বলিউডের ‘বাদশা’ শাহরুখ খান। অভিনয়, জনপ্রিয়তা ও তারকাখ্যাতির পাশাপাশি ব্যবসার জগতেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অনন্য উচ্চতায়। একসময় বাবার পকেটে সিনেমার টিকিট কেনার টাকা না থাকায় প্রেক্ষাগৃহে ঢুকতে পারেননি ছোট্ট শাহরুখ। ছেলের মন খারাপ হতে পারে ভেবে সেদিন সিনেমার বদলে রাস্তা দিয়ে চলা গাড়ি দেখিয়েই তাঁকে আনন্দ দিয়েছিলেন বাবা। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছেলেই হয়ে উঠেছেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী চলচ্চিত্র তারকা এবং সফল উদ্যোক্তা।
২ নভেম্বর শাহরুখ খানের ৬১তম জন্মদিন। জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবনের সেই আবেগঘন স্মৃতি এবং কীভাবে অভিনয়ের পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য।
টিকিটের টাকা ছিল না, গাড়ি দেখেই কেটেছিল দিন
২০১২ সালে একটি অনুষ্ঠানে নিজের ছেলেবেলার একটি স্মৃতির কথা জানিয়েছিলেন শাহরুখ। দিল্লির কমানি অডিটোরিয়ামের কাছে বাবার হাত ধরে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে জানতে পারেন, সিনেমার টিকিট কেনার মতো টাকা নেই তাঁর বাবা তাজ মোহাম্মদ খানের কাছে।
সিনেমা দেখা না হলেও ছেলেকে হতাশ হতে দেননি বাবা। অডিটোরিয়ামের বাইরে বসে ছোট্ট শাহরুখকে রাস্তা দিয়ে চলাচল করা গাড়ি দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘দেখো, রাস্তা দিয়ে গাড়িগুলো কেমন সুন্দর চলে যাচ্ছে!’
সেদিন সিনেমার বদলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি দেখেই আনন্দে কেটেছিল শাহরুখের সময়। বহু বছর পর নিজের ছেলে আরিয়ান খানকে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখতে গিয়ে সেই স্মৃতি মনে পড়ে যায় তাঁর। একসময় যে ছেলেকে টিকিটের অভাবে সিনেমা দেখা হয়নি, সময়ের ব্যবধানে সেই শাহরুখই নিজের সন্তানকে নিয়ে সিনেমা দেখার সুযোগ পেয়েছেন।
অল্প বয়সেই হারিয়েছেন বাবা-মাকে
শাহরুখের জীবনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর বাবা তাজ মোহাম্মদ খান। এরপর ১৯৯০ সালে মাকেও হারান তিনি। জীবনের শুরুর দিকে আর্থিক অনটনসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।
বাবাকে নিয়ে একবার শাহরুখ বলেছিলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ব্যর্থ মানুষ এবং আমি তাঁকে নিয়ে গর্বিত।’ বাবার সঙ্গে কাটানো সেই ছোট্ট স্মৃতি আজও তাঁর মনে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। জীবনের সাফল্য, খ্যাতি কিংবা বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার পরও শৈশবের সেই দিনটি ভুলে যাননি অভিনেতা।
রেড চিলিজ দিয়ে ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের শুরু
অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যবসায়িক জগতে শাহরুখের বড় পদক্ষেপ ছিল প্রযোজনা সংস্থা রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট। ২০০২ সালে স্ত্রী গৌরী খানকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন তিনি। প্রথম দিকে সিনেমা প্রযোজনায় মনোযোগ দিলেও সময়ের সঙ্গে ব্যবসার পরিধি বেড়েছে।
‘ওম শান্তি ওম’, ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ ও ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর মতো জনপ্রিয় সিনেমা প্রযোজনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি রেড চিলিজ ভিএফএক্সের মাধ্যমে বলিউডের অন্যতম বড় ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস প্রতিষ্ঠান হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে তারা। এ ছাড়া ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য কনটেন্ট নির্মাণেও যুক্ত রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বিশ্বব্যাপী ক্রিকেট ব্যবসা
শাহরুখের সম্পদের অন্যতম বড় উৎস ক্রিকেট ব্যবসা। ২০০৮ সালে আইপিএল শুরুর সময় কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিকানার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। তাঁর হাত ধরে কেকেআর শুধু একটি ক্রিকেট দল নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিচিতিসম্পন্ন ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।
আইপিএলে ২০১২, ২০১৪ ও ২০২৪ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কলকাতা নাইট রাইডার্স। বর্তমানে নাইট রাইডার্স গ্রুপের অধীনে রয়েছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের ত্রিবাগো নাইট রাইডার্স, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি নাইট রাইডার্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস নাইট রাইডার্স।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পোমোনায় নিজেদের ক্রিকেট স্টেডিয়ামও উদ্বোধন করেছে নাইট রাইডার্স গ্রুপ। ফলে ক্রিকেট ব্যবসায়ও শাহরুখের বিনিয়োগের পরিধি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে।
বিজ্ঞাপনের বাজারেও শীর্ষে শাহরুখ
ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট বা বিজ্ঞাপনের বাজারেও শাহরুখের চাহিদা তুঙ্গে। ক্রলের সেলিব্রিটি ব্র্যান্ড ভ্যালুয়েশন ২০২৫ অনুযায়ী, তাঁর ব্র্যান্ড ভ্যালু ১৭৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা।
২০২৪ সালে ২৮টি ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৩৬টিতে দাঁড়িয়েছে। হুন্দাই থেকে দুবাই ট্যুরিজম—বিভিন্ন খাতের বড় প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে দেখা যায় তাঁকে। তারকাখ্যাতি ও দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা তাঁকে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় মুখ করে তুলেছে।
ছেলে আরিয়ানের সঙ্গে বিলাসবহুল ব্র্যান্ড
শাহরুখের ব্যবসায়িক উদ্যোগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছেলে আরিয়ান খানের সঙ্গে গড়ে তোলা বিলাসবহুল লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘ডি’ইয়াভল’। প্রিমিয়াম ফ্যাশন ও বিলাসবহুল পণ্যের বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে ব্র্যান্ডটি। এর সঙ্গে রেডিকো খৈতানের মতো প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বও রয়েছে।
এ ছাড়া শাহরুখের পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন খাতে অর্থ বিনিয়োগ করেছে। শিশুদের জন্য জনপ্রিয় এডুটেইনমেন্ট পার্ক কিডজানিয়াতেও তাঁর বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানা যায়। প্রযুক্তি, রিয়েল এস্টেট ও মিডিয়া-প্রযুক্তি খাতের স্টার্টআপেও তাঁর বিনিয়োগের কথা উঠে এসেছে।
মান্নাত থেকে দুবাই, ছড়িয়ে আছে সম্পত্তি
শাহরুখের বিপুল সম্পদের বড় একটি অংশ রিয়েল এস্টেট বা স্থাবর সম্পত্তি। মুম্বাইয়ের সমুদ্রতীরবর্তী বাড়ি ‘মান্নাত’ শুধু তাঁর আবাসস্থল নয়, ভক্তদের কাছে একটি দর্শনীয় স্থানও। এ ছাড়া দুবাইয়ের পাম জুমেইরাতে তাঁর বিলাসবহুল ভিলা রয়েছে। লন্ডনসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানেও সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা যায়।
সিনেমাই আয়ের মূল ভিত্তি
ব্যবসার নানা খাতে বিনিয়োগ থাকলেও শাহরুখের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস এখনো সিনেমা। অভিনয়ের পারিশ্রমিকের পাশাপাশি সিনেমা প্রযোজনা থেকে মুনাফা এবং লাভের অংশীদারত্বের মাধ্যমেও আয় করেন তিনি। ফলে একটি সিনেমার সঙ্গে তাঁর আয়ের একাধিক দিক যুক্ত থাকে।
হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট ২০২৬ অনুযায়ী, শাহরুখ খানের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এই সম্পদ তাঁকে ভারতের সবচেয়ে ধনী অভিনেতার অবস্থানে নিয়ে গেছে।
একসময় বাবার পকেটে টিকিটের টাকা না থাকায় সিনেমা দেখতে না পারা সেই কিশোর আজ সিনেমার পর্দা থেকে ক্রিকেট, বিজ্ঞাপন, বিনিয়োগ ও রিয়েল এস্টেট—বিভিন্ন খাতে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। তবে হাজার কোটি টাকার সম্পদ আর বিশ্বজোড়া খ্যাতির আড়ালেও বাবার সঙ্গে কাটানো ছোট্ট সেই দিনের স্মৃতি তাঁর জীবনের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায় হয়ে রয়েছে। সূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস, দ্য ওয়াল
কালের আলো/এসএ/জেএন
