রুপালি পর্দায় তার উপস্থিতি মানেই বাড়তি আকর্ষণ। রেড কার্পেটে পা রাখলেই ক্যামেরার সব আলো যেন এসে পড়ে তার ওপর। পোশাক, সাজসজ্জা কিংবা ব্যক্তিত্ব—সবকিছুতেই রয়েছে আভিজাত্যের ছাপ। বলিউড অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন শুধু অভিনয়শিল্পী নন, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনেও তিনি এক পরিচিত ও প্রভাবশালী নাম। তিন দশকের বেশি সময় ধরে নিজের সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও পোশাকের বৈচিত্র্যে বিশ্বজুড়ে ভক্তদের মুগ্ধ করে চলেছেন তিনি।
১ নভেম্বর ৫৩ বছরে পদার্পণ করেছেন এই বলিউড তারকা। জন্মদিনের এই বিশেষ মুহূর্তে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার দীর্ঘ ফ্যাশনযাত্রা। ১৯৯৪ সালে মিস ওয়ার্ল্ডের মুকুট জয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পাওয়া ঐশ্বরিয়া পরবর্তী সময়ে অভিনয়ের পাশাপাশি ফ্যাশন দুনিয়াতেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। বিশেষ করে কান চলচ্চিত্র উৎসবের রেড কার্পেটে তার উপস্থিতি প্রতিবছরই তৈরি করে নতুন আলোচনা।
মিস ওয়ার্ল্ড থেকে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আইকন
১৯৯৪ সালে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার পর থেকেই ঐশ্বরিয়ার সৌন্দর্য নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। তবে কেবল সৌন্দর্যের পরিচয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং পোশাক নির্বাচনের নিজস্ব রুচির মাধ্যমে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনের পরিচিত মুখ।
বলিউডের পাশাপাশি হলিউডের বিভিন্ন আয়োজন, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ইভেন্ট এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে তার উপস্থিতি তাকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। প্রতিটি আয়োজনে পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভিন্নতা ও নিজস্বতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন এই অভিনেত্রী।
কানের রেড কার্পেটে ঐতিহ্যের প্রথম ঝলক
ঐশ্বরিয়ার ফ্যাশনযাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ২০০২ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব। ‘দেবদাস’ সিনেমার প্রিমিয়ারে ডিজাইনার নীতা লুল্লার তৈরি হলুদ-সোনালি রঙের রেশমি শাড়ি পরে প্রথমবারের মতো কানের রেড কার্পেটে হাজির হন তিনি।
সেদিনের সাজে ছিল ভারতীয় ঐতিহ্য, আভিজাত্য ও সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয়। পশ্চিমা ফ্যাশনের দাপটের মধ্যে শাড়ি পরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিত হয়ে ভারতীয় পোশাকের সৌন্দর্য তুলে ধরেছিলেন তিনি। সেই উপস্থিতি পরবর্তী সময়ে কানের রেড কার্পেটে তার ফ্যাশন পরিচয়ের ভিত্তি তৈরি করে।
এরপর থেকে কান চলচ্চিত্র উৎসব হয়ে ওঠে ঐশ্বরিয়ার ফ্যাশন প্রদর্শনের অন্যতম বড় মঞ্চ। কখনো ঐতিহ্যবাহী শাড়ি, কখনো আধুনিক কাটের গাউন—প্রতিবারই নতুন কোনো সাজে আলোচনায় এসেছেন তিনি।
সিন্ডারেলা গাউনে মুগ্ধ করেছিল বিশ্বকে
২০১৭ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ঐশ্বরিয়ার আকাশি রঙের বিশাল গাউন ফ্যাশনপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বিখ্যাত ডিজাইনার মাইকেল সিনকোর নকশা করা পোশাকটি ছিল অনেকটা রূপকথার রাজকন্যার পোশাকের মতো। বিশাল আকৃতির গাউন, নিখুঁত নকশা এবং তার সৌন্দর্যের সমন্বয়ে সেদিনের উপস্থিতি হয়ে ওঠে স্মরণীয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে তার সেই লুকের ছবি। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন সাময়িকী ও বিনোদনমাধ্যমে প্রশংসিত হয় তার পোশাক নির্বাচন। অনেকের কাছেই এটি কানের রেড কার্পেটে ঐশ্বরিয়ার সবচেয়ে স্মরণীয় ফ্যাশন মুহূর্তগুলোর একটি।
বেগুনি লিপস্টিকে সাহসী ফ্যাশন বার্তা
ঐশ্বরিয়ার ফ্যাশন সেন্সের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার সাহস। ২০১৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে বেগুনি রঙের লিপস্টিক ব্যবহার করে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি।
তার এই ব্যতিক্রমী সাজ নিয়ে ফ্যাশন বিশ্লেষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল নানা মত। কেউ প্রশংসা করেছেন সাহসী সিদ্ধান্তের, আবার কেউ সমালোচনাও করেছেন। তবে প্রশংসা কিংবা সমালোচনা—দুই ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন ঐশ্বরিয়া। ফ্যাশনে নিজের পছন্দ ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য।
পশ্চিমা গাউন থেকে বেনারসি শাড়িতেও সমান সাবলীল
ঐশ্বরিয়ার পোশাক নির্বাচনের বৈচিত্র্য তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। আন্তর্জাতিক ডিজাইনার এলি সাব, জর্জিও আরমানি ও রবার্তো কাভালির নকশা করা পশ্চিমা গাউনে যেমন তাকে দেখা গেছে, তেমনি ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাকেও তিনি সমানভাবে নজর কেড়েছেন।
সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়, গৌরব গুপ্তা ও মনীশ মালহোত্রার নকশা করা শাড়ি ও জমকালো পোশাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন এই অভিনেত্রী। বেনারসি শাড়ি, ভারী অলংকার এবং ঐতিহ্যবাহী সাজের সঙ্গে আধুনিক ফ্যাশনের সমন্বয় ঘটাতে তার জুড়ি মেলা ভার।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় পোশাকের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে ঐশ্বরিয়ার উপস্থিতি বরাবরই প্রশংসিত হয়েছে। তার পোশাক নির্বাচন শুধু ব্যক্তিগত সৌন্দর্য প্রকাশের বিষয় নয়, বরং ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরারও একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালেও রাজকীয় সাজে নজর কেড়েছেন
সময় বদলেছে, ফ্যাশনের ধারা বদলেছে, কিন্তু ঐশ্বরিয়ার আভিজাত্যে ভাটা পড়েনি। ২০২৫ সালে ডিজাইনার মনীশ মালহোত্রার নকশা করা রাজকীয় বেনারসি পোশাকে তার উপস্থিতি আবারও আলোচনায় আসে।
ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গে মানানসই অলংকার ও পরিমিত সাজে তিনি প্রমাণ করেছেন, ফ্যাশনে আধুনিকতার পাশাপাশি নিজের সাংস্কৃতিক শেকড় ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে পশ্চিমা পোশাকের পাশাপাশি ভারতীয় ঐতিহ্যকে তুলে ধরার এই প্রবণতা তার নিজস্ব স্টাইলের অন্যতম পরিচয়।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে স্টাইল, কমেনি আভিজাত্য
ঐশ্বরিয়ার ফ্যাশনযাত্রা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে তার পোশাক ও সাজসজ্জায় এসেছে নানা পরিবর্তন। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে যেখানে ছিল গ্ল্যামারনির্ভর সাজ, পরবর্তী সময়ে সেখানে যুক্ত হয়েছে আধুনিকতা, পরীক্ষামূলক ফ্যাশন এবং ঐতিহ্যের মেলবন্ধন।
কখনো নজরকাড়া গাউন, কখনো সাধারণ অথচ মার্জিত পোশাক, আবার কখনো ভারী অলংকারে রাজকীয় উপস্থিতি—সব ধরনের সাজেই নিজের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তার ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, পোশাকের ধরন বদলালেও নিজস্ব আভিজাত্য ধরে রাখা।
বলিউডের অসংখ্য তারকা আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে পরিচিতি পেলেও ঐশ্বরিয়ার অবস্থান আলাদা। কারণ, তিনি শুধু পোশাকের মাধ্যমে সৌন্দর্য প্রকাশ করেননি, বরং ভারতীয় ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিচিত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছেন।
সব মিলিয়ে তিন দশকের বেশি সময়ের এই পথচলা প্রমাণ করে, ফ্যাশন কেবল বয়স কিংবা সময়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব ও নিজস্ব রুচিই একজনকে আইকন করে তোলে। আর সেই জায়গায় ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন আজও ফ্যাশন দুনিয়ার অন্যতম আলোচিত নাম।
কালের আলো/এসএ/জেএন
