একসময় ইউরোপের আকাশে দেখা যেত বাল্ড আইবিসের ঝাঁক। কিন্তু মানুষের নানা কর্মকাণ্ড, আবাসস্থল ধ্বংস ও অন্যান্য হুমকির কারণে মহাদেশটি থেকে হারিয়ে যায় পাখিটি। প্রায় ৩০০ বছর ইউরোপে দেখা মেলেনি তার। এখন সেই পাখিকেই আবার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ চলছে। আর এই পুনরুদ্ধার অভিযানে এক অদ্ভুত পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন সংরক্ষণবিদেরা—ছোট বিমান উড়িয়ে পাখিদের শেখানো হচ্ছে পরিযায়ী পথ।
সম্প্রতি অস্ট্রিয়া থেকে ১৫টি বাল্ড আইবিসকে স্পেনের উত্তরাঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের নতুন দলে যুক্ত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজেরা পথ চিনে পরিযান করতে পারে, সে প্রস্তুতিও চলছে। এ কাজে পাখিদের সামনে পথ দেখাচ্ছে একটি মাইক্রোবিমান। বিমানটি অনুসরণ করে পাখিরা নতুন এলাকায় পৌঁছাচ্ছে।
লক্ষ্য, স্পেনের আলত এম্পোরদা অঞ্চলে এমন একটি স্বনির্ভর বন্য দল গড়ে তোলা, যারা নিজেরাই বংশবিস্তার করবে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিযায়ী যাত্রা চালিয়ে যেতে পারবে।
অদ্ভুত চেহারার এক পরিযায়ী পাখি
বাল্ড আইবিসের বৈজ্ঞানিক নাম Geronticus eremita। মাথার বেশির ভাগ অংশে পালক নেই, ঠোঁট লম্বা ও বাঁকানো। দেখতে অদ্ভুত হলেও পাখিটি সামাজিক ও বুদ্ধিমান। একসময় ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের দেখা মিলত।
কিন্তু মানুষের কর্মকাণ্ড ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারানোর কারণে পাখিটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যায়। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে মরক্কোতে থাকা এদের শেষ বড় বন্য দলের সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার থেকে কমে মাত্র ২৫০-তে নেমে এসেছিল। এমন পরিস্থিতিতে প্রজাতিটি রক্ষায় শুরু হয় বন্দী অবস্থায় প্রজনন এবং পরে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ।
প্রকৃতিতে ফেরানোর দীর্ঘ পরিকল্পনা
বাল্ড আইবিস সংরক্ষণে অস্ট্রিয়া ও স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় স্পেনের কাতালোনিয়ার আলত এম্পোরদা এলাকায় ২০২৪ সালে শুরু হয় নতুন উদ্যোগ। ২০২৫ সালের মধ্যে সেখানে প্রায় ৬০টি পাখির একটি দল তৈরি হয়। ২০২৬ সালের মার্চে পাখিগুলোকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে পাখিদের মুক্ত করে দিলেই সংরক্ষণের কাজ শেষ হয় না। তাদের বেঁচে থাকা, বংশবিস্তার এবং পরিযায়ী পথে নিরাপদে যাতায়াতের সক্ষমতা তৈরি করাও জরুরি। বিশেষ করে যেসব পাখি বন্দী অবস্থায় জন্মেছে, তাদের জন্য পথ চেনা বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা জীববিজ্ঞানী বার্নাত গারিগোসের ভাষ্য অনুযায়ী, বাল্ড আইবিস খুব বুদ্ধিমান ও সামাজিক পাখি। প্রতিটি পাখির রয়েছে আলাদা ব্যক্তিত্ব। নতুন কিছু দেখলে ঠোঁট দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। মানুষের প্রতিও এদের ভয় তুলনামূলক কম।
পাখিদের ‘পালক মা-বাবা’ হয়ে উঠছেন প্রশিক্ষকেরা
পরিযায়ী পাখিরা অনেক সময় জন্মের পর প্রথম যাত্রায় নিজেরাই পথ চিনতে পারে না। তাই সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রশিক্ষকেরা তাদের সামনে পথ দেখানোর দায়িত্ব নিচ্ছেন। ওয়ালড্রাপ প্রকল্পের প্রশিক্ষকেরা অতি হালকা বা মাইক্রোবিমানে উড়ে পাখিদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যান। পাখিরা বিমানটি অনুসরণ করে নতুন এলাকায় পৌঁছায়।
এ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষকেরা যেন পাখিদের ‘পালক মা-বাবা’র ভূমিকা পালন করছেন। তাদের উদ্দেশ্য, পাখিদের এমন একটি পরিযায়ী পথ শেখানো, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মও অনুসরণ করতে পারবে।
এই কৌশলে এরই মধ্যে প্রায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। অস্ট্রিয়া ও স্পেনের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়মিত যোগাযোগ রাখে এবং আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়। এর ফলে পাখিদের মৃত্যুহার আগের তুলনায় কমেছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি।
বাসা বাঁধা ও বংশবিস্তারের প্রস্তুতি
সংরক্ষণবিদেরা আশা করছেন, আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে আলত এম্পোরদা প্রকল্পে প্রথম প্রজননজোড়া তৈরি হতে পারে। সাধারণত বাল্ড আইবিস তিন থেকে চার বছর বয়সে প্রজনন শুরু করে।
পাখিদের জন্য এলাকায় বাসা তৈরির ব্যবস্থাও করা হবে। কিছু বাসা আংশিকভাবে মানুষ তৈরি করে দেবে, যাতে পাখিরা সেগুলো দেখে নিজেরা বাসা বানানো শিখতে পারে। অর্থাৎ শুধু পরিযায়ী পথ নয়, প্রকৃতিতে টিকে থাকার আরও প্রয়োজনীয় আচরণও তাদের শেখানোর চেষ্টা চলছে।
১০ বছরে ৩০০ বন্য পাখির লক্ষ্য
আলত এম্পোরদা প্রকল্পের লক্ষ্য, আগামী ১০ বছরে এলাকায় অন্তত ৫০টি প্রজননজোড়া এবং প্রায় ৩০০টি বন্য বাল্ড আইবিস গড়ে তোলা। এ পরিকল্পনায় অস্ট্রিয়া, স্পেনের আন্দালুসিয়া ও আলত এম্পোরদার প্রকল্পগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
পাখিরা এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পরিযান করলে বিভিন্ন দলের মধ্যে প্রজননের সুযোগ তৈরি হবে। এতে জিনগত বৈচিত্র্য বাড়বে এবং পুরো প্রজাতির টিকে থাকার সম্ভাবনাও শক্তিশালী হবে।
বাল্ড আইবিসকে ইউরোপের আকাশে ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগ দেখাচ্ছে, বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণ শুধু তাদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার বিষয় নয়। কখনো কখনো তাদের হারিয়ে যাওয়া জীবনযাপনের অভ্যাসও ফিরিয়ে দিতে হয়। আর সেই কাজে মানুষের ছোট বিমান হয়ে উঠেছে এক অপ্রত্যাশিত পথপ্রদর্শক।
কালের আলো/এএএন/জেএন
