Kaler Alo
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬
১৮ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৬, ০৬:২১ পিএম

দুই মেয়ের স্বপ্ন পূরণে হালিমার কঠিন জীবনসংগ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৬, ০৬:২১ পিএম

দুই মেয়ের স্বপ্ন পূরণে হালিমার কঠিন জীবনসংগ্রাম

স্বামী পঙ্গু, সংসারে চার সন্তান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ৩৯ বছর বয়সী হালিমা বেগম। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, পড়াশোনার খরচ জোগানো এবং অসুস্থ স্বামীর দেখভাল—সব দায়িত্ব একাই সামলাচ্ছেন তিনি। এ জন্য দিনের বেলায় রাজধানীর রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান, আর রাতে কাজ করেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে। সাত-আট বছর ধরে এভাবেই চলছে তাঁর জীবনসংগ্রাম।

হালিমার বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে। বর্তমানে পরিবার নিয়ে থাকেন রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তিতে। তাঁর দুই মেয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। মায়ের স্বপ্ন, বড় হয়ে তারা হাফেজা হবে। সন্তানদের সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই নিজের কষ্টকে উপেক্ষা করে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন হালিমা।

রাতে ঝাড়ু, দিনে রিকশার হ্যান্ডেল
রাজধানীর গরমে যখন রাস্তায় চলাচল করাই কষ্টকর, তখন সেই রোদ মাথায় নিয়েই রিকশা চালান হালিমা। রাতে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে রাস্তা ঝাড়ু দেন। কাজ শেষে সকালে বাসায় ফিরে রান্না করেন, পরিবারের সদস্যদের খাওয়ানোর পর কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে আবার বেরিয়ে পড়েন রিকশা নিয়ে।

 হালিমা বলেন, ‘আমার মতো কষ্ট যেন আমার সন্তানদের করা না লাগে, সেই কারণেই এত খাটনি করি।’ তাঁর এই কঠিন জীবন শুরু হয়েছে একদিন-দুইদিন নয়, প্রায় সাত-আট বছর আগে। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের লেখাপড়া এবং স্বামীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে প্রতিদিনই তাঁকে দুই ধরনের কাজ করতে হচ্ছে।

শৈশবেও ছিল কঠিন জীবনসংগ্রাম
দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া হালিমার জীবনে দুঃখের শুরু শৈশব থেকেই। মাত্র চার বছর বয়সে রেলস্টেশন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর প্রায় তিন বছর রাস্তায় কাটাতে হয়েছে। ভিক্ষা করে খাবার জোগাড় করেছেন, কুড়িয়েছেন প্লাস্টিক।

শৈশবের সেই কষ্টের স্মৃতি স্মরণ করে হালিমা বলেন, ‘চার বছর বয়সে হারাই যাওয়ার পর রাস্তায় থাকছি, ভিক্ষা করে খাইচি, রাস্তায় প্লাস্টিক টোকাইচি।’ হারিয়ে যাওয়ার তিন বছর পর বাবা-মাকে খুঁজে পান তিনি। এরপর অল্প বয়সেই বিয়ে এবং সন্তান জন্মের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন সংসারজীবন।

স্বামীর অসুস্থতায় বদলে যায় সংসারের চিত্র
স্বামীর সঙ্গে অভাবের সংসার হলেও কোনোভাবে চলছিল তাঁদের জীবন। কিন্তু করোনা মহামারির আগে হালিমার জীবনে নেমে আসে বড় বিপর্যয়। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসায় গাফিলতির কারণে তাঁর স্বামী পঙ্গু হয়ে যান বলে জানান হালিমা। এর কিছুদিন পর করোনা মহামারিতে বন্ধ হয়ে যায় পরিবারের আয়ের পথ। সন্তানদের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয়েই রিকশার হ্যান্ডেল হাতে তুলে নেন তিনি।

অন্যায়ের পথে না গিয়ে বেছে নেন কঠিন পেশা
রিকশা চালানোর মতো কঠিন পেশায় কেন নামতে হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে হালিমা জানান, সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ থেকে নিয়মিত বেতন পান না। দুই-তিন মাস পর বেতন দেওয়া হয়। বেতনও সাত-আট হাজার টাকার মতো হাতে আসে বলে অভিযোগ তাঁর। তিনি বলেন, ‘বাধ্য হয়েই বেছে নিতে হয়েছে এই কঠিন পেশা। সিটি করপোরেশনের কাজে বেতন দেয় দুই/তিন মাস পর। তাও আবার সাত-আট হাজার। আমাগো বেতন আরও বেশি। কিন্তু খেয়ে ফেলে অন্যরা। আমাগো হাতে আসে সাত-আট হাজার টাকা। বাড়িওয়ালা তো এসব শুনব না। তাছাড়া পেটও তো চালান লাগবো।’

করোনা মহামারির সময় কাজ ও আয় বন্ধ হয়ে গেলে বস্তির কিছু মানুষ তাঁকে অনৈতিক পথে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিলেন বলেও জানান হালিমা। তবে সেসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজের পরিশ্রমের ওপর ভরসা রাখেন তিনি। হালিমার ভাষায়, ‘খারাপ পথে যাওয়ার জন্য অনেকে বলছে। কিন্তু, আমি তাদের বলেছি, আমার ঘরে তারা যাতে এই কথা নিয়ে না আসে। কারণ, আমি সেই পথে যেতে চাই না। আমি যদি যাইতাম, একদিন হয়তো আমার মেয়েরাও সেই পথে যাইতো।’

রিকশা চালাতে গিয়ে হয়রানি ও নির্যাতন
শুরুতে রিকশা চালাতে গিয়ে লজ্জা ও নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে হালিমাকে। পরিচিত কেউ যেন তাঁকে চিনতে না পারে, সে জন্য প্রথম দিকে ছেলেদের প্যান্ট-শার্ট পরে মুখে রুমাল বেঁধে রাস্তায় নামতেন।

রিকশা চালানোর অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথম দিকে অন্য রিকশার সঙ্গে ধাক্কা লাগত। এ নিয়ে অনেকবার শারীরিক নির্যাতন ও অশ্লীল ভাষায় গালাগালের শিকার হয়েছেন তিনি। হালিমা বলেন, ‘নতুন নতুন আমার রিকশা কখনো অন্য রিকশার সঙ্গে লাগাই দিসি। তাতে কতবার যে আমারে মারছে, অশ্লীল ভাষায় বকছে তার হিসাব নেই।’ তবে এত বাধার পরও থেমে যাননি তিনি। সংসারের বাস্তবতা তুলে ধরে হালিমা বলেন, ‘রিকশার হ্যান্ডেল ধরলে চুলায় পাতিল উঠত, আর না ধরলে উঠত না।’

অনুদানের রিকশাও চুরি হয়ে যায়
পরিবারের খরচ চালানোর পাশাপাশি অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা এবং সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে হয় হালিমাকে। প্রথমে প্যাডেলচালিত রিকশা চালালেও পরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো শেখেন তিনি। প্রায় দুই বছর আগে একটি সংস্থার কাছ থেকে অনুদান হিসেবে একটি রিকশা পেয়েছিলেন হালিমা। মহাখালীর সাততলা বস্তির একটি গ্যারেজে তালাবদ্ধ করে রাখতেন সেটি। কিন্তু একদিন গ্যারেজের তালা ভেঙে রিকশাটি চুরি হয়ে যায়। এরপর আবারও ভাড়ায়চালিত রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামতে হয় তাঁকে। সেই থেকে আগের মতোই দিন-রাত পরিশ্রম করে সংসার চালাচ্ছেন।

কোনো সাহায্য নয়, চান কাজের সুযোগ
হালিমা জানান, তিনি সরকারি কোনো ভাতা পান না। কারও কাছে হাত পাততেও চান না। তাঁর চাওয়া, একটি কাজের সুযোগ অথবা নিজের একটি রিকশা। তাহলে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি মেয়েদের পড়াশোনার স্বপ্নটাও এগিয়ে নিতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘কারও কাছে হাত পাততে চাই না। আমি কাজ চাই। আমি কর্ম করেই চলতে চাই, মেয়েদের হাফেজা বানাতে চাই। যদি কেউ আমাকে একটা কাজ দিতো অথবা একটা রিকশা দিতো আমার জন্য খুব ভালো হতো।’

নিজের জীবনে আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই জানিয়ে হালিমা বলেন, সন্তানরা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়, তাদের যেন মায়ের মতো কষ্ট করতে না হয়—এটাই তাঁর একমাত্র স্বপ্ন। কথাগুলো বলতে বলতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি এই সংগ্রামী নারী। নিজের জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও দুই মেয়েকে হাফেজা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে আছেন তিনি।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

Link copied!