নিজে থাকেন ভাড়া বাসায়। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চলে তাঁর সংসার। পেশায় একজন অটোচালক। আয়ও সীমিত। তবু নিজের সামর্থ্যের মধ্যে প্রতিদিন অসহায়, মানসিক ভারসাম্যহীন ও ভবঘুরে মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন মো. বিল্লাল। মানুষের সহযোগিতা নিয়ে তাঁর এই উদ্যোগে প্রতিদিন খাবার পান ২৫ থেকে ৩০ জন।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়ন হেডকোয়ার্টার এলাকার বাসিন্দা বিল্লাল। প্রতিদিন দুপুরে উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও সড়কে ঘুরে ঘুরে এসব মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেন তিনি। নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি অসহায় মানুষের জন্য তাঁর এই উদ্যোগ স্থানীয়দের কাছেও প্রশংসিত হচ্ছে।
একটি পারিবারিক আয়োজনের ভাবনা থেকে শুরু
বিল্লালের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর আগে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা থেকেই এই মানবিক কাজের শুরু। তখন মানসিক ভারসাম্যহীন ও ভবঘুরে মানুষদের খাবার খাওয়ানোর চিন্তা মাথায় আসে তাঁর। প্রথমবার তাদের খাবার দেওয়ার পর এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি অনুভব করেন। সেই ভালো লাগা থেকেই নিয়মিত তাদের পাশে থাকার চেষ্টা শুরু করেন তিনি।
এরপর থেকে প্রতিদিনের রুটিনে জায়গা করে নেয় খাবার বিতরণের কাজ। সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুর ১২টার পর থেকে টানা তিন-চার ঘণ্টা চলে তাঁর এই কার্যক্রম। খাবার তৈরিতে সহযোগিতা করেন স্ত্রী। রান্না শেষে খাবার নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও সড়কে যান বিল্লাল। তাঁকে দেখামাত্রই খাবার নিতে ছুটে আসেন অনেক ভবঘুরে মানুষ।
একদিনের খাবারে খরচ আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত
এই উদ্যোগ চালিয়ে যেতে প্রতিদিনই অর্থের প্রয়োজন হয়। কখনো ভাত-মাংস, আবার কখনো খিচুড়ি রান্না করে বিতরণ করেন বিল্লাল। একদিন খাবার বিতরণে তাঁর খরচ হয় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। তবে নিজের আয় সীমিত হওয়ায় সব সময় এই ব্যয় বহন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না।
বিল্লাল বলেন, মাঝেমধ্যে মানুষের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। তখন খাবার দেওয়াও সম্ভব হয় না। তিনি নিজেও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় কোনো রকমে জীবনযাপন করেন। সামর্থ্য থাকলে হয়তো কারও কাছে সহযোগিতা চাইতে হতো না। তিনি আরও বলেন, মানুষ যদি নিয়মিত সহযোগিতা করেন, তাহলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে থাকতে চান তিনি।
স্থানীয়দের চোখে মানবিকতার দৃষ্টান্ত
বোয়ালখালী বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. রাকিব বলেন, বিল্লালকে প্রায়ই মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের মধ্যে খাবার বিতরণ করতে দেখা যায়। এসব মানুষের পাশে নিয়মিত এভাবে কাউকে দাঁড়াতে দেখা যায় না। তাঁর মতে, বিল্লাল মানবিকতার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। সমাজের অনেক মানুষ যখন ভবঘুরে ও অসহায় মানুষদের এড়িয়ে চলেন, তখন বিল্লাল তাঁদের আপন করে নিয়েছেন। নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও প্রতিদিন খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
একজন সাধারণ অটোচালক হয়েও বিল্লালের এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিত্তশালী হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সহমর্মিতা ও মানবিক মানসিকতা। তবে এই কার্যক্রম নিয়মিত চালিয়ে নিতে মানুষের সহযোগিতাও জরুরি। স্থানীয়দের সম্মিলিত সহায়তা পেলে আরও দীর্ঘদিন অসহায় মানুষগুলোর মুখে খাবার তুলে দিতে পারবেন বলে আশা তাঁর।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
