উন্নয়নের অভিযাত্রায় এগিয়ে বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ 11:18 am | August 29, 2022

প্রণব মজুমদার :

উন্নয়নের সড়ক অতিক্রম করেছে দেশ। এখন বাংলাদেশের অবস্থান মহাসড়কে। গত দশ বছরে দেশে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। অবকাঠামোগত সুবিধা যেমন রাস্তাঘাট, বড় বড় সেতু বিশেষ করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু মেট্রোরেল যা শিগগির উদ্বোধন হতে যাচ্ছে।

পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৫ গুণ আর জিডিপি বেড়েছে ৩০ গুণ। স্বাধীনতার আগে দারিদ্র্য সীমার নিচে ছিল ৮৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী, বর্তমানে এই সংখ্যা ২০ শতাংশের কম। বিগত প্রায় ৫০ বছরে ধান চালের উৎপাদন প্রায় চারগুণ হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ থেকে ৪ শতাংশ। বর্তমানে ৮ শতাংশের ওপর।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে তৈরি পোশাক ছাড়াও চাঁদপুরের রূপালি ইলিশ, হিমায়িত চিংড়ি, রাজশাহীর ফজলি আম, সিলেটের শীতলপাটি, নারায়ণগঞ্জের জামদানি, টাঙ্গাইলের তাঁত, কুমিল্লার খাদি বিদেশে রফতানি হচ্ছে। বাংলাদেশের ওষুধ যাচ্ছে বিশ্বের ১৬৬টি দেশে। এসব অগ্রগতির স্বীকৃতিও মিলছে। লন্ডনভিত্তিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান বিএমআই রিসার্চ ভবিষ্যতের যে ১০টি উদীয়মান বাজারকে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের ওয়ার্ল্ড লিগ টেবিল ২০২১ রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ।

করোনার ধাক্কা কাটিয়ে মেগা প্রকল্পগুলোর কাজে এসেছে পূর্ণগতি। চলতি বছরে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের লক্ষ্যে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব সরকারের। আগামী বিজয় দিবসের আগেই পদ্মা সেতু চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার লক্ষ্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। এছাড়া মেট্রোরেল চালু হবে আগামী ডিসেম্বরে। কর্ণফুলী টানেল যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে ২০২২ সালের মধ্যেই। রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেয়ার আশা সরকারের।

শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে শুরু হওয়া উন্নয়নের ঝাণ্ডা এখন বয়ে নিয়ে চলেছেন তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ ভর্তি, বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে নতুন বই আর শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা এখন বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ উদাহরণ। তবে চ্যালেঞ্জও আছে বেশ কিছু। এদিকে উচ্চশিক্ষা ছড়িয়ে দিতে একের পর এক বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ব বিদ্যালয় স্থাপন করা হচ্ছে। বেড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও। তবে মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব, শিক্ষানীতির পুরো বাস্তবায়ন না হওয়া এবং শিক্ষা আইন তৈরিতে দেরি হওয়া দেশের শিক্ষাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার পথে বাধা হয়ে আছে।

গ্রামাঞ্চলে এখন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ। বার্ষিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ২৫ হাজার ২৩৫ মেগাওয়াট। মহাকাশে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১, প্রস্তুতি চলছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণের। উন্নয়নের রোড ম্যাপ ধরে নির্মিত হচ্ছে পায়রা সমুদ্র বন্দর, এলএনজি টার্মিনাল। বিশ্বে গুরুত্বের সঙ্গে প্রশংসিত হয়েছে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার মানবিক দিক। এছাড়া গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক সাফল্য এবং ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অবস্থানের প্রশ্ন- এই তিনটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে গত ৫ দশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশের প্রতিনিধি হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া, তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উঠে আসা, শান্তিরক্ষা মিশনে ব্যাপক অংশগ্রহণ ইতিবাচক ইমেজ তৈরি করেছে। জঙ্গিবাদ দমনে সাফল্যের দিকটিও প্রশংসিত হয়েছে। মাথাপিছু গড় আয় ও আয়ু, নবজাতক ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। বিস্ময়কর অগ্রগতি ঘটেছে কৃষি খাতে। করোনার দুঃসময়ে আমাদের রফতানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হার বেড়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভও বেড়েছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৫৫৪ ডলার।

মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিল, বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি। বিশ্বে ভিক্ষুকের দেশ হবে বাংলাদেশ। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমি বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। বঙ্গবন্ধুর বাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছে; আর কিসিঞ্জারের বক্তব্য অসাড় প্রমাণিত করে উন্নয়নশীল বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কোভিডে থমকে যাওয়া অর্থনৈতিক বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল। পঞ্চাশ বছরে বদলে যাওয়া নতুন এক বাংলাদেশ দেখছে বিশ্ব। টার্গেট রূপকল্প-২০৪১।

চলতি অর্থ বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। সংস্থাটি বলছে, করোনার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবৃদ্ধি কমে গেলেও বাংলাদেশ বেশ ভালো করেছে। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগও বাড়বে বলে মনে করে এডিবি। এ জন্য আবার উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে প্রবাসী আয় কমে গেলে দেশের অভ্যন্তরে ভোগ কমতে পারে, যা এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আগামী ২০২২-২৩ অর্থ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি।

এ বিষয়ে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর এডিমন গিন্টিং সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কোভিড-১৯- এর ধাক্কার পরও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তাঁর মতে, টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বাংলাদেশকে এখন তিনটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত, বেসরকারি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় খরচ বাড়াতে হবে। এ জন্য জোর দিতে হবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দক্ষতা বাড়াতে বাংলাদেশকে ১ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা ঋণ দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। গত ৩১ মার্চ সংস্থাটির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বাংলাদেশে রফতানির গুণগত মান উন্নয়ন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের দক্ষতা এবং নিরাপত্তা উন্নতির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে। এ লক্ষ্যে ১৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ প্যাকেজ অনুমোদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই দিন ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় এডিবির প্রধান কার্যালয়ে এ অর্থ অনুমোদন দেয়া হয়।

পাশাপাশি রফতানি বহুমুখীকরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বাণিজ্য সুবিধার কৌশলগুলো বাস্তবায়নে সীমান্ত সংস্থা ও বেসরকারি খাতগুলোর মধ্যে আরও সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এডিবির মুখ্য অর্থনীতিবিদ তাদাতেরু হায়াশি বলেন, এডিবির এই সহায়তা শিল্পায়ন ও বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সরকারের লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানাবে। এই কর্মসূচি রফতানি পণ্য ও গন্তব্যের বৈচিত্র্য আনতে সহায়তা ছাড়াও উন্নত যোগাযোগের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করবে।

এডিবির এই সহায়তায় ৭৭৬ কোটি টাকা নীতিভিত্তিক ঋণ রয়েছে, যা দেশের শুল্ক আইনি কাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, কার্গো ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়ার উন্নতি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা জোরদারসহ বিভিন্ন সংস্কারে ব্যবহার করা যাবে।

এ ছাড়া নীতি সংস্কারের সহায়ক হিসেবে ৪৫৭ কোটি টাকায় আখাউড়া, সোনা মসজিদ ও তামাবিল সীমান্তে বাংলাদেশ ল্যান্ড পোর্ট অথরিটি (বিএলপিএ) ও এনবিআরের মাধ্যমে সমন্বিত স্থল শুল্ক স্টেশন ও স্থলবন্দর নির্মাণ করা হবে। উন্নত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং কার্গো পরিবহনের জন্য স্থাপন করা হবে সহায়ক সরঞ্জাম।

এডিবি বিশেষ প্রযুক্তিগত সহায়তা তহবিল থেকে ১২৯ কোটি টাকার কারিগরি সহায়তা অনুদান দেবে, যা দিয়ে শুল্ক আইনি কাঠামোর আধুনিকীকরণ ও সীমান্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় শুল্ক সুবিধার কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া হবে। সীমান্তগুলোতে অত্যাধুনিক শুল্ক কার্যক্রম বাস্তবায়নে এনবিআরের সক্ষমতা এবং এনবিআর ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকল্পের বাস্তবায়ন জোরদার হবে।

সদ্য প্রয়াত সৎ ও প্রাজ্ঞ দেশের সবচাইতে বেশি জাতীয় বাজেট প্রণেতা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৭ সালের বাজেট বক্তৃতার কথা মনে পড়ছে। তিনি ওই বছরের ১ জুন জাতীয় সংসদে বাজটে পেশকালে বলেছিলেন ‘আমরা কি কখনও ভেবেছি যে, আমরা ভিক্ষার ঝুলিকে এত দ্রুত ছেটে ফেলতে পারব? নিজস্ব অর্থায়নে কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারব? পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারব? শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা সমৃদ্ধির পথে হাঁটছি। সোনা ছড়ানো সমৃদ্ধি আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সময় এসেছে সাহসী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আলোর পথে অভিযাত্রার।’ উন্নয়নের অভিযাত্রায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাক দেশ ও জাতি। তবেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা ফিরে আসবে।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক, সাহিত্যিক ও অর্থকাগজ সম্পাদক

Print Friendly, PDF & Email