সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কোয়ারেন্টাইন; ভয়-আতঙ্ক কাটিয়ে দেশবাসীর মাঝে সাহসের সঞ্চার

প্রকাশিতঃ 12:27 pm | March 21, 2020

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো :

প্রাণসংহারী রুদ্র রূপ ধারণ করেছে করোনাভাইরাস। গোটা বিশ্বেই এর সংক্রমণ গিয়ে ঠেকেছে চূড়ান্ত পর্যায়ে। বাংলাদেশকেও ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছেন বিদেশ ফেরত যাত্রীরা। এই দেশেও কোভিড-১৯ রোগটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগেই এই যুদ্ধে জিততে সতর্কতামূলক পদক্ষেপেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার।

বিদেশফেরতদের বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অনেককেই সেখানে রাখা যাচ্ছে না। কেউ কেউ পালিয়ে যাচ্ছেন আবার আইন প্রয়োগ করেও তাদের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।

নতুনভাবে করোনা আক্রান্ত রোধ করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেই আস্থা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিপজ্জনক সময়ের আগেই সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বিদেশ থেকে আগতদের কোয়ারেন্টাইন দেশপ্রেমিক এই বাহিনীর তত্ত্বাবধানে করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

সংক্রমণ, বিস্তৃতির সম্ভাব্যতা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সেনাবাহিনীর মাধ্যমে প্রথম দিকে বিমানবন্দর-সংলগ্ন হজক্যাম্প এবং উত্তরার দিয়াবাড়ি (সেক্টর-১৮) সংলগ্ন রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে দু’টি কোয়ারেন্টাইন সেন্টার স্থাপন করা হয়।

শনিবার (২১ মার্চ) থেকে বিমানবন্দর-সংলগ্ন হজক্যাম্পে পুরোমাত্রায় কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সুবিশাল পরিসরে, মনোরম পরিবেশে এই কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে প্রায় ৬ শতাধিক মানুষকে পর্যবেক্ষণে রাখা সম্ভব হবে।

বিদেশফেরত যাত্রীদের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে করোনায় আক্রান্ত সন্দেহ হলে তাদের সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। তাদের কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে বাসস্থান, চিকিৎসা সেবাসহ যাবতীয় সেবাপ্রদানের ব্যবস্থা করবে তারা। খবর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রের।

তবে দিয়াবাড়ির কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের সাময়িক অসন্তোষের জন্য এই সেন্টারের কার্যক্রম শুরু বিলম্ব হচ্ছে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যেই এই কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ।

নতুনভাবে করোনা আক্রান্ত রোধ করতে বিদেশ ফেরতদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর কাঁধে তুলে দেওয়ায় শঙ্কিত এবং উদ্বিগ্ন ষোল কোটির বাংলাদেশের মানুষের মাঝে নতুন সাহসের সঞ্চার হয়েছে।

অনেকেই বলছেন, দেশের জনগণের অবিচ্ছেদ্য অংশ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবেলাসহ দেশের আর্থ-সামাজিক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভয়-শঙ্কা ও প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করে জাতিগত বিরোধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পিছিয়ে পড়া দেশসমূহে সাধারণ মানুষের আশা-ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন লাল-সবুজের দেশের গর্বিত এই সামরিক বাহিনী।

দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মোতাবেক ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকার বিষয়টি এখন সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেওয়ায় করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে বড় রকমের ইতিবাচক পথেই হেঁটেছে সরকার।

দেশের সাধারণ মানুষের আস্থার শেষ ঠিকানা হিসেবে বিবেচিত এই বাহিনীর সদস্যরা এই দায়িত্ব পালন করায় বাস্তবিক অর্থেই সবার মাঝে নিয়ম মানার প্রবণতা তৈরি হবে।

স্বাভাবিকভাবেই কোয়ারেন্টাইনের বিষয়ে বহমান চরম অবহেলা বা গাফিলতিও দূর হবে। বিদেশ ফেরত যাত্রীদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও হ্রাস পাবে। স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও আর থাকবে না।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, প্রাণঘাতী করোনা কতটা ভয়াবহ, আক্রান্ত দেশ থেকে নিজের দেশে ফিরলে কোয়ারেন্টাইন কেন জরুরি, আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে কীভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এসব বিষয়াদি এখন বিদেশ ফেরত প্রবাসীরা সেনাসদস্যদের নিয়ন্ত্রণে থেকে সহজেই অনুধাবন করবেন।

কারণ, দেশের প্রতিটি নাগরিকের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। নিজেদের পেশাদারিত্ব, সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার মাধ্যমেই তারা বিশ্বের নানা প্রান্তে লাল-সবুজের পতাকার সম্মান আরও উজ্জ্বল করেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য বলছে, গত দুই মাসে সমুদ্র, সড়ক ও আকাশপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৭৪২ জন। যাদের বেশির ভাগই কোভিড-১৯ এর মহামারী চলছে, এমন দেশ থেকে এসেছেন। সতর্কতার জন্য দেশের প্রবেশপথগুলোতে এসব যাত্রীর স্ক্রিনিং করা হয়।

তবে সংক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পেতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগায় স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে যাত্রীদের মধ্যে কেউ যে ভাইরাসটির বাহক তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাহকরা দেশে ফিরে বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে এসে নিজের অজান্তেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

এমন কঠিন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত কোয়ারেন্টাইন সেন্টার আক্রান্তদের সুরক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও করোনা মহামারির মূর্তমান ভয়-আতঙ্ক থেকে সহজেই মুক্তি দিবে বলে মনে করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড.এ.এইচ.এম. মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘অনেক প্রবাসীরা হোম কোয়ারেন্টাইনের নিয়মাবলি মানেননি। ১৪ দিন বাসায় থাকার বদলে তারা এদিক-ওদিক ঘুরাঘুরি করছেন। জেল জরিমানা করেও তাদের নিয়ম মানানো যায়নি। এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমানবন্দর থেকেই সেনা তত্ত্বাবধানে কোয়ারেন্টাইনের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা জনমনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

দেশের প্রতিটি মানুষ মাত্রই জানেন আমাদের সেনাসদস্যদের অকৃত্রিম দেশপ্রেম, কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলাবোধ ও দায়িত্ব পালনের আন্তরিকতা প্রশ্নাতীত। তারা যে কাজটি সুচারুরূপে বাস্তবায়ন করার প্রচেষ্টা নিবেন সেই কাজে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পূর্ণ সহযোগিতামূলক মনোভাব কাজ করে, যোগ করেন এই উপাচার্য।

দেশ ও জাতির প্রতিটি সংকটময় মুহুর্তেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একাগ্রতা ও নানা জনসেবামূলক কর্মকান্ড সময়ে সময়ে তাদের প্রতি সার্বজনীন আস্থার উজ্জ্বল ভাবমূর্তি বিনির্মাণ করেছে- এমন মন্তব্য করেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড.সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ।

কালের আলো’র সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সঠিক সময়েই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তার এই সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোয়ারেন্টাইন না মানা প্রবাসীদের যদি বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে আনার ক্ষেত্রেও যদি সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তবে সম্ভাব্য কঠিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। সেনাবাহিনী এক্ষেত্রেও সফলতার পরিচয় দিতে সক্ষম হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’

প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ যে কোন সংকটময় মুহুর্তের কথা উঠলেই অবধারিতভাবে অগ্রভাগে চলে আসে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর নাম। দেশের সাধারণ মানুষ মনে করেন, প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগেই বুক চিতিয়ে দেশ ও মানবতার স্বার্থে এগিয়ে সময়ে সময়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করায় সব সময় সেনাবাহিনীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ঝরে মুজিব কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখেও। সব অনুষ্ঠানেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে কোনো দুর্যোগের সময় আমাদের সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষের জানমাল রক্ষা করছে।

বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের পাশাপাশি দেশ গঠনেও তাদের ভূমিকার পাশাপাশি বিদেশেও আমাদের সেনাবাহিনী তাদের কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে।’

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদও নিজের প্রতিটি বক্তব্যে দু’টি বিষয় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ফোকাস করেন। প্রথমটি হচ্ছে জাতীয় যে কোন প্রয়োজনে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকারে প্রস্তুত।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে- সেনাবাহিনী প্রথাগত কাজের পাশাপাশি অর্থনৈতিক এবং অবকাঠামোগত উন্নতিসহ সকল উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে যখনই সুযোগ আসবে তখনই তাতে অংশগ্রহণ করে দেশের অগ্রগতির এই ধারাকে অব্যাহত রাখার লক্ষে সরকারকে সহযোগিতা করবে।

সেনাপ্রধানের এমন গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপন যেন প্রকারান্তরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল অতীতকেও স্মরণ করিয়ে দেয়। পার্বত্য এলাকায় পাহাড় ধস, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল, বজ্রপাত, ভূমিকম্পসহ সব রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য।

এই বাহিনীর সদস্যরা দেশ ও মানুষের জন্য বারবার জীবনবাজী রেখেছেন। দেশ মাতৃকার কাজে উৎস্বর্গ করেছেন নিজেদের জীবনও। ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে সেনাবাহিনী দেশ-বিদেশে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে।

বিশ্বের বুকে দাঁড়িয়েছে মাথা তুলে। নিজেদের আধুনিক ও যুগোপযোগী সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে করেছে সুপ্রতিষ্ঠিত।

দেড় শতাধিকের ওপরে দেশে ত্রাস সৃষ্টি করা করোনাভাইরাস বাংলাদেশে সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দূর করতে এই কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের দায়িত্ব পালনের মধ্যে দিয়ে আবার নিজের দেশকে নিরাপদ করতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী।

কারণ, সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ প্রায় সময়েই বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি জাতীয় প্রয়োজনে যেকোন দায়িত্ব পালনে সক্ষমতা অর্জন করেছে।’

কালের আলো/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email