চিকিৎসক হয়েও তাঁর চিন্তা সীমাবদ্ধ ছিল না শুধু চিকিৎসকদের পেশাগত উন্নয়ন কিংবা কল্যাণে। তিনি ভাবতেন পুরো চিকিৎসাব্যবস্থার কথা। চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট—স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরের মানুষের দক্ষতা, মর্যাদা ও উন্নয়নকে দেখতেন একটি মানসম্মত চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলার অংশ হিসেবে। চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্য প্রশাসন ও পেশাজীবী সংগঠন—সবখানেই ছিল তাঁর নেতৃত্বের স্বাক্ষর। সেই দূরদর্শী চিকিৎসা ব্যক্তিত্ব, প্রয়াত অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুল হাদী (এম এ হাদী) সম্পর্কে গভীর শ্রদ্ধা ও মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন নারী ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এমপি।
- চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টদের উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা
- শুধু চিকিৎসক নয়, পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে ভাবতেন এম এ হাদ
- ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা ও গবেষণা জোরদারের আহ্বান
তিনি বলেছেন, 'বাংলাদেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে কোনো দূরদর্শী ব্যক্তিত্বের কথা স্মরণ করলে অধ্যাপক ডা. এম এ হাদীর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হবে। তিনি কেবল চিকিৎসকদের পেশাগত উন্নয়ন ও কল্যাণেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; নার্স, টেকনোলজিস্টসহ সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থার মানোন্নয়নে যুগান্তকারী অবদান রেখে গেছেন।'
সোমবার (০২ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ ডা. মিলন হলে অধ্যাপক এম এ হাদীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা ও স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
স্মৃতিচারণে উঠে এল একটি চিকিৎসাদর্শন
অধ্যাপক এম এ হাদীকে স্মরণ করতে গিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে তাঁর চিন্তার ব্যাপ্তি। একজন চিকিৎসক হিসেবে ব্যক্তিগত সাফল্যের বাইরে গিয়ে তিনি সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। চিকিৎসকদের পেশাগত কল্যাণের পাশাপাশি নার্স ও টেকনোলজিস্টদের ভূমিকা এবং সামগ্রিক চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে তাঁর অবদানই তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে বলে মন্ত্রীর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়।
এই স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়েই সামনে আসে বর্তমান চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মন্ত্রীর প্রত্যাশা। তিনি বলেন, 'দেশটা আমাদের সবার, এ দেশের মানুষকে সেবা করার দায়িত্বও আমাদের সকলের। এই দায়িত্ববোধ থেকেই বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফার্ডকৃত রোগীদের জন্য বছরের ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।'

চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সেবাকেন্দ্র নয়, হতে হবে গবেষণারও কেন্দ্র
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে প্রচলিত ধারার বাইরে এসে কাজ করার আহ্বান জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পায় চিকিৎসা গবেষণার প্রসার এবং চিকিৎসকদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করার বিষয়টি। মন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমকে আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকদের মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণায় ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা বৃদ্ধির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি দিতে হবে। অর্থাৎ, একজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই চিকিৎসাব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
চিকিৎসা প্রশাসন, শিক্ষা ও সংগঠনে বহুমাত্রিক নেতৃত্ব
১৯৪১ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুল হাদী। ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) থেকে সার্জারিতে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি, ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এই গুণী চিকিৎসক।
এ ছাড়া বিসিপিএস, বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি) এবং ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) শীর্ষ পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। চিকিৎসাসেবা, মেডিকেল শিক্ষা ও চিকিৎসক সমাজের উন্নয়নে তাঁর অবদান দেশের চিকিৎসা অঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে আছে। ২০০৭ সালের ১৬ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সময়ানুবর্তিতা থেকে রোগীর প্রতি মমত্ববোধ—স্মৃতিতে জীবন্ত এম এ হাদী
স্মরণসভায় উপস্থিত আলোচক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও অধ্যাপক এম এ হাদীর কর্মময় জীবনের নানা দিক শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তাঁর কঠোর সময়ানুবর্তিতা, পেশাগত নিষ্ঠা, চিকিৎসাসেবায় ঐতিহাসিক ভূমিকা, রোগীদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের বিষয়গুলো আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু এমপি এবং ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন এমপি।
অধ্যাপক ডা. এম এ হাদী ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক ডা. মোফাখখারুল ইসলাম রানার সভাপতিত্বে সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএমএ ও ড্যাবের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক, বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম, বিএনপির পরিবার কল্যাণবিষয়ক কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রফিকুল কবীর লাবু এবং প্রধানমন্ত্রীর সহকারী ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. আ ন ম মনোয়ারুল কাদির বিটু।
এ ছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ড্যাবের কেন্দ্রীয় নেতারা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন জাতীয় ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা এবং মরহুমের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
উত্তরাধিকার শুধু স্মৃতিতে নয়, চিকিৎসাব্যবস্থার অগ্রযাত্রায়
অধ্যাপক এম এ হাদীর কর্মজীবনের দিকে তাকালে চিকিৎসা পেশার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য প্রশাসনে নেতৃত্ব, মেডিকেল শিক্ষার প্রসার, গবেষণা এবং রোগীর কল্যাণ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সম্পৃক্ততার চিত্র পাওয়া যায়। সমাজকল্যাণমন্ত্রীর স্মৃতিচারণে সেই বহুমাত্রিক অবদানের পাশাপাশি উঠে এসেছে বর্তমান প্রজন্মের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি দায়িত্বের বার্তাও।
একজন চিকিৎসক কীভাবে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে ভাবতে পারেন, কীভাবে শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসাসেবাকে একই সূত্রে যুক্ত করতে পারেন—অধ্যাপক এম এ হাদীর কর্মময় জীবন তারই একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভায় মন্ত্রীর বক্তব্যে তাই শুধু অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং সেই দূরদর্শী চিন্তাকে ধারণ করে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে আরও মানবিক, আধুনিক ও জনকল্যাণমুখী করে তোলার প্রত্যাশাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে
