অটুট থাকুক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

প্রকাশিতঃ 11:12 am | July 20, 2022

মাহমুদ আহমদ :

ফেসবুকে একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শুক্রবার সন্ধ্যায় লোহাগড়ার দিঘলিয়া গ্রামের সাহা পাড়ায় হিন্দু বাড়িতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও মন্দিরে হামলা হয়। গত মাসে ফেসবুককেন্দ্রিক আরেক পোস্টকে কেন্দ্র করে এক অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানোর খবরে বেশ কিছু দিন ধরে আলোচনায় রয়েছে নড়াইল।

এ সাম্প্রদায়িক হামলায় ব্যথিত সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজা তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের ফাঁদে পড়ে নড়াইলের হাজার বছরের ঐতিহ্য আর সম্প্রীতির বন্ধনকে এক নিমিষে ম্লান করে দেবেন না। ছেলেবেলা থেকে যে নড়াইলকে দেখে এসেছি, যে নড়াইলকে নিয়ে আমরা গর্ব করি, সেই নড়াইলের সঙ্গে এই নড়াইলকে আমি মেলাতে পারছি না।’

আমাদের মাথায় রাখতে হবে, দেশের আইন আছে। কোনো পরিস্থিতিতেই আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারি না। কেউ যদি সত্যি অপরাধ করে তার বিচার আদালত করবেন। তাই সমাজে যারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করবে তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের প্রতিহত করতে হবে। এটা আমাদের দেশে হোক বা ভিন্ন দেশে।

আমরা লক্ষ্য করি, একটি মহল বরাবরই শান্তিময় সমাজকে অশান্ত করে তোলার কাজে ব্যস্ত থাকে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে তারা থাকে সদা তৎপর। অথচ প্রত্যেক ধর্মের মূল মর্মবাণী হলো-শান্তি ও মানুষের কল্যাণ। ধর্ম মানুষকে সম্প্রীতি ও পরমত সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়। বিভিন্ন সময়ে ধর্মকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীল ও সুযোগসন্ধানী একটি চক্র বরাবরই পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চালায়। সম্প্রতি একই অবস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে নড়াইলে।

ইসলাম এমন এক শান্তিপ্রিয় ধর্ম যেখানে সব ধর্মের অনুসারীদের সম্মানের শিক্ষা দেয়। প্রেমপ্রীতি, সৌহার্দ আর শান্তি ও সম্প্রীতির এক পরিমণ্ডল বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত করাই ইসলামের মূল লক্ষ্য। অন্য কথায়, আল্লাহ তাআলার প্রতি বিশ্বস্ততার হক আদায়ে এবং তার সৃষ্টির প্রতি দায়বদ্ধ আচরণের মাধ্যমে এ বিশ্ব এক স্বর্গ রাজ্যে পরিণত করা।

একটি বিষয় আমাদের বোঝা উচিত, কারও কথায় কি ইসলাম কলঙ্কিত হয়ে যাবে বা মহানবি (সা.)-এর সম্মানের হানি হবে? অবশ্যই তা কখনো হতে পারে না। কেননা ইসলামই কেবল একমাত্র পরিপূর্ণ ধর্ম। যখন কেউ ইসলামের অবমাননা, কোরআনের অবমাননা এবং রাসুলের (সা.) অবমাননা করবে এর প্রতিবাদ আমরা অবশ্যই করব।

তবে আমাদের প্রতিবাদের ধরন হবে শ্রেষ্ঠনবির অনুপম আদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়ে। কারও বাড়িঘর পুড়িয়ে বা কোনো দেশের পতাকা পুড়িয়ে বা কোনো দেশের রাষ্ট্রদূতের ওপর হামলা চালিয়ে বা হত্যা করে অথবা অগ্নিসংযোগ ও অপহরণ করে এর প্রতিবাদ আমরা করব না। কারণ এগুলোর কোনোটাই ইসলাম আমাদের অনুমতি দেয় না।

আমাদের প্রতিবাদের ধরন হবে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য, কোরআনের অনিন্দ্য সুন্দর শিক্ষা এবং বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)- এর অতুলনীয় আদর্শ সারা বিশ্বের মাঝে ফুটিয়ে তোলা। প্রতিটি দেশে বড় বড় সভা-সেমিনার করা, কোরআন প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা এবং সব ধর্মের লোকদের ডেকে ইসলামের শান্তির শিক্ষা সম্পর্কে অবগত করা। এ কাজের জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে প্রথমে প্রয়োজন তাহলো সারা বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

ইসলামের বিরুদ্ধে যখন কোনো বিষয়ে অভিযোগ হানা হয় তখন প্রতিটি মুসলমানের হৃদয় কাঁদে এবং ব্যথা পায় আর এটাই স্বাভাবিক আজ যারা বিশ্বনবি ও শ্রেষ্ঠনবি (সা.) সম্পর্কে কটাক্ষ করে তারা কি এটা জানে না যে, মহানবি (সা.) তো শুধু ইসলামের অনুসারীদের নবি নন, তিনি তো সারা বিশ্বের সব জাতি এবং সব ধর্মের নবি। আর আল্লাহতায়ালা এই মহান নবিকে সমগ্র বিশ্বের জন্য শান্তি ও রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন। এই নবির আগমন বার্তা সব নবিরাই (আ.) দিয়ে গেছেন এবং অন্য নবিরা এই নবির উম্মত হওয়ার ইচ্ছাও পোষণ করেছেন।

প্রকৃত ইসলামের আকর্ষণীয় শিক্ষার প্রচার ও প্রসার জোর-জবরদস্তি এবং বল প্রয়োগে নয় বরং সৌহার্দ ও সম্প্রীতির দ্বারা মানুষের হৃদয় জয় করার মাধ্যমে সম্ভব। বলপ্রয়োগ করলে অন্যের অধিকার যেমন দেওয়া যায় না, তেমনি আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভও এর দ্বারা সম্ভব নয়।

ইসলামে মুসলমান ও অমুসলমানের সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসলাম শত্রুদের সাথেও দয়ার্দ্র আচরণ করে, তা শান্তিকালীন সময়ই হোক বা যুদ্ধাবস্থায়ই হোক। সর্বাবস্থায় ইসলাম অমুসলমানদের অধিকার মর্যাদার সাথে সংরক্ষণ করে। বিদ্বেষ ছড়ানো ও আক্রমণের অধিকার ইসলামে নেই। চড়াও হওয়া বা আক্রমণ করার অধিকার ইসলামে নেই। ইসলামের বাস্তব শিক্ষা হলো, কেবল আক্রান্ত হলেই তুমি যুদ্ধ করতে পার। অধিকন্তু ইসলামে এ নির্দেশও রয়েছে যে, আক্রমণকারী বা আগ্রাসী হয়ো না, চুক্তি ভঙ্গকারী হয়ো না। আগ্রাসন বলতে কী বোঝায়?

সে যুগে ইসলামবিরোধীরা পরাজিত সৈন্যদের দেহ ছিন্নভিন্ন করে বিকৃত করতো, এটা সমর নীতির পরিপন্থি, জিঘাংসামূলক অত্যন্ত গর্হিত এক কর্ম। ইসলামে এটি নিষিদ্ধ। শিশু ও নারীদের হত্যা করাও নিষিদ্ধ। ধমীর্য় নেতাদের পাদ্রি-পুরোহিত, রাব্বী, প্রমুখদের তাদের উপাসনালয়ে হত্যা করা সম্পূর্ণ অবৈধ। অন্য কথায়, যুদ্ধ কেবল সমরক্ষেত্রেই সংঘটিত হতে পারে। অথবা অন্য কোনো বিকল্প খুঁজে না পেয়ে যদি শহর বা নগরে যুদ্ধ করতে বাধ্যও হতে হয়, তবুও কেবল তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করা যেতে পারে, যারা বিরোধিতায় আগ বাড়িয়ে অস্ত্র ধারণ করে আক্রমণ চালিয়েছে।

আমরা আজ এটাই দেখছি যে, সুন্দর সাবলীল ও সুগঠিত এসব ইসলামি শিক্ষার ওপর কেউ আমল করছে না। আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীরা শিশু, নারী, বৃদ্ধ, নির্বিশেষে সবাইকে হত্যা করছে, অন্যদিকে আগ্রাসী বাহিনী, শহর নগর-বন্দরে বোমা বর্ষণ করছে, গুলি চালাচ্ছে, করছে অতর্কিত আক্রমণ। তারা নগরগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে নগর অবকাঠামো সমূলে বিনাশ করছে। এতে নাগরিক অধিকারের কিছুই আর অবশিষ্ট থাকছে না।

আজ আমরা অনেক ক্ষেত্রে মহানবির শিক্ষা ভুলে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছি। মহানবির (সা.) মৃত্যুর অল্পদিন আগে বিদায় হজের সময় বিরাট ইসলামি সমাগমকে সম্বোধন করে তিনি (সা.) উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং তোমাদের আদি পিতাও এক। একজন আরব একজন অনারব থেকে কোনো মতেই শ্রেষ্ঠ নয়। তেমনি একজন আরবের ওপর একজন অনারবেরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। একজন সাদা চামড়ার মানুষ একজন কালো চামড়ার মানুষের চাইতে শ্রেষ্ঠ নয়, কালোও সাদার চাইতে শ্রেষ্ঠ নয়।

শ্রেষ্ঠত্বের মূল্যায়ন করতে বিচার্য বিষয় হবে, কে আল্লাহ ও বান্দার হক কতদূর আদায় করলো। এর দ্বারা আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী সেই ব্যক্তি, যিনি সর্বাপেক্ষা বেশি ধর্মপরায়ণ।’ (বায়হাকি) এই মহান শব্দগুলো ইসলামের উচ্চতম আদর্শ ও শ্রেষ্ঠতম নীতিমালার একটি দিক উজ্জ্বলভাবে চিত্রায়িত করেছে। শতধা বিভক্ত একটি সমাজকে অত্যাধুনিক গণতন্ত্রের সমতাভিত্তিক সমাজে ঐক্যবদ্ধ করার কী অসাধারণ উদাত্ত আহ্বান।

বিশ্বাসের স্বাধীনতা হচ্ছে সব মানুষের মৌলিক অধিকার। ইসলাম ধর্মের বিধানমতে ‘ধর্ম’ হচ্ছে নিজ, পছন্দের একটি বিষয়। এ ধর্ম একটি সুস্পষ্ট ধর্ম। এই ধর্ম গ্রহণের পরও চাইলে কেউ এটা ত্যাগ করতে পারে, কোনো জোর নেই, তবে এর বিচার সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিজ হাতেই করেন। ধর্মে যদি বল প্রয়োগের বিধান থাকতো, তাহলে মহানবি (সা.) মক্কা বিজয়ের পর অমুসলমানদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য বাধ্য করতেন এবং মক্কায় বসবাসের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নাই। এতে প্রমাণিত হয়, ধর্মের জন্য বল প্রয়োগ ইসলামের শিক্ষা নয়। ইসলামের আদর্শ হল শত্রুর সাথেও বন্ধুসুলভ আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

আমার ধর্মের সাথে, আমার মতের সাথে, আমার ইবাদতের পদ্ধতির সাথে আরেকজন একমত নাও হতে পারেন, তাই বলে কি তার বিরুদ্ধে আমাকে অবস্থান নিতে হবে? ব্যক্তিগতভাবে আমি কোন দেশের সংস্কৃতিকে পছন্দ নাও করতে পারি তাই বলে এ নিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলার কোনো অনুমতি ইসলাম কেন কোনো ধর্মই দেয় না। আমাদের দেশেও একটি মহল বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার পাঁয়তারা করে আর বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণের চেষ্টা করে কিন্তু এদেশের সচেতন নাগরিক বরাবরই তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।

আরেকটি বিষয় আমাদের মাথায় রাখতে হবে, দেশের আইন আছে। কোনো পরিস্থিতিতেই আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারি না। কেউ যদি সত্যি অপরাধ করে তার বিচার আদালত করবেন। তাই সমাজে যারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করবে তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের প্রতিহত করতে হবে। এটা আমাদের দেশে হোক বা ভিন্ন দেশে। আমরা কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেব না। এদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। হাজার বছরের এই ঐতিহ্যকে কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।

লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

Print Friendly, PDF & Email