উন্নতির সোপানে ‘কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স’, অষ্টম ‘কর্ণেল কমান্ড্যান্ট’ হলেন সেনাপ্রধান

প্রকাশিতঃ 7:03 pm | November 24, 2021

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :

প্রায় ৫ মাস আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্যে দিয়ে ‘কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স’ সঙ্গে সুদৃঢ় হয়েছিল তাঁর সম্পর্ক। বহমান এই সম্পর্কে এবার সূত্রপাত হলো নব অধ্যায়ের। চৌকস প্যারেডের মাধ্যমে এই কোরের অষ্টম ‘কর্ণেল কমান্ড্যান্ট’ হিসেবে বুধবার (২৪ নভেম্বর) অভিষিক্ত হয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ। এরই মধ্যে দিয়ে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেলো তাদের মধ্যকার সম্পর্ক।

উচ্ছ্বাস-আনন্দের অবগাহনে বিশেষ এই দিনটিতে ‘কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স’র অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান ও আধুনিকায়নে সমৃদ্ধ করতে নিজের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সেনাপ্রধান। আহবান জানিয়েছেন, একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তত করারও।

একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ ও গতিশীল নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর দুর্বার অগ্রযাত্রার বিষয়ও উপস্থাপন করেছেন মোটা দাগে। তিনি বলেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক নির্দেশনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অভূতপূর্ব আধুনিকায়নের মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন হচ্ছে।’

বুধবার (২৪ নভেম্বর) সকালে নাটোরের কাদিরাবাদ সেনানিবাসে ইঞ্জিনিয়ার সেন্টার অ্যান্ড স্কুল অব মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শহীদ শামসুল হুদা প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স’র অষ্টম ‘কর্ণেল কমান্ড্যান্ট’ হিসেবে অভিষেক ও বাৎসরিক অধিনায়ক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

উন্নতির সোপানে ‘কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ক্রমশ উন্নতির সোপানে আরোহণ করে চলছে ‘কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স’। সেনাবাহিনীর উন্নয়নের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে দেশগঠনমুলক কর্মকান্ডেও।সামরিক রীতি ও ঐতিহ্য মেনে এই কোরের ‘কর্ণেল কমান্ড্যান্ট’র আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। অভিষেক অনুষ্ঠানে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স’ জ্যেষ্ঠতম অধিনায়ক এবং মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার এদিন সেনাপ্রধানকে ‘কর্নেল র‌্যাংক ব্যাজ’ পরিয়ে দেন।

সূত্র জানায়, ‘কর্ণেল কমান্ড্যান্ট’ হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পর নিজের বক্তব্যের শুরুতে সেনাপ্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেন ইতিহাসের মহান নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যার আহবানে সাড়া দিয়ে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স এর সদস্যরা আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদদের।

আমি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সাথে স্মরণ করছি যাদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয়েছে আমাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতা। আমি আরও স্মরণ করছি, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ১ হাজার ৫৩৩ জন শহীদ বীর সেনানীদেরকে, যারা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অকাতরে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। যার মধ্যে ৮৮ জন ছিল কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স এর সদস্য।

আমি অত্যন্ত গর্বের সাথে এবং গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এই কোরের একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান, মুক্তিযুদ্ধে শাহাদৎ বরণকারী বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে। এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস দমন অভিযানে জীবন উৎসর্গ করা ১৭০ জন বীর শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। যার মধ্যে ১৯ জন ছিলেন কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স এর সদস্য।

কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স’র ইতিহাস
সেনাপ্রধান বক্তব্যে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স এর ইতিহাস তুলে ধরেন। কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন এই কোরের প্রাক্তন কর্নেল কমান্ড্যান্ট ও সেন্টার কমান্ড্যান্টসহ কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সদের। মূলত তাদের নিরলস পরিশ্রম ও অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এই কোর আজ সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স এর ইতিহাস ঐতিহ্যময় ও বীরত্বগাঁথায় সমুজ্জ্বল। স্বাধীনতার পরে কতিপয় অফিসার এবং সৈনিক নিয়ে শহীদ ক্যাপ্টেন মুহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের আত্মত্যাগের গৌরবে গৌরবান্বিত হয়ে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সের যাত্রা শুরু হয়।

স্বাধীন দেশে স্যাপার্সের কোন বিদ্যমান ইউনিট ছিল না, কোন সেন্টার বা রেকর্ড ছিল না। পাকিস্তানিদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বেশিরভাগ কর্মকর্তা ও সৈনিকদের অন্তরীণ করে রাখা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর সেনাবাহিনী কমান্ড কর্তৃক প্রদত্ত একটি সমনে স্যাপার্স কর্মকর্তারা ঢাকায় একত্রিত হন।

এরই ধারাবাহিকতায় সর্বপ্রথম ১ ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়। পরবর্তীতে এই ব্যাটালিডনের ফিল্ড কোম্পানীসমূহকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়নে রূপান্তর করা হয়। এছাড়াও সদরঘাটের এইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিকে ঢেলে সাজিয়ে ‘রিভার সাপোর্ট ইউনিট’ নামে পুন:র্গঠন করা হয়।’

দেশগঠনমূলক কর্মকান্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই কোর আপন মহিমা, স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্যে ইতোমধ্যেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশ ও জাতি গঠনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিশেষ করে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা, দেশের উন্নয়ন কাজে নিরলসভাবে অংশগ্রহণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করছে সেনাবাহিনী। সন্ত্রাস দমনসহ কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ, ঢাকার হাতিরঝিল রাস্তা নির্মাণ ও বৌদ্ধবিহার স্থাপনের মত উন্নয়নমূলক কাজ করছে সেনাবাহিনী।

সেনাবাহিনীকে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন
জেনারেল শফিউদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন বিশ্বের এক নম্বর শান্তিরক্ষী বাহিনী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্বন্দ্ব নিরসন করে শান্তি স্থাপনে কাজ করছে এবং সবার কাছে প্রশংসিত হচ্ছে।’

এর আগে সেনাপ্রধান প্যারেড স্কয়ারে পৌঁছালে তাকে আনুষ্ঠানিক অভিবাদন জানানো হয় এবং কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স’র একটি চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বগুড়া এরিয়ার বিভিন্ন পদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/জিকেএম/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email