সুপার হিরোদের জন্য ভালোবাসা

প্রকাশিতঃ 11:22 am | June 10, 2022

প্রভাষ আমিন:

বাংলাদেশের সেবা খাত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা বরাবরই নেতিবাচক। সেবা সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই সেবা খাতের মানুষের। বাংলাদেশে সেবা মানেই ভোগান্তি, সেবা মানেই হয়রানি, সেবা মানেই ঘুস। পাসপোর্ট অফিসে যান, দফায় দফায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। একই অবস্থা এনআইডি সেবা, জন্মনিবন্ধন, জমি নিবন্ধন পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ব্যাংক- সর্বত্র। যেখানেই সেবা, সেখানেই উপচেপড়া ভিড়, সেখানেই দুর্নীতি। বিপদে পড়লে মানুষের থানা বা হাসপাতালে ছুটে যাওয়ার কথা। কিন্তু মানুষ যেতে চায় না। সরকারি হাসপাতালে গেলে দালালের খপ্পরে পড়ার ভয়, বেসরকারি হাসপাতালে গেলে পকেট কাটার ঝুঁকি। থানায় পয়সা ছাড়া নাকি একটা জিডিও করা যায় না। এ তো গেলো সরকারি খাতের কথা। বেসরকারি খাতের অবস্থাও সরকারি খাতের সমান্তরালই। বেসরকারি টেলিফোন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। কিন্তু সেই অভিযোগ করার জায়গাও নেই। সরকারি খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে তবু গণমাধ্যমে মাঝে মধ্যে লেখা হয়। কিন্তু বেসরকারি খাত নিয়ে লেখাও হয় না খুব একটা। বিজ্ঞাপন দিয়ে গণমাধ্যমগুলো কিনে রাখে বেসরকারি সেবা খাতের ডাকাতেরা।

সরকারি-বেসরকারি খাতে সীমাহীন অব্যবস্থাপনার মধ্যেও দুটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম আছে। একটি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, অপরটি পুলিশের ৯৯৯ সার্ভিস। ৯৯৯ নিয়ে আরেক দিন কথা বলবো। আজ বলি ফায়ার ফাইটারদের কথা। আমরা বুঝে না বুঝে ফায়ার সার্ভিসের বিরুদ্ধেও অনেক কথা বলি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেই আমরা লিখি, আগুন লাগার এতক্ষণ পর ফায়ার সার্ভিস এসেছে। তবে মন থেকে বলছি, এই একটি সেবা খাতের ব্যাপারে আমার মনে কোনও বিদ্বেষ নেই, আছে শুধু হৃদয়ভরা ভালোবাসা। আমাদের গ্রামের বাড়ির এক চাচাতো বোনের স্বামী ফায়ার সার্ভিসে চাকরি করতেন। ছেলেবেলায় তার কাছ থেকে ফায়ার ফাইটারদের গল্প শুনতাম। সেই থেকে ফায়ার ফাইটারদের সম্পর্কে আমার মনে সুপার হিরোর অবয়ব আঁকা হয়ে গেছে। দিনে দিনে সেই ছবি আরও স্পষ্ট হয়েছে, কখনোই ম্লান হয়নি।

আমরা কথায় কথায় গালি দেই, আসতে এতক্ষণ লাগলো কেন, আগুন নেভাতে এতক্ষণ লাগছে কেন, পানি নাই কেন, মই নাই কেন; সব দোষ যেন ফায়ার সার্ভিসের। কিন্তু আমরা একবারও পেছনের গল্পটা জানি না, জানার চেষ্টাও করি না। ফায়ার সার্ভিসের মূলমন্ত্র- গতি, সেবা ও ত্যাগ। এই মন্ত্র তারা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন।

ফায়ার স্টেশনগুলোই ফায়ার ফাইটারদের ঘরবাড়ি। তাদের আলাদা বাসা নেই, কোয়ার্টার নেই, পরিবার নেই। সহকর্মীরাই তাদের স্বজন। এখানেই মিলেমিশে থাকা, ভাগাভাগি করে খাওয়াতেই তাদের যত আনন্দ। নির্ধারিত ছুটি বাদ দিলে তারা স্টেশনেই থাকেন এবং সদা প্রস্তুত থাকেন। দৌড়ের জন্য তৈরি হয়ে থাকা দৌড়বিদদের ছবিটি একটু কল্পনা করুন। বাঁশির অপেক্ষায় তৈরি থাকা, হুইসেল বাজলেই তীরের মতো ছুটে চলা। ফায়ার ফাইটারদের জীবন তেমনই। সদা প্রস্তুত। তারা নামাজে দাঁড়ান পেছনের কাতারে একপাশে। যেখানে যে অবস্থায় থাকুক, তাদের ছুটে যেতে হয়। সেটা নামাজ হোক, ঘুম হোক, খাওয়া হোক, গোসল হোক, এমনকি টয়লেটে হোক।

সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে আগুন লাগার খবরটি কুমিরা ফায়ার স্টেশনে পৌঁছেছিল রাত ৯টা ২৫ মিনিটে। ঘণ্টা বাজার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে গাড়িগুলো বেরিয়েছিল। ঘটনাস্থলে যেতে তাদের পাঁচ মিনিট লেগেছিল। আমরা যে দেরির জন্য ফায়ার সার্ভিসকে গালি দেই, দোষ কিন্তু তাদের না। তাদের বেরুতে এক মিনিটও লাগে না। একবার নিজের কথা ভাবুন তো। যত জরুরি খবরই আসুক, আপনি কি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বেরুতে পারবেন? ফায়ার সার্ভিস সবসময় এক মিনিটের কম সময়ে স্টেশন থেকে বেরুনোর জন্য তৈরি থাকে। দেরি হয় আমাদের জন্য। আমরা নিয়ম-কানুন না মেনে রাস্তায় আটকে রাখি, ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকেও জায়গা দিতে চাই না। আমরা রাস্তা দখল করে এমনভাবে বাড়ি বানাই, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার সুযোগ দেই না। উৎসুক জনতা এমনভাবে রাস্তা আটকে রাখে, গাড়ি এগোতে পারে না। পুকুর ভরাট করে বাড়ি বানাই, পরে আগুন নেভানোর পানি পাই না। ঝামেলা করি আমরা, গালিও দেই আমরাই।

ফায়ার সার্ভিস বললেই আমরা বুঝি আগুন নেভানো। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কাজ কিন্তু শুধু আগুন নেভানো নয়। দুর্ঘটনা, লঞ্চডুবি, ভবন ধস- আসলে মানুষের যেকোনও বিপদেই ফায়ার সার্ভিস ছুটে আসে। এমনকি ক’দিন আগে পত্রিকায় দেখেছি, উঁচু ভবনের কার্নিশে আটকে পড়া একটি বিড়াল উদ্ধার করতেও ছুটে এসেছিল ফায়ার সার্ভিস।

সবার বিপদে নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে ছুটে আসে যে ফায়ার ফাইটাররা, তাদের যথাযথ মর্যাদা আমরা দেই না। মর্যাদা তো দেই না, যুদ্ধে নামার জন্য যথাযথ অস্ত্রও দেই না। একটি হিন্দি ছবিতে দেখেছিলাম, নায়ক বলছে, যুদ্ধে জিততে চাই দম। আমাদের দমকল কর্মীদের সেই ‘দম’ আছে ষোলআনা, আর আছে দেশপ্রেম ও মানবতার কল্যাণে ঝাঁপিয়ে পড়ার মনোবল। আর যুদ্ধ করার জন্য আছে মান্ধাতা আমলের কিছু কলকব্জা। বিদেশে যখন আগুন নেভানোর জন্য দূরনিয়ন্ত্রিত নানা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, এমনকি হেলিকপ্টারও কাজে লাগে; তখন আমাদের ভরসা সেই মান্ধাতা আমলের মেশিন আর লম্বা পাইপে পানি ছিটানো। এনটিভি ভবনে আগুনের আগে উঁচু মইও ছিল না আমাদের। এটুকু সামর্থ্য আর আকাশছোঁয়া সাহস নিয়ে ফায়ার ফাইটাররা আগুনে ঝাঁপ দেয়, পানিতে লাফ দেয়।

সীতাকুণ্ডের আগুনে মোট ৪৫ জন মারা গেছেন। এরমধ্যে আছেন ৯ জন ফায়ার ফাইটার। আরও দুই জন ফায়ার ফাইটার নিখোঁজ আছেন। শরীরে ৮০ ও ৫৪ শতাংশ পোড়া নিয়ে বাঁচার জন্য লড়ছেন আরও দুজন। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনই মূল্যবান। তবে ফায়ার ফাইটাররা জীবন দিয়েছেন নিজের জীবনের পরোয়া না করে অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে। এই ৯ জন ফাইটারের প্রত্যেকের জীবনের আলাদা আলাদা গল্প আছে। নিহত ফায়ার ফাইটার মনিরুজ্জামান মাস দেড়েক আগে কন্যা সন্তানের বাবা হয়েছেন। আশা ছিল দুয়েক দিনের মধ্যে ছুটি নিয়ে বাড়ি যাবেন। কন্যার মুখ দেখবেন, আকিকা দেবেন। কিন্তু সন্তানের চেহারা দেখার আগেই তাকে চিরছুটিতে চলে যেতে হলো। রমজানুল ইসলাম নতুন বিয়ে করেছেন, স্ত্রীর হাতের মেহেদির রঙ মুছে যাওয়ার আগেই চলে যেতে হলো তাকে। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর কাছে আর ফেরা হবে না ইমরান হোসেন মজুমদারের।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যারা জীবন দেন, তাদের জন্য সরকার কী করেন জানি না। তবে সাধারণ পেনশনের বাইরেও তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে স্বজন হারানোর কষ্টের পাশে যেন পরিবারকে অনিশ্চয়তায় পড়তে না হয়। দায়িত্ব পালনকালে জীবন দেওয়া ফায়ার ফাইটারদের নাম ফায়ার সার্ভিসের সদর দফতরের অনার বোর্ডে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকে। সীতাকুণ্ডের ঘটনার আগে বাংলাদেশের ৫০ বছরে বিভিন্ন ঘটনায় মোট ১৭ জন ফায়ার ফাইটারকে জীবন দিতে হয়েছে। আর এবার এক সীতাকুণ্ডের ঘটনায়ই প্রাণ গেলো ৯ জনের। এখনকার অনার বোর্ডে একসাথে ৯ জনের নাম লেখার জায়গা নেই। তাই নতুন অনার বোর্ড বানাতে হবে। তবে ফায়ার সার্ভিসের অফিসে গিয়ে সেই অনার বোর্ড দেখার সৌভাগ্য সাধারণ মানুষের হবে না। তাই এই ক্ষুদ্র কলমসৈনিকের ক্ষুদ্র কলামে লিখে রাখলাম সেই জাতীয় বীরদের- সাকিল তরফদার, মিঠু দেওয়ান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মো. রানা মিয়া, মনিরুজ্জামান, রমজানুল ইসলাম, ইমরান হোসেন মজুমদার, নিপন চাকমা ও আলাউদ্দিন।

সিনেমার পর্দার নয়, বাস্তবের এই সুপার হিরোদের জন্য ভালোবাসা।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Print Friendly, PDF & Email