মানুষের কাছে যায় না।

তিনি বলেন, আমরা তো বাধা দিচ্ছি না, বলেছি তো হ্যাঁ আন্দোলন করেন সংগ্রাম করেন যত আন্দোলন করবেন তত ভালো কিন্তু পারে না। … জনগণের কাছে যেতে ভয় পায় জনগণের কাছে ভোট চাইতে ভয় পায়। অগ্নি সন্ত্রাস সন্ত্রাস করে যারা মানুষ হত্যা করেছে তাদের কি মানুষ ভোট দেবে।

আরও পড়ুন: আগামী বছর হবে খাদ্য সংকটের বছর : প্রধানমন্ত্রী

ভোট সংলাপের সম্ভাবনায় ‘না’
ভোটের আগে সংলাপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন, নির্বাচনের আগে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আর কোনো সংলাপ হবে না। জোর দিয়েই বলেছেন, ‘ক্ষমতায় আসতে হলে নির্বাচনের বিকল্প নেই। ভোটে আসা না আসা রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপার। যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’

বিএনপি জনগণের কাছে ভোট চাইবে কিভাবে, এমন প্রশ্ন রেখে সরকারপ্রধান বলেন, ‘তারা জনগণকে পুড়িয়েছে। মানুষ হত্যা করেছে। বোমা মেরেছে সাধারণ মানুষের ওপর। কাজেই তাদের ভোট চাওয়ার অধিকার খর্ব হয়েছে। বিএনপি আন্দোলন করছে করুক। আন্দোলন করা ভালো। কিন্তু ভোটে আসুক, এতে তাদের ভালো হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি এখন এসে বলছে প্রহসনের নির্বাচনে তারা আসবে না। এই প্রহসনের নির্বাচন তো তারাই সৃষ্টি করেছে। প্রহসনের নির্বাচন তো বিএনপির সৃষ্টি। মানুষ যেন ভোটটা দিতে পারে সেই পরিবেশ তো আমরাই তৈরি করেছি। শেকড়ের জোর যদি তাদের থাকত তাহলে তাদের বিদেশি শক্তির কাছে দৌড়াতে হতো না।’

আরও পড়ুন: দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো হুমকি দিচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কঠোর সমালোচনা করেন সরকারপ্রধান। যুক্তি দিয়েই তিনি বলেন, ‘র‌্যাব তো আমেরিকার পরামর্শে তৈরি। তারা পরামর্শ দিয়েছে, তাদের ট্রেনিং দিয়েছে। অস্ত্র-শস্ত্রও আমেরিকার দেওয়া।’

র‌্যাবের অপরাধের অভিযোগ বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘র‌্যাবকে আমেরিকার যেমন ট্রেনিং, তেমন কার্যক্রম। ট্রেনিংটা যদি ভালো হতো- এ বিষয়ে আমরা কী করতে পারি?’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়- এই নীতিতে আমরা বিশ্বাস করি। কারও সঙ্গে ঝগড়ায় যাই না।’ তিনি বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নানা সময়ে স্যাংশন দিয়েছে। আমাদের দেশের কিছু লোক আছে যারা স্থানীয় সিনেটর ও কংগ্রেস ম্যানকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকে। সেই সঙ্গে দেশের বিরুদ্ধে বদনাম করতেই থাকে। এরা কারা, কোনো না কোনো অপরাধ করেই দেশ ছাড়ে কিংবা চাকরিচ্যুত।’

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘকে কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী

তিনি আরও বলেন, ‘একাত্তরে যারা দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তাদের বিচার তো আমরা করেছি। কিন্তু তাদের ছেলে-মেয়ে আছে। দেশ থেকে বিদেশে টাকা-পয়সা নিয়ে গেছে। তারা তো আর থেমে নেই। তারাও অপপ্রচার করছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র‌্যাব হোক, পুলিশ হোক তারা কোনো অন্যায় করলে বিচার হয়। কিন্তু তাদের দেশে তো কোনো বিচার হয় না। একটার বিচার হয়েছে। যখন লোকজন রাস্তায় নামল, তখন তারা ওই একটার বিচারই করেছে। আর কোনো বিচার হয় না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি গুম হয়েছে জিয়াউর রহমানের আমলে। আমরা গুমের তালিকা চাইলাম। তালিকা পাওয়া গেল ৭৬ জনের। ভারত থেকে কিছু নাগরিক পলাতক। গুমের তালিকায় তাদের নামও ছিল।’

‘আমেরিকা স্যাংশন দিয়েছে, সেটি তুলবে কি না জানি না। কিন্তু তারা যা ক্ষতি করেছে। এই স্যাংশন দেওয়ার অর্থ হলো সন্ত্রাসবাদের মদত দেওয়া। কেননা র‌্যাব জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ দমন করেছে। সন্ত্রাস দমনে কি তারা নাখোশ?’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আফগানিস্তানে ৪০ বছর যুদ্ধ করল। শেষে তালেবানের হাতে ক্ষমতা দিয়েই চলে গেল। নিজেদের ব্যর্থতার কথা তো বলে না কোথাও। ভিয়েতনামে ৩০ বছর যুদ্ধ করল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ নিল। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে একের পর স্যাংশন দিচ্ছে। মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। এটি কেমন কথা? আমি জাতিসংঘেও বলেছি, এই যুদ্ধ থামাতে হবে।’

মিয়ানমারের সামরিক শাসক কারও কথা মানতে চায় না
মিয়ানমারের সামরিক শাসক কারও কথা মানতে চায় না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু জাতিসংঘ কেন? আসিয়ান দেশগুলোও কম চেষ্টা করেনি। অন্যান্য দেশও করেছে। মিয়ানমার সরকার সেখানে মিলিটারি রুলার, তারা তো কারও কথাই মানছে না।

নির্যাতনের শিকার হয়ে নতুন করে কোনও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসতে চাইলে তাদের প্রশ্রয় না দেওয়ার ইঙ্গিত করে সরকারপ্রধান বলেন, আমরা যেসব রোহিঙ্গাকে থাকতে দিয়েছি তাদের সমস্যা নিয়ে আমরা জর্জরিত। এর ওপর আমাদের মানুষের ওপর বোঝা কীভাবে চাপাবো? সেজন্য আমরা তাদের সাথে আলোচনা চালাচ্ছি। আলোচনা করে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি-তারা যাতে এদের ফেরত নিয়ে যায়।

তিনি জানান, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংগঠন রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা করছে। তারা আমাদের সাথে আছে। তারা বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারে এখন যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে সেটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সেখানে আমরা নাক গলাতে যাই না এবং যাবো না। অন্য দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে আমাদের মাটি কেউ ব্যবহারও করতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। মাদক পাচার হচ্ছে। নৌকায় ওঠে মালয়েশিয়া যাবে বলে, কিন্তু পরে সেটা সীতাকুণ্ড বা সোনাদিয়ায় পৌঁছে যাচ্ছে বা নৌকাডুবি হচ্ছে। নানা রকমের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আমরা জাতিসংঘে সমস্যাগুলো বারবার তুলে ধরছি। কিন্তু এই শরণার্থী রোহিঙ্গারা তাদের দেশে কতটুকু ফেরত যেতে পারবে—সেটা হলো বড় কথা। পাঁচটা বছর তারা আমাদের কাঁধে বোঝা হয়ে আছে। যে বৈদেশিক সহযোগিতা আসতো, সেটাও সীমিত হয়ে আসছে। এটাও ঠিক-যেহেতু আমরা মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছি। এই আশ্রিতদের ঠেলে দিতে পারি না।

নিজের বিষয়ে লেখালেখিতে ‘আপত্তি’
নিজের বিষয়ে লেখালেখিতে আপত্তি তুলেছেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে নিয়ে অত লেখালেখির দরকার নাই। আমি জনগণের সেবা করতে এসেছি। আমার বাবা দেশটাকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। তার যে স্বপ্ন ছিল সেটাই বাস্তবায়ন করা আমার একমাত্র লক্ষ্য। আমার নিজের তো কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই। তবে দেশের মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, কতটুকু দিতে পারলাম, এটাই হচ্ছে আমার সব থেকে বড় স্বপ্ন। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু নেই। এই যে একটা ঘর দেওয়ার পরে মানুষের যে হাসিটা, এটাই তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।’

১৯৭৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় দেশে অস্থিরতা ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সামাল দিয়ে দিয়ে অর্থনীতির চাকাটা সচল রেখেছি। বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ। আমরা ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ তৈরি করে দিয়ে গেলাম। আগামী ১০০ বছরে বদ্বীপটা কীভাবে চলবে সেটা মাথায় রেখেই একটা কাঠামো তৈরি করে দিয়ে গেলাম। যখনই যারা আসবে, আমি মনে করি এটা অনুসরণ করবে। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিশোধন সবই করতে পারবে। সেভাবে যদি করতে পারে তো বাংলাদেশ কখনোই পিছিয়ে যাবে না।

বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী বছর বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করছেন সবাই। এ নিয়ে সবাই আতঙ্কিত ও শঙ্কিত। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশবাসীকে নিজ নিজ জমিতে চাষাবাদ করার জন্য আবারও অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী একটা আশঙ্কা, আগামী বছর একটা মহাসংকটের বছর হবে। সেই জন্য আগ থেকেই আমাদের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টা বেশি বিবেচনা করার দরকার।’

শেখ হাসিনা বলেন, যারা স্বাধীনতাবিরোধী, যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই দেশের মেয়েদের ধর্ষণ করেছে, গণহত্যা, লুটপাট করেছে পঁচাত্তরের পরে তারাই ক্ষমতায় এসেছে। তাদের সঙ্গে যারা হাত মেলাতে পারে, আর জাতির পিতাকে হত্যা করতে পারে, সেই দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রাখা কত দুরূহ, কত কঠিন সেটা নিশ্চয় সবাই বুঝতে পারেন।

আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে সরকার গঠন করার পরে দেশে নানা ধরনের সংকট সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, জনগণের সমর্থন ছিল বলেই প্রতিটি সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি। যখন বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছিল, বাংলাদেশে শুধু একটি ঘটনাই ঘটেছিল (হোলি আর্টিজান), তাও কিন্তু ১২ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান করেছি। এরপর থেকে তেমন কোনও ঘটনা ঘটতে আমরা দেইনি।

করোনাভাইরাস, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে সরকার সক্ষম হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের রিজার্ভ যথেষ্ট। যদি কোনও সংকট আসে তাহলে পাঁচ মাসের খাদ্য কেনার মতো সক্ষমতা আছে কিনা সেটা দেখা হয়। আমাদের তা আছে। বাংলাদেশ কখনও ঋণখেলাপি ছিল না বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

সঙ্কট মোকাবিলায় জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের কিছু কিছু পত্রিকা সারা জীবনই বাংলাদেশের খারাপ কথাটা বলতে পারলেই স্বস্তি পায়। এটা আমি যুগ যুগ ধরে দেখছি। এরকম এক ধরনের মানুষ থাকে। সবসময় নেতিবাচক চিন্তা অথবা পরশ্রীকাতরতায় ভোগে। মানুষ যতই ভালো করুক, তাদের চোখে ভালো হওয়া যাবে না। তবে সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, চিন্তাও করি না। জনগণের ওপর আমার আস্থা ও বিশ্বাস আছে।’

সরকারপ্রধান বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন, সংগ্রামের হুমকি, অনেক কিছু পাওয়া যাচ্ছে। সেটা তো তাদের কাজ। করতেই হবে। না হলে বিরোধী দল কী? বিরোধী দল যদি শক্তিশালী হতো, তাহলে অনেক কিছুই হতো। দেশের অর্থনীতির জন্য সরকার স্বল্প, মধ্য ও দ্রুত মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেকোনও ক্ষেত্রে দেশের ঝুঁকি নেই, এটুকু আমি কথা দিতে পারি। #

কালের আলো/পিএম/এনএল

Print Friendly, PDF & Email