প্রধানমন্ত্রীর ‘ঈদ উপহার’; মুখ্য সচিবের বক্তব্যে এখন চুপসে গেছে ওরা!

প্রকাশিতঃ 10:02 am | May 18, 2020

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :

বরাবরই চমক দিতেই ভালোবাসেন বঙ্গবন্ধু কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিটি ঈদ উৎসবেই দেশবাসীকে কোন না কোন উপহার প্রদান করেন। করোনা সঙ্কটের সময়ে ঈদ উপহার অবশ্যই ব্যতিক্রম। এবার দেশের ৫০ লাখ পরিবারকে দেওয়া হচ্ছে এক হাজার ২৫০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা।

রিকশা ও ভ্যানচালক, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, পোল্ট্রি খামারের শ্রমিক, বাস-ট্রাকের পরিবহন শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার দরিদ্র মানুষ এ তালিকার আওতায় এসেছেন। ইতোমধ্যেই তালিকা অনুযায়ী পরিবার প্রতি তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে আড়াই হাজার টাকা।

এই টাকায় কেউ পরিবারের দৈনন্দিন বাজার খরচ মেটাচ্ছেন। কেউ সীমিত পরিসরে ঈদ কেনাকাটা আবার অনেকেই সন্তানের দুধ বা খাতা-কলম কিনছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঈদ উপহারে নিম্ন আয়ের এসব পরিবারে অবারিত আনন্দের ফল্গুধারা তৈরি হয়েছে।

তবে ৫০ লাখ পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নগদ টাকা দেওয়ার এ তালিকার ভুল ভ্রান্তি নিয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম সমালোচনায় মুখর হয়েছে।

অবস্থা এমন যেনতেনভাবে তালিকায় নাম থাকলেই উপকারভোগীরা টাকা পেয়ে যাবে! কিংবা এ টাকা নিয়ে ঢালাও অনিয়ম-দুর্নীতির মহোৎসব চলবে!

অনেক উপকারভোগীর নামের পাশে একটি মোবাইল নাম্বার থাকার বিষয়টি পুঁজি করেই গুটিকয়েক গণমাধ্যম ঢালাওভাবে মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীর এ উপহারকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউস বিষয়টি পরিস্কার করেছেন।

দেশের প্রথম সারির একটি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ৫০ লাখ দরিদ্র মানুষকে নগদ আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ নেই।

এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বেশির ভাগ তথ্য সঠিক নয়। আর তালিকায় নাম থাকলেই কেউ নগদ টাকা পেয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়।’

কীভাবে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে, কোন কোন বিষয় ঠিক থাকলে তবেই তাঁর কাছে নগদ ২ হাজার ৫০০ টাকা পৌঁছবে ইত্যাকার বিষয় বুদ্ধির সঙ্গে যুক্তির যুগপৎ সম্মিলনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

আদতে উপকারভোগীর নামের সঙ্গে থাকা মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করেই মূলত এ টাকা ছাড় দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বলতর এমন উপস্থাপনের ফলে পুরো বিষয়টি জনমানসে খোলাসা হয়ে যাওয়ায় রীতিমতো এখন যেন ‘মাথায় হাত’ পড়েছে সেইসব গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের! মুহুর্তেই ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেছেন তারা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ‘ঈদ উপহার’ হিসেবে এই নগদ সহায়তা দিতে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, শিক্ষক এবং সমাজের ‘গণ্যমান্য ব্যক্তিদের’ সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হয়।

নিম্ন আয়ের নানা পেশার মানুষের নাম রয়েছে এই তালিকায়। পুরো কার্যক্রম দেখভাল করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

চারদিন আগে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তালিকাভুক্ত ৫০ লাখ পরিবারের মাঝে প্রথম পর্যায়ে সাড়ে সাত লক্ষ অতি দরিদ্রদের মাঝে টাকা বিতরণ করা হচ্ছে।

নাম, পেশা, মোবাইল নাম্বার ও জাতীয় পরিচয়রপত্রে নানা অসঙ্গতির কারণে ইতোমধ্যেই বাদ পড়েছে প্রায় ১০ লাখ নাম।

তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবেই উপকারভোগীদের হাতে টাকা পৌঁছানোর বিষয়টি নিবিড়ভাবে মনিটরিং করছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউস নিজেই। নাম, মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র মিল থাকলেই কেবলমাত্র উপকারভোগী টাকা পাচ্ছেন।

সূত্র মতে, তালিকাভুক্তদের কাছে নগদ, বিকাশ, রকেট ও শিওরক্যাশের মাধ্যমে সরাসরি চলে যাচ্ছে এই টাকা। ফলে বাড়তি কোন ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না। টাকা পাঠানোর খরচও সরকার নিজেই দিচ্ছে।

৫০ লাখ পরিবারের মধ্যে ১৭ লাখ পরিবারের কাছে টাকা পৌঁছে দিচ্ছে ডাক বিভাগের মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অতি দরিদ্র ৫০ লাখ মানুষের মাঝে নগদ ২ হাজার ৫’শ টাকা বিতরণের এ কর্মসূচিকে ‘জি টু বি’ অর্থাৎ গভর্নমেন্ট টু বেনিফিশিয়ারি বা সরকার থেকে সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউস।

সরকার ও উপকারভোগীর মাঝে তৃতীয় পক্ষের ঢুকে ফায়দা নেওয়ার কোন সুযোগ নেই বলেও চোখে আঙুল দিয়েই দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি।

বলেছেন, ‘একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে পুরো কাজটি সম্পন্ন করা হচ্ছে। নাম, মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়ত্রের তথ্যে গরমিল পাওয়া গেলে তার নাম বাদ পড়বে। এখানে কারও চেষ্টা বা তদবিরের সুযোগ থাকছে না।’

গুটিকয়েক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সামান্য ভুল ভ্রান্তির বিষয়টি নিয়ে অতি উৎসাহী বাগাড়ম্বরের বিষয়েও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন ড.কায়কাউস।

তিনি বলেন, ‘কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খবর থেকে মনে হবে যে, তালিকা পাঠালেই তা অনুমোদন হয়ে যাচ্ছে। আসলে বিষয়টি মোটেও তা নয়।’

‘বিশেষভাবে তৈরি একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই তালিকা যাচাই-বাছাই হচ্ছে। এখানে অনিয়মের সুযোগ নেই।

তাঁর মতে, ত্রুটিপূর্ণ নাম সফটওয়্যারে চিহ্নিত হবে এবং এগুলো ধরা পড়ায় ঢালাওভাবে টাকা দেওয়া হচ্ছে না’ যোগ করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব।

প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহারে জালিয়াতির সুযোগ নেই উল্লেখ করে দৃঢ়তার সঙ্গেই ড.আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘আমি বলব, এখানে জালিয়াতি করাটা খুব কঠিন। ধরা যাক, পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একজন জনপ্রতিনিধি একাধিক নামের বিপরীতে একটি মোবাইল নম্বর দিয়েছে।

কিন্তু সফটওয়্যার একটির বেশি মোবাইল নম্বর নেবে না। আবার যাদের নাম সুবিধা প্রত্যাশী হিসেবে এসেছে, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম ও পেশা উল্লেখ আছে এবং এই পরিচয়পত্র ন্যাশনাল ডেটাবেইস সংযুক্ত রয়েছে। সফটওয়্যার সেসব তথ্য কিন্তু সহজেই পেয়ে যাচ্ছে।

তাই তালিকা পাঠালেই নগদ টাকা চলে যাবে, এমনটি ভাবার কারণ নেই। তারপরও যদি কেউ অনিয়মের চেষ্টা করে তাহলে রেহাই পাবে না। কারণ এই রেকর্ডগুলো কিন্তু সরকারের কাছে রয়ে গেল। এটা খতিয়ে দেখারও সুযোগ থাকছে।’

অসহায়ের শেষ ভরসা প্রধানমন্ত্রী
দলমত নির্বিশেষ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অসহায় ও দরিদ্র মানুষ প্রধানমন্ত্রীর এ নগদ অর্থ সহায়তা পাচ্ছেন। অনেকেই নগদ টাকা হাতে পেয়েছেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর এ উপহারে যারপরেনাই খুশি। তারা বলছেন, অসহায় মানুষের শেষ ভরসা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই।

আলাপ হয় সাভারের পরিবহন শ্রমিক কামাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, গাড়ির চাকা বন্ধ থাকায় আয় বন্ধ। হাতে কোন কাজ নেই। কিন্তু ঈদে নিজেদের জন্য না হলেও অন্তত দুই সন্তানের জন্য নতুন জামা কিনতে হবে। একটু ভাল খাবারের ব্যবস্থাও করতে হবে।

মোবাইল ফোনে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার আড়াই হাজার টাকা পেয়েছেন নিজের এ্যাকাউন্টে। এতে দুশ্চিন্তা কমেছে।

নওগাঁর রানী আক্তারও পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার। রিকশা চালক স্বামীর কাজ বন্ধ তাই ঈদ তো পরের কথা সংসারের প্রতিদিনের খরচ চালানেই যখন কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন এ টাকাই তাদের স্বস্তির কারণ।

তিনি বলেন, ‘করোনা আসার পর থেকে আমাদের কোন কাজ-কর্ম নেই। এ টাকা দিয়েই আমাদের বাচ্চাদের দুধ কিনছি, চাল-ডাল কিনছি; বাচ্চাদের খাতা-কলম কিনছি। একই রকমের কথা বলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নীলফামারী, গোপালগঞ্জ, বরিশালের বাকেরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার উপকারভোগীরা।

কালের আলো/জেপি/এসআর

Print Friendly, PDF & Email