‘বিএনপি বেশি বাড়াবাড়ি করলে খালেদা জিয়াকে আবারো জেলে পাঠানো হবে’

প্রকাশিতঃ 10:21 pm | November 03, 2022

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে বিএনপি যদি বাড়াবাড়ি করে তাহলে খালেদা জিয়াকে আবারও জেলে পাঠানো হবে।

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া অসুস্থ, বয়োবৃদ্ধ। তার ভাই-বোন, বোনের জামাই আমার কাছে এসেছেন, আবেদন করেছেন। আমরা তার সাজাটা স্থগিত করে বাড়িতে থাকার সুযোগ করে দিয়েছি। এটা মানবিক কারণেই দিয়েছি। কিন্তু যদি ওরা বেশি বাড়াবাড়ি করে তাহলে আবার জেলে পাঠিয়ে দেবো।’

বৃহস্পতিবার (৩ নভেম্বর) ‘জেলহত্যা দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ স্মরণসভার আয়োজন করে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি (খালেদা জিয়া) অসুস্থ, বয়োবৃদ্ধ তার বোন, ভাই, বোনের জামাই আমার কাছে এসেছেন, আবেদন করেছেন। আমরা তার সাজাটা স্থগিত করে তাকে বাড়িতে থাকার সুযোগ দিয়েছি। মানবিক কারণেই দিয়েছি। কিন্তু, যদি ওরা বেশি বাড়াবাড়ি করে, বিএনপি যদি বেশি বাড়বাড়ি করে তাহলে আবার জেলে পাঠিয়ে দেব।’

তিনি বলেন, আজকে তাদের (বিএনপি) কি অবস্থা, আজকে তাদের গণতন্ত্র উদ্ধার করতে হবে। যে দলের জন্ম সামরিক শাসকের পকেট থেকে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারির দ্বারা, তারা আবার গণতন্ত্র কি উদ্ধার করবে? সেটাই আমার প্রশ্ন। আবার সেই কথা শুনে কিছু লোক তাদের সাথে তাল মিলায়। এদের জ্ঞান-বুদ্ধি কোথায় থাকে? তারা কি বাস্তবটা বুঝতে পারে না। আর নেতৃত্ব কোথায়? বিএনপি যে লাফালাফি করে তাদের নেতা কই?

সরকারপ্রধান বলেন, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাষ্ট মামলায় খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত, তার ৭ বছরের সাজা হয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলা এতিমদের নামে বিদেশ থেকে যে মোটা অংকের টাকা এসেছিল সেই একটি টাকাও এতিম পায় নাই বা ঐ ট্রাস্টের না সব টাকা গেছে নিজের নামের নিজের অ্যাকাউন্টে। সেখানেও সে ধরা খেয়েছে এবং মামলা হয়েছে এবং তত্বাবধায়ক সরকার সেই মামলা দিয়েছে এবং ১০ বছরের জেল হয়েছে।

তাদেরই প্রিয় ইয়াজদ্দিন, মইনউদ্দিন ও ফখরুদ্দিন গং এই মামলা দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে তারেক রহমান ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার খুনীদের জিয়াউর রহমান বিদেশে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসিত করলেও একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তাদের বের করে দেয়। কিন্তু ২০০১ সালে খালেদা জিয়া যখন বিচারের রায়ের তারিখ পড়েছে খুনি বিচারের কাঠগড়ায়, সেই সময় খুনি খায়রুজ্জামানকে, যে ৩রা নভেম্বর জেলহত্যায়ও জড়িত তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকরি এবং প্রমোশন দেয় এবং মালয়েশিয়ায় হ্ইাকমিশনার করেও পাঠায়। খুনী পাশাকে বিদেশে মৃত অবস্থায় প্রমোশন দেয় এবং তার ভাতা ও সবধরনের বেনিফিট পরিবারকে দেয়। তাহলে কি করে অস্¦ীকার করবে এই হতাকান্ডের সঙ্গে জিয়াউর রহমান জড়িত নয়। ৩রা নভেম্বর বা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে জিয়া যে জড়িত নয় তা কিভাবে অস্বীকার করবে।

তিনি বলেন, ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খুনী রশিদকে ভোট চুরি করে খালেদা জিয়া পার্লামেন্টে বাসানোর মাধ্যমে খুনীদের পৃষ্ঠাপোষকতা করেছে। আর ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় তারেক জিয়া ও খালেদা জিয়া যে সম্পূর্ণভাবে জড়িত তাতে আর কোন সন্দেহ নেই। কারণ, সংসদে এনিয়ে আওয়ামী লীগ কে আলোচনা করতে দেয়া হয়নি। উল্টো খালেদা জিয়া বলেন তিনি (শেখ হাসিনা) ভ্যানিটি ব্যাগে গ্রেনেড নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। অর্থাৎ একটি অপরাধ করার পর পরে সেই অপরাধটা অন্যের ঘারে চাপানোর ট্রিকসটা তারা ভালভাবেই জানেন।

ক্ষমতায় থাকাকালীন অপারেশন ক্লিন হার্টের সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী নির্বাচন এবং তাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআরআই তছনছ এবং ফাইল পত্র ও কম্পিউটার সিজ করে নেয়ার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের পার্টির কাজ ও করতে দেবে না। এই হলো খালেদা জিয়ার গণতন্ত্রের নমুনা। আমাদের দলের ওপর যে অত্যাচার তারা করেছে কই আমরাতো তার প্রতিশোধ নিতে যাইনি। আমরা আইনগত ভাবেই যা করার করেছি। খুনীদের বিচার করেছি। আর যে খুনীদের তারা রক্ষা করেছে। যুদ্ধারপরাধী যাদের ফাঁসির রায় হয়েছে তাদের কেবিনেটের মন্ত্রি করেছে।

আজ ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দ্বিতীয় কলংকজনক অধ্যায় এই দিনটি।

১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ডের পর তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী ও চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৫ আগস্টের পর এই চার জাতীয় নেতাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

প্রধানমন্ত্রী বিএনপি’র আন্দোলন প্রসঙ্গে বলেন, তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করলে কোন কথা নেই, কিন্তু একটা মানুষের গায়ে হাত দিলে ছাড়বো না। আর বিএনপি যে এতো লম্ফ-ঝম্প করে তাদের দলের মাথা কোথায়? সবাই তো দুর্নীতিবাজ, সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামী। দেশের মানুষ কেন তাদের পাশে থাকবে?

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান সরকারের গত সাড়ে ১৩ বছরের দেশের ব্যাপক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের কথা জনগণের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামনে নির্বাচন। আমরা মানুষের মন জয় করে এবং দেশের উন্নয়ন করেই নৌকার পক্ষে ভোট আনবো। দেশের মানুষ আর সেই অশান্ত পরিবেশ চায় না, শান্তির পরিবেশ চায়, দেশের উন্নতি চায়। তাই দেশের জনগণ আওয়ামী লীগকেই চায়, কেননা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা মানে দেশে শান্তি, উন্নয়ন আর অগ্রগতি।

প্রধানমন্ত্রী বিএনপির অপতৎপতার সমালোচনা করে আরও বলেন, দেশের জনগণ কি একটু ভেবে দেখেছে এই লুটেরা, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, জঙ্গীবাদীরা (বিএনপি-জামায়াত) ক্ষমতায় আসলে দেশের অবস্থা কি হবে? করোনা মহামারীসহ দুঃসময়ে বিএনপির অস্তিত্ব কোথায় ছিল? তারা তো জনগণের পাশে দাঁড়ায়নি। বিএনপি যে এতো লম্ফঝম্প করছে আর স্বপ্ন দেখছে জনগণ ভোট দিয়ে ভরে দেবে- এতো সহজ নয়। দেশের জনগণ কী বিএনপির শাসনামলের হাওয়া ভবন, দুঃশাসন, জঙ্গীবাদ সৃষ্টি, দুর্নীতি, লুটপাট, নির্যাতনের কথা ভুলে যাবে? ভুলবে না। দেশের জনগণ আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছে, বাংলাদেশকে আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের দুঃশাসনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার সময় দেশে কয়টা সরকার ছিল? হাওয়া ভবনে একটা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আরেকটা। হাওয়া ভবনের পাওনা না মিটিয়ে দেশে কোন উন্নয়নের কাজ হয়নি। কেউ ব্যবসা করতে পারেনি। এক ভাগ হাওয়া ভবনে আরেক ভাগ পিএমওতে তৈরী ব্যক্তিগত উন্নয়নের উইংয়ে দিতে হতো। ব্যবসায়ীদের দুভাগ দিয়েই তবে ব্যবসা করতে হতো। তাদের চরম দুর্নীতি, বিদেশে বিপুল অর্থপাচারের ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এফবিআই তদন্ত করে বের করেছে। তদন্ত করে তাঁরা খুঁজে পেয়েছে খালেদা জিয়া ও তার দুই পুত্র তারেক রহমান ও কোকার পাচারকৃত অর্থ। এফবিআইএর প্রতিনিধি এসে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছে এবং সেই মামলায় তারেক রহমানে ৭ বছরের সাজা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেক রহমান রাজনীতি না করার মুচলেকা দিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে। তারা অগ্নিসন্ত্রাস করে সাড়ে তিন হাজার মানুষকে দগ্ধ করেছে, শত শত মানুষকে পেট্টোলবোমা মেরে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। যত কিছু ধ্বংসাত্মক কাজ করতেই তারা (বিএনপি) পারদর্শী। বিএনপি-জামায়াত জোটের সেই ভয়াল দুঃশাসন, অত্যাচার-নির্যাতন, হাওয়া ভবনের কথা কী দেশের জনগণ ভুলে যাবে? কেন দেশের জনগণ তাদের পাশে থাকবে?

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের টানা তিন বছরের মেয়াদে দেশের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরার জন্য দলের নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেন, মহামারীর মধ্যে দেশের এখন মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলারের কাছাকাছি। গ্রামের একদম তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন নিয়ে গেছি। বিএনপির নীতি ছিল খাদ্য ঘাটতি দেখিয়ে বিদেশ থেকে ভিক্ষা নিয়ে চলা। আর আওয়ামী লীগের নীতি হচ্ছে ভিক্ষা নেব না, নিজেরা ফসল ফলিয়ে নিজেরা চলবো, আত্মমর্যাদা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে চলবো। আমরা তা করতে পেরেছি। এ সময় তিনি দেশের এক ইঞ্চি জায়গাও যেন অনাবাদি না থাকে সেজন্য দেশবাসীর প্রতি তাঁর আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আমরা নিজেদের ফসল নিজেরা ফলাবো।

বিশ্বের উন্নত দেশ যেটা পারেনি, করোনা ভ্যাকসিন ও টেস্ট বিনামূল্যে করার ব্যবস্থা করার কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরে সরকার প্রধান বলেন, অনেক উন্নত দেশও করোনার ভ্যাকসিন জনগণকে বিনামূল্যে দিতে পারেনি। আমরা তা দিয়েছি। বুষ্টার ডোজ চলছে। এখন বাচ্চা-শিশুদের করোনার ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু ভ্যাকসিনই নয়, করোনার টেস্টও বিনামূল্যে করা হচ্ছে। একেকটা ভ্যাকসিন ও করোনা টেস্ট করতে হাজার হাজার টাকা খরচ হয়। সেটি আমরা বিনামূল্যে দিচ্ছি। কারণ আমাদের কাছে দেশের মানুষের জীবন রক্ষায় হচ্ছে বড় ব্যাপার। এমন অবস্থায় যদি বিএনপি ক্ষমতায় থাকতো তবে ভ্যাকসিনের অভাবে হাজার হাজার লাশ পড়ে থাকতো। ভ্যাকসিনের টাকা হাওয়া ভবন লুটে খেয়ে নিতো।

-বাসস

Print Friendly, PDF & Email