বন্ধুকে নিয়ে নায়িকা শিমুকে হত্যা করেন স্বামী

প্রকাশিতঃ 8:09 pm | September 07, 2022

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

স্বামী ও তার বন্ধুর হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন চিত্রনায়িকা রাইমা ইসলাম শিমু। এ ঘটনায় ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শিমুর স্বামী সাখাওয়াত আলী নোবেল ও তার বন্ধু এস এম ফরহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে উঠে এসেছে ভয়ানক তথ্য।

শিমু হত্যা মামলাটি তদন্ত করছেন কেরানীগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম। অভিযোগপত্রের বিষয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে আদালতে।

অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, নোবেল ও শিমুর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একপর্যায়ে যা বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। তবে এই বিয়েতে নোবেলের বাবা-মায়ের কোনো সম্মতি ছিল না।

অন্যদিকে বিয়ের পর বিভিন্ন বিষয়ে মনোমালিন্য দেখা দেয় দুজনের। এর মধ্যে নোবেল শিমুকে সিনেমায় অভিনয়ে বারণ করেন। ফলে সিনেমা ছেড়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলায় চাকরি নেন শিমু। এ চাকরিটাও ভালোভাবে নেননি নোবেল।

অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, বাবা-মাকে নিয়ে একসঙ্গে থাকতেন নায়িকা শিমু। তাদের বাসার পাশে আবার ছিল নোবেলের বাসা। ফলে নিয়মিত দেখা হতো। এক সময় তাদের মাঝে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। পরে বাবা-মায়ের অমতে শিমুকে বিয়ে করেন নোবেল। ফলে নোবেলের বাবা-মা আলাদাভাবে বসবাস করতে থাকেন। রাজধানীর গ্রিনরোডে স্ত্রী-সন্তানসহ বসবাস করেন নোবেল।

মা-বাবার অবর্তমানে এবং বন্ধু ফরহাদের সঙ্গে মিশে নোবেল কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন শুরু করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

এর মধ্যে আবার শিমুকে সিনেমায় অভিনয় করতে নিষেধ করেন নোবেল। ফলে অভিনয় ছেড়ে এটিএন বাংলায় চাকরি নেন শিমু। এ চাকরিটাও ভালোভাবে নেননি নোবেল। এনিয়ে নোবেল ও শিমুর সংসারে চলে আসছিল কলহ। এই কলহের কথা নোবেল তার বাল্যবন্ধু ফরহাদের সঙ্গে শেয়ার করতেন।

অভিযোগপত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, চলতি বছরের (২০২২ সাল) ১৬ জানুয়ারি সকাল সোয়া ৮টায় নোবেলের বাসায় যান ফরহাদ। এসময় ফরহাদকে ড্রইংরুমে বসতে দিয়ে নোবেলকে জানান শিমু। নোবেল গিয়ে ফরহাদের সঙ্গে দেখা করে রান্নাঘরে চা বানাতে যান।

এদিকে বেডরুমে বসে মোবাইল দেখতে থাকেন শিমু। নোবেল আবার সেই মোবাইল দেখতে চান। কিন্তু শিমু দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। এনিয়ে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয়। হইচই শুনে ফরহাদ উঠে শিমুর রুমে যান। তখন নোবেল ফরহাদকে বলেন, ‘শিমুকে ধর, ওকে আজ মেরেই ফেলবো।’

কথামতো ফরহাদ ধরতে গেলে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন শিমু। এরপর নোবেল প্রথমে শিমুর গলা ধরতে গেলে তাকেও ধাক্কা মেরে ফেলে দেন। এবার ফরহাদকে শিমুর গলা ধরার জন্য বলেন নোবেল। ফরহাদ গলা আর নোবেল দুই হাত চেপে ধরেন। একপর্যায়ে নিচে পরে যান শিমু। নোবেল শিমুর গলার ওপর পা দিয়ে দাঁড়ান। এতে প্রস্রাব করে দেন শিমু। এক সময় শিমু নিস্তেজ হয়ে পড়েন।

এ সময় নোবেল ফরহাদকে দেখতে বলেন শিমু বেঁচে আছে কি না। ফরহাদ শিমুর হাত দেখে বলেন, ‘শিমু বেঁচে নেই।’ তখন তারা দুজনে মিলে মরদেহ লুকানোর পরিকল্পনা করতে থাকেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, একপর্যায়ে নোবেল রান্নাঘর থেকে দুটি পাটের বস্তা এবং ফ্রিজের ওপর থেকে মিষ্টির প্যাকেট বাঁধার প্লাস্টিকের রশি আনেন। ফরহাদ শিমুর মাথা উঁচু করে ধরেন। আর নোবেল একটি বস্তার ভেতর শিমুর মাথার অংশ এবং আরেকটি বস্তায় পায়ের অংশ ভরেন।

এরপর প্লাস্টিকের রশি দিয়ে দুটি বস্তা একত্রে সেলাই করে দেন নোবেল। পরে শিমুর মরদেহ নোবেলের গাড়ির পেছনের সিটে ওঠান ফরহাদ। এরপর কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন আলীপুর ব্রিজ এলাকার একটি ঝোপে মরদেহ ফেলে দেন তারা।

ঘটনার পর রাতেই কলাবাগান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। যাতে বলা হয়, স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে রাজধানীর কলাবাগান এলাকার বাসায় থাকতেন শিমু। ১৬ জানুয়ারি সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে তিনি আর ফেরেননি। তার মোবাইলও বন্ধ পাওয়া যায়।

পরদিন (১৭ জানুয়ারি) আলীপুর এলাকার রাস্তার পাশ থেকে শিমুর বস্তাবন্দি খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে তার পরিচয় মিলছিল না। পরে ওইদিন রাতে তার ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে নাম-পরিচয় শনাক্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এরপর ১৮ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় নোবেল ও তার বাল্যবন্ধুর বিরুদ্ধে মামলা করেন শিমুর ভাই হারুনুর রশীদ। এছাড়া মামলায় বেশ কয়েকজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। ওইদিন ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাবেয়া বেগম আসামিদের তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে এ মামলার দুই আসামি ২০ জানুয়ারি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। বর্তমানে তারা কারাগারে।

১৯৯৮ সালে কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘বর্তমান’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে শিমুর। এরপর দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, চাষি নজরুল ইসলাম, শরিফ উদ্দিন খান দিপুসহ আরও বেশ কয়েকজন পরিচালকের প্রায় ২৫টির মতো সিনেমায় কাজ করেছেন তিনি। অভিনয় করেছেন শাকিব খান, অমিত হাসানসহ বেশ কয়েকজন তারকার সঙ্গে।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি কয়েকটি টিভি নাটকে অভিনয় ও প্রযোজনা করেছেন শিমু। তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সহযোগী সদস্যও ছিলেন।

কালের আলো/ডিএস/এমএম

Print Friendly, PDF & Email