Kaler Alo
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬
১৮ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৬, ০৫:২০ পিএম

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ ও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতন!

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৬, ০৫:২০ পিএম

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ ও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতন!

কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি পুরোনো প্রচলিত সত্য রয়েছে—কোনো রাষ্ট্রনায়কের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত তার দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচের ওপর নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার কিংবা সামরিক বীরত্ব প্রদর্শন সাময়িকভাবে জাতীয়তাবাদী আবেগ চাঙা করতে পারলেও, তা কোনো দেশের মেহনতি কিংবা মধ্যবিত্ত মানুষের রান্নাঘরের বাজেট বা গাড়ির ফুয়েল ট্যাংকের হিসাব বদলে দেয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক এই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে দেশটির ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টিকে।

চলতি বছরের নভেম্বর মাসের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি ও এজেন্ডা পর্যালোচনার কথা ছিল, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে জোট বেঁধে ইরানে সামরিক হামলা চালানোর অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকম্প তৈরি করেছে। যুদ্ধ শুরুর পরবর্তী প্রভাবে বিশ্ববাজারে খনিজ তেলের অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির তীব্র ধাক্কা এবং সাধারণ আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাকে নামিয়ে এনেছে ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন স্তরে।

রয়টার্স-ইপসোসের সাম্প্রতিকতম জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের সার্বিক কর্মকাণ্ডকে মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিনি সমর্থন করছেন—যা তাঁর দুই মেয়াদের সামগ্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এই গণ-অসন্তোষ কেবল ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বাড়ায়নি, বরং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্যাপিটল হিলের কংগ্রেস অর্থাৎ রিপ্রেজেন্টেটিভ হাউস ও সিনেট রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অসারতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসী সামরিক হস্তক্ষেপের খেসারত কীভাবে একজন বিশ্বনেতাকে নিজের দেশেই ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে, তারই এক বস্তুনিষ্ঠ ও গভীর বর্ণনামূলক রূপরেখা এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে এই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে একাধিক জোরালো শিরোনাম তৈরি হতে পারে, যেমন—‘ওয়াশিংটনের জ্বালানি সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতন কেন অনিবার্য ছিল?’, ‘তেলের অগ্নিমূল্য ও ব্যালট বাক্সের হুমকি: মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে ট্রাম্পের ব্যাকফুট রাজত্ব’, ‘ইরানে সামরিক হামলা ও মার্কিন অর্থনীতি: আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির খেসারত দিচ্ছে রিপাবলিকানরা’, কিংবা ‘হোয়াইট হাউসের জনপ্রিয়তা সংকট: ক্যাপিটল হিলের নিয়ন্ত্রণ কি ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাচ্ছে?’।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে যে সামরিক হামলা চালানো হয়েছিল, তাকে প্রাথমিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসন নিজ দেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি যে কেবল একক কোনো পরাশক্তির ইচ্ছানুযায়ী চলে না, এই পরম সত্যটি অনুধাবন করতে ট্রাম্প ও তাঁর পরামর্শকরা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘায়িত যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মার্কিন জনগণ ভালোভাবেই জানে যে মধ্যপ্রাচ্যে অহেতুক সামরিক অভিযান কখনোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারেনি, বরং তা মার্কিন করদাতাদের ট্রিলিয়ন ডলার গিলে খেয়েছে। ইরানে সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন মূলত পারস্য উপসাগরের কৌশলগত তেলের পথ ও আন্তর্জাতিক শিপিং রুটগুলোকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়ে এক মারাত্মক অস্থিতিশীলতার জন্ম দিয়েছে। বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিকা না বুঝে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চমক তৈরি করতে যে যুদ্ধের উন্মাদনা ছড়ানো হয়েছিল, তা এখন ট্রাম্পের জন্য এক মারাত্মক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতির এই ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মার্কিন জনগণকে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ পাম্প স্টেশনগুলোতে। পেট্রলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকায় তা যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন বাজেটকে পুরোপুরি লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। আমেরিকান সমাজে পরিবহনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে পেট্রলের এই অগ্নিমূল্য সরাসরি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প যখন ‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তোলার’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মূল্যস্ফীতি কমানোর। কিন্তু তেহরানে সামরিক পদক্ষেপের খেসারত হিসেবে এখন সাধারণ আমেরিকানকে প্রতি গ্যালন ফুয়েলের জন্য দ্বিগুণ অর্থ গুনতে হচ্ছে। সাধারণ ভোটাররা আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল সমীকরণ বোঝেন না, তাঁরা দিনশেষে বিচার করেন তাঁদের পকেটের অবস্থা কেমন। জ্বালানির এই লাগামহীন দাম ট্রাম্পের অর্থনৈতিক দক্ষতার ভুয়া দাবিকে পুরোপুরি উন্মোচিত করে দিয়েছে।

বাস্তবতার এই করুণ চিত্র ধরা পড়েছে রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জনমত জরিপে। চার দিন ধরে পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, দুই সপ্তাহ আগের তুলনায় ১ শতাংশ পয়েন্ট কমে বর্তমানে মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করছেন, যা তাঁর দুই মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ট্রাম্প কেবল বিরোধী শিবিরেই নয়, নিজের দলের ভেতরেও জনসমর্থন হারাচ্ছেন। জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে ৬৮ শতাংশ মানুষই ট্রাম্পের অর্থনীতি পরিচালনার বিষয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে ৩৭ শতাংশ মানুষ নিজেদের কট্টর রিপাবলিকান হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। অর্থনীতি পরিচালনায় এখন ভোটাররা রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের বেশি যোগ্য মনে করছেন, যা মার্কিন রাজনীতির ঐতিহ্যবাহী হিসাব-নিকাশকে বদলে দিচ্ছে।

কংগ্রেসের আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিচালিত ‘জেনেরিক ব্যালট’ জরিপে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটরা ৪৭ শতাংশ সমর্থন পেয়ে রিপাবলিকানদের চেয়ে ১২ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন, যেখানে রিপাবলিকানদের সমর্থন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশে। দুই সপ্তাহ আগের ৭ শতাংশের ব্যবধান একলাফে ১২ শতাংশে উন্নীত হওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য এক বিশাল অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। রিপাবলিকানদের ভোটব্যাংক ধসে যাওয়ার পেছনে নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট। জরিপ অনুযায়ী, ৫০ শতাংশ নারী ভোটার ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন, অন্যদিকে রিপাবলিকানদের পক্ষে মত দিয়েছেন মাত্র ৩২ শতাংশ নারী। অর্থাৎ নারীদের মধ্য থেকে ১৮ শতাংশ পয়েন্টের এই বিরাট ব্যবধান মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য বড় বিপর্যয়ের বার্তা নিয়ে এসেছে।

৩ নভেম্বরের নির্বাচনে যদি ডেমোক্র্যাটরা ইউএস প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের অন্তত একটিরও নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে পারেন, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর হবে চরম স্থবিরতা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার। কারণ, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর অর্থ হলো ট্রাম্পের যেকোনো নীতি পাস করার ক্ষেত্রে তীব্র বাধার সম্মুখীন হওয়া, একের পর এক সংসদীয় তদন্তের মুখোমুখি হওয়া এবং পররাষ্ট্রনীতিতে একচ্ছত্র ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরা। যদিও কিছু নির্বাচনী এলাকায় ভৌগোলিক কাঠামোগত সুবিধার কারণে রিপাবলিকানরা লড়াইয়ে টিকে থাকার আশা রাখছেন, তবুও জনগণের ক্ষোভের যে তরঙ্গ তৈরি হয়েছে, তা প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন হবে।

পরিশেষে বলা যায় যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনে দূরদর্শী কোনো রাষ্ট্রনায়কোচিত চিন্তার চেয়ে সাময়িক হাততালি কুড়ানোর সস্তা পপুলিজমই প্রধান ছিল। ইরানে হামলা চালিয়ে তিনি কেবল বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকেই বিনষ্ট করেননি, বরং নিজের দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের রুজি-রুটিতেও আঘাত হেনেছেন। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ইতিহাসভিত্তিক এই ধস কোনো আকস্মিক বিষয় নয়, বরং এটি তাঁর ভুল নীতি, খামখেয়ালি আচরণ এবং অপরিণামদর্শী পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের এক স্পষ্ট অনাস্থা। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্যাপিটল হিলের ব্যালট বাক্সে মার্কিন জনগণই চূড়ান্ত রায় দেবেন যে তাঁরা এক স্বৈরাচারী পপুলিস্ট শাসকের খেসারত আর কত দিন বহন করবেন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

 

Link copied!