সেই ঘাতক চালকের ছিল না লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেসও মেয়াদোত্তীর্ণ

প্রকাশিতঃ 3:22 pm | July 19, 2022

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

ময়মনসিংহে ট্রাকের চাপায় পিষ্ট হয়ে বাবা-মাসহ এক সন্তানের নির্মম মৃত্যু ও অলৌকিকভাবে শিশু ভূমিষ্ঠের ঘটনায় ঘাতক ট্রাকচালককে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব। র‍্যাব জানিয়েছে, ২০১৬ সালের পর থেকে চালক রাজু আহমেদ সিপনের ছিল না ড্রাইভিং লাইসেন্স। ট্রাকের ফিটনেস সার্টিফিকেটও ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ।

মঙ্গলবার (১৯ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

এর আগে ট্রাক চালক রাজু আহমেদ ওরফে সিপনকে ঢাকার সাভার এলাকা থেকে গ্রেফতার করে র‍্যাব।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গত ১৬ জুলাই দুপুরে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার রায়মনি গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম তার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও তার এক কন্যা সন্তানকে নিয়ে রাস্তা পারাপারের জন্য মহাসড়কের পাশে অবস্থান করছিলেন। এসময় ময়মনসিংহগামী একটি ট্রাক বেপরোয়া গতিতে তাদের চাপা দেয়।

দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হয় জাহাঙ্গীর আলম (৩৫), তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রত্মা বেগম (২৬) এবং তার তিন বছর বয়সী কন্যা সন্তান সানজিদা আক্তারকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করে। দুর্ঘটনার সময় অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগমের উপর দিয়ে ট্রাক চলে যাওয়ায় চাকার চাপে গর্ভে থাকা কন্যা সন্তান অলৌকিকভাবে ভূমিষ্ঠ হয়। ভূমিষ্ঠ শিশুটিকে আহত অবস্থায় স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসার উদ্দেশে তাকে ময়মনসিংহ সদরের একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দুর্ঘটনায় নিহত জাহাঙ্গীর আলমের বাবা বাদী হয়ে ১৭ জুলাই ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানায় সড়ক পরিবহন আইনের ৯৮/১০৫ ধারায় একটি মামলা করেন, মামলা নং ১৮।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত জাহাঙ্গীর আলম পেশায় নির্মাণ শ্রমিক। দুর্ঘটনায় নিহত কন্যা সন্তান ছাড়াও তাদের পরিবারে ৮ ও ১০ বয়সী দুই ছেলে ও মেয়ে সন্তান রয়েছে। দুর্ঘটনায় ভূমিষ্ঠ শিশুর ডান হাতের কনুইয়ের উপরের হাড়ে ফ্র্যাকচার ও কলার বোন ভেঙ্গে গেছে বলে জানা যায়।

কমান্ডার মঈন বলেন, বর্তমানে শিশুটি চিকিৎসাধীন রয়েছে। দেশবাসী অসহায় ও নিষ্পাপ শিশুর নির্মমভাবে ভূমিষ্ঠ হওয়া ও পিতা-মাতার মৃত্যুর ঘটনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। মামলার পর দুর্ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে র‌্যাব। র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১৪ অভিযান চালিয়ে গত রাতে ঢাকার সাভার এলাকা থেকে ওই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িত ঘাতক ট্রাক চালক মো. রাজু আহমেদ ওরফে সিপন (৪২)কে গ্রেপ্তার করে। রাজু রাজশাহীর বাঘার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবের কাছে রাজু নিহতদের গাড়ি চাপা দেওয়ার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কমান্ডার মঈন বলেন, গ্রেপ্তার রাজু গত ১১ জুলাই থেকে একটানা মালামাল পরিবহন করে আসছিল। এর মধ্যে সে একবার রাজশাহী থেকে আম নিয়ে কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে মালামাল আনলোড করে পুনরায় রাজশাহী ফিরে আসে।

গত ১৫ জুলাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট থেকে গাড়ির মালিকের আম বোঝাই করে এবং পরে রাজশাহীর নৌহাটা থেকে আরেক দফায় আলু বোঝাই করে কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের এক ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাত ১২টায় রওনা করে। পথে সে হালকা বিরতি নিয়ে দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত একটানা গাড়ি চালিয়ে আসছিল। কিশোরগঞ্জ যাওয়ার পথে ময়মনসিংহের ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ডের কাছে পৌঁছালে রাস্তা পারাপারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা নিহত জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী-সন্তানকে চাপা দেয় সে।

দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন ট্রাকটি থামায়। তখন সুযোগ বুঝে রাজু ঢাকাগামী একটি বাসে উঠে পড়ে। পরে বাস থেকে সে ময়মনসিংহ বাইপাসে নামে এবং সেখান থেকে একটি সিএনজিতে করে প্রথমে মুক্তাগাছা এবং পরে আরেকটি বাসে করে সে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পৌঁছায়। সেখান থেকে সে তার পরিচিত বিভিন্ন ট্রাক চালকের ট্রাকে উঠে আত্মগোপনে থাকে। সোমবার এমন একটি ট্রাক সাভারে পৌঁছালে সেখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার রাজু জানায়, গত ৬/৭ মাস আগে থেকে সে শতকরা ১০ শতাংশ কমিশনে বর্তমান ট্রাকটি চালিয়ে আসছিল। গাড়িটিতে করে সবসময় কাঁচামাল পরিবহন করা হতো। গাড়িটির বর্তমানে ট্যাক্স টোকেন এবং ফিটনেস সার্টিফিকেটের মেয়াদোত্তীর্ণ। গাড়িটির ধারণ ক্ষমতা ৭ টন হলেও দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির ওজন ১৩.৫ টন ছিল বলে জানায়।

ভারী যানবাহন চালানোর জন্য কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই রাজুর। আগে গাড়ির মাঝারি ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল, যা ২০১৬ সালে হারিয়ে ফেলেন।

গ্রেপ্তার রাজু ২০০২ সালে যশোরের এক ট্রাক ড্রাইভারের হেলপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দুর্ঘটনার শিকার হয়। সেসময় বাম পা মারাত্মকভাবে জখম হওয়ায় ছয় বছর গাড়ি চালায়নি। এখনও তার বাম পায়ে সমস্যা রয়েছে। গত ১০ বছর ধরে সে নিয়মিত বিরতিতে ট্রাক চালিয়ে আসছিল। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানায় র‌্যাব।

কালের আলো/এসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email