‘সর্বোত্তম নির্বাচন’

প্রকাশিতঃ 10:39 am | January 17, 2022

প্রভাষ আমিন :

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে নানা শঙ্কা, নানা সমীকরণ ছিল। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশ না নিলেও দলটির বহিষ্কৃত নেতা এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্বতন্ত্র হিসেবে অংশ নিয়ে নির্বাচনে বাড়তি উত্তাপ এনেছিলেন। তবে প্রার্থী না হয়েও নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে বরাবরই আলোচনায় ছিলেন শামীম ওসমান। তিনি আওয়ামী লীগের এমপি হলেও তার সমর্থন কার দিকে তা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল।

নানামুখী রাজনৈতিক চাপে দলীয় প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করলেও শামীম ওসমানপন্থিদের মাঠের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা ছিলই। শামীম ওসমান প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন ঘোষণা না করলেও দলীয় প্রতীকের পক্ষে অবস্থান ঘোষণা করেছিলেন। তবে আইভী কখনোই শামীম ওসমানের সমর্থন চাননি, বরং বারবার শামীম ওসমানকে প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তৈমূর আলম খন্দকারকে বলেছেন শামীম ওসমানের প্রার্থী।

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের চাওয়া পূরণ হয়েছে। এখন আমাদের চাওয়া হলো সম্ভাব্য নতুন নির্বাচন কমিশনের কাছে। তারা যেন বর্তমান কমিশন যেখানে শেষ করলো, সেখান থেকেই শুরু করেন। স্থানীয় নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়। তবুও নারায়ণগঞ্জে ফিরে আসা আস্থা যেন বহাল থাকে। নির্বাচন কমিশন চাইলে ভালো নির্বাচন করতে পারে, এই বিশ্বাসটা যেন অটুট থাকে।

আইভী জানতেন, শামীম ওসমানের সমর্থন বরং হিতে বিপরীত হতে পারে। সেলিনা হায়াৎ আইভী ও শামীম ওসমান দুজনেই আওয়ামী লীগ করেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দুজনের ভাবমূর্তিতে আকাশ-পাতাল ফারাক। এত শঙ্কা, এত সমীকরণ, এত হিসাব-নিকাশ ডিঙিয়ে শেষ পর্যন্ত হ্যাটট্রিক জয় পেলেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি প্রমাণ করলেন জনগণের পক্ষে থাকলে জনগণও পক্ষেই থাকে।

আর সেলিনা হায়াৎ আইভীর জয়ে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার হলো, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন আসলে তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন হওয়ার পর তিনটি নির্বাচনেই তিনি মেয়র নির্বাচিত হলেন। এর আগে তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র। সেলিনা হায়াৎ আইভীর পিতা আলী আহমেদ চুনকা দুইবার নারায়ণঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রায় ৭০ হাজার ভোটের জয় দিয়ে আইভী সাফল্যের সঙ্গে পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখলেন।

ব্যক্তি আইভীর জয়ের চেয়েও নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেকদিন পর একটি নির্বাচন সারাদেশেই স্বস্তি এনেছে। অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা শূন্যের কোটায় নেমে এসেছিল। সরকারি দল যাকে ইচ্ছা পাস করাবে, ফেল করাবে; ভোটার নয় পুলিশ আর প্রশাসনই নির্বাচনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। নিজেদের হাতে অনেক ক্ষমতা থাকলেও নির্বাচন কমিশন বরাবরই সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে গেছে।

যেখানে নির্বাচন কমিশন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সেখানে কমিশনই যেন নিয়ন্ত্রিত হতো। এ অবস্থায় নির্বাচনের প্রতি ভোটার-প্রার্থী সবাই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। প্রার্থীর অভাবে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার হিড়িক পরে গিয়েছিল। ভোটাররাও প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য কেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি না থাকায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়ে উঠেছিল একতরফা, একঘেয়ে, ক্লান্তিকর। সেখানে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন এসেছিল দারুণ অ্যাক্সাইটমেন্ট নিয়ে।

আনুষ্ঠানিকভাবে না থাকলেও তৈমূর আলম খন্দকারের পক্ষে মাঠে সক্রিয় ছিল বিএনপির নেতাকর্মীরা। আর আগেই যেমনটি বলেছি, আইভী-শামীম ওসমান দ্বন্দ্ব দারুণ উত্তেজনাও এনেছিল নির্বাচনে। সবকিছুর সমাপ্তি হয়েছে দারুণভাবে। আইভীর জয়ের চেয়ে গণতন্ত্রের জয়টাই বেশি স্বস্তিদায়ক। নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থাটা ফিরে এসেছে দারুণভাবে। সকাল থেকেই কেন্দ্রে কেন্দ্রে ছিল লম্বা লাইন। বাংলাদেশের নির্বাচনের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠা মারামারি নেই, কেন্দ্র দখল নেই, এজেন্ট বের করে দেয়ার অভিযোগ নেই।

দিনভর নির্বাচনী পরিবেশে সন্তোষ প্রকাশ করলেও হেরে যাওয়ার পর তৈমূর আলমও নানা অভিযোগ করেছেন। নির্বাচনপূর্ব ধরপাকড় আর ইভিএম’এর বিরুদ্ধেই ছিল তার যত অভিযোগ। হেরে গেলে অভিযোগ করা আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতির অংশ। তৈমূর আলম খন্দকারের সব অভিযোগ সত্য হলেও নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন একটি ভালো নির্বাচনের উদাহরণ হয়ে থাকবে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশন এখন মেয়াদের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ শেষের আগে এটিই তাদের শেষ বড় কোনো নির্বাচন। গত পাঁচ বছরের মেয়াদে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার কমিশনের ‘বিবেক’এর ভূমিকায় ছিলেন। তিনি বরাবরই নির্বাচন কমিশনের অক্ষমতা, ব্যর্থতা, অদক্ষতা, নতজানু নীতি এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া নির্বাচনী ব্যবস্থার কট্টর সমালোচক ছিলেন। তিনি সবসময় উচ্চকণ্ঠে তার ভিন্নমত তুলে ধরেছেন।

নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে তিনি দিনভর বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। সকালে একটি কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বিদায়লগ্নে একটি ভালো নির্বাচন দেখে যেতে চাই।’ তার চাওয়া পূরণ হয়েছে। নির্বাচন শেষে সন্ধ্যায় কমিশনে ফিরে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। বর্তমান কমিশনের অধীনে এটি সর্বোত্তম নির্বাচন।’

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের চাওয়া পূরণ হয়েছে। এখন আমাদের চাওয়া হলো সম্ভাব্য নতুন নির্বাচন কমিশনের কাছে। তারা যেন বর্তমান কমিশন যেখানে শেষ করলো, সেখান থেকেই শুরু করেন। স্থানীয় নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়। তবুও নারায়ণগঞ্জে ফিরে আসা আস্থা যেন বহাল থাকে। নির্বাচন কমিশন চাইলে ভালো নির্বাচন করতে পারে, এই বিশ্বাসটা যেন অটুট থাকে।
১৬ জানুয়ারি, ২০২২

লেখক : বার্তাপ্রধান,এটিএন নিউজ।

Print Friendly, PDF & Email