চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবস্ত্রীকরণ ও কতিপয় পর্যবেক্ষণ

প্রকাশিতঃ 10:46 am | July 26, 2022

মো. জাকির হোসেন :

শিরোনাম দেখে কেউ কেউ তর্ক জুড়ে দিতেই পারেন, একজন শিক্ষার্থীর বিবস্ত্রকরণকে কেন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবস্ত্রীকরণ বলছি? সভা-সমাবেশ-বক্তৃতা-বিবৃতিতে আমরা গর্ব করে বলে থাকি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি একটি পরিবার। এই পরিবারের একজন সদস্যের বিবস্ত্রকরণ কি বিশ্ববিদ্যালয়ের বস্ত্রহরণ নয়? আমাদের পরিবারের কোনও নারী সদস্য যৌনসন্ত্রাস, শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণের শিকার হলে তা কি পুরো পরিবারকেই গ্রাস করে না? সমাজে কি এটি পুরো পরিবারের সম্মানহানি হিসেবে বিবেচিত হয় না? তাই আমার লেখার এই শিরোনাম।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে আপনাদের মতো আমিও প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি অধ্যয়ন করিনি। চাকরিসূত্রে সখ্য শুরু হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কেবল রুটি-রুজির সম্পর্ক নয়। ভালোবাসা, মুগ্ধতা আর মমতার বন্ধনের সম্পর্ক এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে। মানুষ যেমন মুহূর্তেই সুন্দর মুখের প্রেমে পড়ে, তেমনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্যও প্রথম দর্শনেই যে কাউকে মোহিত করবে। চারদিকে সবুজের সমারোহ, ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়, পাহাড়ের গা-ঘেঁষে বয়ে চলা স্বচ্ছ পানির ঝরনা ও ঝিরিধারা। অজগর, হরিণ, বানর, সজারু, ‘আসমতি ব্যাঙ’, পতঙ্গভুক উদ্ভিদ, পাখ-পাখালীসহ নানা বন্যপ্রাণীর বিচরণ ও উদ্ভিদের দেখা মেলে এখানে। জীববৈচিত্র্য ও অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পাহাড়ের বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ৫৮ বছরের এই জীবনে ৩০ বছরই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেটে গেছে। যৌবনের শুরুতে যে সম্পর্ক, প্রৌঢ়ত্বে এসে সেই ভালোবাসায় মোটেও ভাটা পড়েনি, বরং ভালোবাসা গভীর হয়েছে। জীবনের অংশ বনে যাওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনন্দে-প্রাপ্তিতে যেমন উচ্ছ্বসিত হয়েছি, তেমনি এর দুঃখে, অবনমনে কষ্ট পেয়েছি।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নারী শিক্ষার্থীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে ৬ জন মিলে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে। পরে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের সাথে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেয়। ওই নারী শিক্ষার্থী ও তার সাথে থাকা বন্ধুকে দুর্বৃত্তরা মারধর করে তাদের মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে সংঘটিত এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা দেশে-বিদেশে বিবেকবান সব মানুষকে ব্যথিত-ক্ষুব্ধ-উদ্বিগ্ন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজ প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে র‌্যাবের হাতে ৫ জন অপরাধী ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কর্মচারীদের সন্তান এবং দুই জন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ও অন্যরা পার্শ্ববর্তী হাটহাজারী কলেজের শিক্ষার্থী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. আজিম ও নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র নুরুল আবছার বাবুকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করেছে এবং অপরাধীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, উপাচার্য মহোদয়, র‌্যাব ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানাই।

আমার স্বল্প জ্ঞানের বিবেচনায় এই ঘটনার কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা প্রয়োজনীয় মনে করছি।

এক. বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্প বেতনে চাকরি করা পিতা তাদের সন্তানদের নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজীবন বহিষ্কারের মাধ্যমে ও বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে (যদি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়) তাদের সেই স্বপ্নগুলোর অপমৃত্যু হলো, তার কোনও দায় কি আমরা যারা শিক্ষকতা করছি ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছি তাদের নেই?

গত ১৭ জুলাই গভীর রাতে চট্টগ্রাম শহরের জিইসি এলাকায় রিকশাচালক মো. রাকিবের রিকশার আরোহী এক তরুণীকে জোর করে তুলে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। রাকিব ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে আরেক রিকশাচালক আবদুল হান্নানের কাছে সাহায্য চায়। আবদুল হান্নান ঘটনাটি জানতে পেরে জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ কল দেন। পুলিশ এসে ওই নারীকে উদ্ধার করে। গ্রেফতার করা হয় জড়িতদের। দুই জন রিকশাচালক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে ধর্ষণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখলেন। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা তাদের সহপাঠী একজন নারীকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করার প্রস্তাব দিয়ে অপরাধে জড়ালেন।

রিকশাচালক আবদুল হান্নানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি পুলিশকে জানাতে গেলেন কেন? আবদুল হান্নান জবাবে বলেছেন, ‘ওই নারীর জায়গায় আমার মা, বোন, স্ত্রী হলে কি চলে যেতে পারতাম! ঘটনার শিকার ওই নারী কারও মা, কিংবা বোন। নিজের বিবেক থেকে ঝুঁকি নিয়ে পুলিশকে জানিয়েছি।’ ৩০ বছর বয়সী তৃতীয় শ্রেণি অবধি পড়াশোনা করা আবদুল হান্নান একজন নারীকে যে দায়িত্বশীলতার সাথে এবং সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখেন, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আমরা তা শিখাতে পারিনি কেন?

দুই. বিভিন্ন গবেষণা বলছে, প্রাকৃতিক পরিবেশ আচরণগত এবং স্নায়ুবিক প্রক্রিয়াগুলোকে প্রভাবিত করে, ইতিবাচক আবেগ এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে এবং চাপ ও আবেগপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে হ্রাস করে। উটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির কেরি জর্ডান এই ডোমেনটি অন্বেষণ করেন, আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। প্রাকৃতিক পরিবেশ মনোযোগী ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কমাতে ও ইতিবাচক সামাজিক সম্পর্ক তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করতে মানুষের মনকে উদ্দীপ্ত করতে সক্ষম। কোনও কোনও গবেষণা বলছে, পার্কে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলে কিংবা অফিসের জানালা দিয়ে সবুজ গাছের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও মনের ইতিবাচক পরিবর্তন হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈসর্গিক পরিবেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনিন্দ্য সুন্দরের আবেশে অবস্থান করেও কিছু শিক্ষার্থী নেতিবাচক মানসিকতা নিয়ে এমন নৃশংস যৌনসন্ত্রাসী কেন হয়ে উঠছে সে বিষয়ে আমরা ভাবনা-চিন্তা করেছি কি?

তিন. জিইসি এলাকায় ধর্ষণের ঘটনায় পুলিশকে কল করে জানানো রিকশাচালক আবদুল হান্নানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আসামিরা ধরা পড়লো, এখন কি নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন? আবদুল হান্নান জবাবে বলেছেন, ‘ভয় পেলে হবে না, কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতে হবে।’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে বিবস্ত্র করার ঘটনায় কিংবা তারও আগে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে আরও শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় আমরা যারা নিজেদের জাতির বিবেক, আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর বলে দাবি করি তারা কি আবদুল হান্নানের মতো দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সম্মিলিতভাবে বলতে পেরেছি ‘ভয় পেলে হবে না, কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতে হবে’? উত্তর হলো অবশ্যই পারিনি, কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছার বড় বেশি অনুগত হয়ে পড়েছি। লোভ আর লাভের পাটিগণিতের হিসাব মেলাতে আমরা অনেকেই বিবেকটা কারও কাছে বন্ধক রেখেছি।

চার. উপাচার্য মহোদয়ের একজন কাছের মানুষের লেখায় জানতে পারলাম, শিক্ষার্থীকে বিবস্ত্র করার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিক্ষোভরত ছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব দাবি মেনে নেওয়ার লিখিত চুক্তি করে তাদের হলে ফেরত পাঠায়। তার মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক মাননীয় উপাচার্য ও তার প্রশাসনিক সহযোগী শিক্ষকদের মৌখিক আশ্বাসের ওপর শিক্ষার্থীরা আস্থা রাখতে পারেনি বিধায় লিখিত চুক্তি করতে হয়েছে।

চার কর্মদিবসের মধ্যে বিচার করতে না পারলে রেজিস্ট্রার ও প্রক্টোরিয়াল টিমের পদত্যাগের ঘোষণা দিতে হয়েছে। এরপরও আন্দোলন থেমেছে কি? লিখিত চুক্তি, পদত্যাগের ঘোষণা কোনও কিছুতেই ক্ষোভ-বিক্ষোভ থামেনি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে এমন আস্থাহীনতার পরিবেশ কেবল আনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, এটি ভয়ংকর কিছুর ইঙ্গিত করছে। তারাপদ রায়ের ভাষায়, ‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে’।

পাঁচ. একটি বড় হাতিকে শিকল নয়, দুর্বল একটি রশি দিয়ে বেঁধে রাখতে দেখে একজন কৌতূহলী হাতির প্রশিক্ষকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, এত বড় হাতি এই দুর্বল রশি দিয়ে কীভাবে আটকে রেখেছো? প্রশিক্ষক জবাবে বলেন, হাতিটি যখন ছোট ছিল এ রকম রশি দিয়ে বেঁধে রাখতাম। ওই বয়সে তাদের ধরে রাখার জন্য এটি যথেষ্ট ছিল। তারা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করতে শুরু করে এই রশি ছিঁড়ে যেতে পারবে না। তারা বিশ্বাস করে যে এই রশি এখনও তাদের ধরে রাখতে পারে, তাই তারা কখনই মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে না। সিংহভাগ অপরাধী ছোট ছোট অপরাধ করে হাত পাকায়। এরপর গুরুতর অপরাধে জড়ায়।

আজকে যাদের স্থায়ী বহিষ্কার করতে হচ্ছে তাদের ছোট অপরাধগুলো আমলে নিয়ে শাস্তির ব্যবস্থা করলে ভিকটিম ও অপরাধীদের জন্য এমন দুঃখজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না বলেই আমার বিশ্বাস। গুণীজনেরা বহুকাল আগেই বলে গেছেন, কারপেটের নিচে ময়লা লুকিয়ে রাখা যায় না, একসময় তা বেরিয়ে আসবেই। আড়াল করার নীতি কিংবা ধীরে চলো নীতি লাভজনক হলো, নাকি কয়েকটি পরিবারের জন্য ভয়ংকর সর্বনাশ ডেকে আনলো?

এই ঘটনায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বারবার ছাত্রলীগের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরও সক্রিয় ও সতর্ক হলে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠনের এই বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানো কি অসম্ভব ছিল?

ছয়. ছয় জন মানুষ মিলে দুই জন মানুষকে টেনেহিঁচড়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে গেলো, একজনকে বাঁধলো, ভিডিও করলো, তাদের মারধর করলো, মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা ছিনতাই করলো। এতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছে। আট জন মানুষের কথাবার্তায় যে শোরগোল হয়েছে কোনও নিরাপত্তারক্ষী তা কেন জানতে পারলো না তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার এবং নতুন নিরাপত্তা বিন্যাস জরুরি। এটি মারাত্মক নিরাপত্তা ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।

সাত. বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতায় শিক্ষার্থী বিবস্ত্র করার ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যেই বিচার করা সম্ভব হলো। কিন্তু অতীতের যৌন নির্যাতনের ঘটনা বছর গড়িয়ে গেলেও তা ফাইলবন্দি ছিল। তবে বিবস্ত্র করার ঘটনার পর চার দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলে অতীতের নির্যাতনের ঘটনার ফাইলও নড়াচড়া করতে শুরু করে। যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিনটি অভিযোগের বিষয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দুই ছাত্রীকে হেনস্তা করার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চার শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাদের প্রত্যেককে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃত চার জন হলেন আরবি বিভাগের জুনায়েদ আহমেদ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের রুবেল হাসান, দর্শন বিভাগের ইমন আহম্মেদ ও একই বিভাগের রাকিব হাসান রাজু। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও রসায়ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অভিযোগে অভিযুক্তদের সতর্ক করা হয়েছে। তার মানে আমরা চাইলে বিচার করতে পারি, আর না চাইলে বিচার হয় না।

আট. উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সিন্ডিকেট কর্তৃক গঠিত যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ কমিটিকে পাশ কাটিয়ে নতুন কমিটি গঠন করে শিক্ষার্থী বিবস্ত্রকরণের তদন্ত ও বিচার এবং তড়িঘড়ি করে দুই জন শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কারের ঘোষণায় আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ার অনুসরণে ব্যত্যয় হয়েছে। আজীবন বহিষ্কারের আগে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি, যা বিচারের একটি মৌলিক নীতি ‘আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগদান ব্যতীত কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না’– এর সরাসরি লঙ্ঘন হয়েছে।

নম্বরপত্র জালিয়াতির ঘটনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ আদালতের একজন বিচারকের সার্টিফিকেট বাতিল করলে আমাদের উচ্চ আদালত এই ঘটনার তদন্ত কমিটি ও তৎকালীন উপাচার্যকে আদালতে তলব করে জানতে চেয়েছিলেন, যার সার্টিফিকেট বাতিল করা হয়েছে সেই বিচারপতিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কিনা। উপাচার্য মহোদয় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি জানালে উচ্চ আদালত রায়ে বলেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগদান ব্যতীত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সার্টিফিকেট বাতিলের সিদ্ধান্তের কোনও আইনগত কার্যকারিতা নেই।

দেশে-বিদেশে অসংখ্য মামলায় এই নীতি বারবার উচ্চারিত হয়েছে। আমি অবাক হবো না, বহিষ্কৃতদের আইনজীবী যদি এই প্রশ্ন উত্থাপন করেন যে অতীতের যৌন নির্যাতনের সব ঘটনায় যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির কাছে প্রেরণ করা হয়েছে আর এই শিক্ষার্থীদের বেলায় তা আলাদা কমিটির কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। ওই শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার তথা শাস্তি দেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এমন করা হয়েছে মর্মে শিক্ষার্থীদের আইনজীবী যুক্তি উত্থাপন করবেন এটি সহজেই অনুমেয়।

তদুপরি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানত মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ ও র‌্যাবের কাছে গ্রেফতারকৃতদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। আদালতে বিচারের ক্ষেত্রে র‌্যাব কিংবা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তির সাক্ষ্যগত মূল্য অতি সামান্যই। তবে ফৌজদারি মামলায় কী সিদ্ধান্ত হবে সেটি আদালতের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

কাউকে অভিযোগ কিংবা দোষারোপের জন্য আমার এই লেখা নয়। বরং, আমাদের কী করা উচিত ছিল, কী করতে পারিনি এবং ভবিষ্যতে কী করা উচিত সেই উদ্দেশ্যে এই লেখা।

একটি পাখি প্রচণ্ড ঠান্ডায় উড়তে গিয়ে হিম হয়ে বরফ জমাট বেঁধে মাটিতে পড়ে যায়। এমন সময় একটি গরু এসে তার গায়ে কিছু গোবর ত্যাগ করে। গোবরের উষ্ণতায় হিমায়িত পাখিটি বরফ গলে মুক্ত হয়। বরফে জমে যাওয়া পাখি গোবরের উষ্ণতায় মুক্ত হয়ে খুশিতে গান গাইতে শুরু করে। একটি বিড়াল পাখির আওয়াজ শুনে গোবরের স্তূপের নিচে তাকে আবিষ্কার করে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাকে খুঁড়ে বের করে খেয়ে ফেলে। এই ঘটনায় শিক্ষণীয় বিষয় হলো, যারা আপনার কাজের ভালো-মন্দ তুলে ধরে তারা সবাই আপনার শত্রু নয়। আর যারা আপনার পাশে আছে তারা সবাই আপনার বন্ধু নয়।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email