রায়পুর ইউপি নির্বাচন : তারুণ্যনির্ভর যোগ্য প্রার্থী চান ভোটারেরা

প্রকাশিতঃ 12:06 pm | October 08, 2021

কালের আলো সংবাদদাতা:

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা তফসিল ঘোষণার পরপরই নেত্রকোনার তিন উপজেলার গ্রামে গ্রামে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণা জমে উঠেছে। এরই মধ্যে দলীয় মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের আগ্রহী প্রার্থীরা। তবে মাঠে নেই বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল।

জমে উঠেছে ৭নং রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনী মাঠও। স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, এবার তারা কোনো বিতর্কিত কিংবা জনসম্পৃক্তহীন প্রার্থী নয়, সৎ, যোগ্য ও সুশিক্ষিত প্রার্থী চান যে কিনা ইউনিয়নকে একটি মডেল হিসেবে জেলায় গড়ে তুলবে।

সম্প্রতি বারহাট্টায় সরেজমিনে দেখা যায়, সাত ইউনিয়নেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা দিনরাত প্রচারণা চালাচ্ছেন। অনেকেই নিজের ছবি সংবলিত নতুন বছরের ক্যালেন্ডার ছাপিয়ে ভোটারদের মধ্যে বিলি করেছেন। কেউ কেউ হাজির হচ্ছেন বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে।

মুঠোফোনের খুদে বার্তায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও চলছে প্রচারণা। প্রার্থীরা কেউ দলীয় পরিচয়ে, কেউ বিগত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষার দাবি করে, কেউ মসজিদ-মন্দির, ক্লাব-সমিতির উন্নয়নে অর্থ সহায়তা দিয়ে, কেউ উন্নয়নের নতুন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।

ভোটাররাও সম্ভাব্য এ প্রার্থীদের এসব তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের প্রত্যাশা, মনোনয়ন প্রত্যাশীদের চাপ যতই থাকুক না কেন, দল সৎ, যোগ্য ও পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিদের প্রতি সমর্থন দেবে।

ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের আলী আহম্মদ বলেন, নির্বাচনগুলোতে এখন আর স্থানীয় ভোটারের মতামত কিংবা প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাই করা হয় না। আর এ কারণেই নৌকার প্রার্থীর ভরাডুবির ঘটনা ঘটে। গত নির্বাচনেও এখানে (রায়পুর) নৌকার প্রার্থী হেরেছেন। বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী।

‘তাই এবার মাঠ জরিপ করে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে যেন মনোনয়ন দেওয়া হয়— আমাদের প্রত্যাশা এটাই,’ যোগ করেন তিনি।

রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা, দক্ষ সংগঠক, উপজেলা কৃষক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জায়েদুল ইসলাম জাহিদ।

মনোনয়ন চাইছেন সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর তালুকদার, বর্তমান চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান রাজু, মোফাজ্জল হোসেন এবং আজমল হোসেন এরশাদ।

এর মাঝে মোফাজ্জল হোসেন এবং বর্তমান চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান রাজু গত নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে ভোটে অংশ নেন। আর আলী আকবর তালুকদার গত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলেও জনমানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকায় তার ভরাডুবি ঘটে।

এছাড়া আজমল হোসেন সম্পর্কে আলী আকবর তালুকদারের ভগ্নিপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান। সাবেক এই চেয়ারম্যান এবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেও তিনি জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের রাজনীতি করেছেন। বিভিন্ন সময় দল পাল্টে এখন আওয়ামী লীগে থিতু হয়েছেন।

যোগাযোগ করা হলে রায়পুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের তারুণ্যের অহংকার ও দক্ষ সংগঠক জায়েদুল ইসলাম জাহিদ কালের আলোকে বলেন, ‘স্কুল, কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। দল থেকে মনোনয়ন চাইছি। দলের সমর্থন পেলে সরকারের উন্নয়নকে স্থানীয়ভাবে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করব। অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে মানীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী গ্রাম হবে শহর— রূপান্তরের যুদ্ধে লিপ্ত হব।’

এদিকে স্থানীয় সূত্র জানায়, সাবেক চেয়ারম্যান ও গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মো. আলী আকবর তালুকদারের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। ওই নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুর রহমান রাজু ও মোফাজ্জল হোসেন।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ নেতা কালের আলোকে বলেন, গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রাজু তার মামা ও সাবেক উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে নজিরবিহীন ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেন এবং ঘোড়া মার্কা নির্বাচন করে নৌকার প্রার্থীকে পরাজিত করেন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ও বর্তমান চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান রাজু বলেন, গেলবার দলের মনোনয়ন চেয়েও পাইনি। কিন্তু ভোটারদের চাপে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছি। এবারও দলীয় মনোনয়ন চাইছি। না পেলে, ভোটারদের পরামর্শে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেব।

জানা গেছে, গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আলী আকবর তালুকদার, তার ভগ্নিপতি এরশাদ, মোফাজ্জল হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা রতন কুমার সাহা রায় প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ গোলাম রসুল তালুকদারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। ভাসা ভাসা কাজ করলেও চেয়ারম্যান রাজুও গোলাম রসুল তালুকদারের বিপক্ষে কাজ করেছেন বলে নেতাকর্মীরা বলাবলি করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মী বলেন, আলী আকবর তালুকদার নিজেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সমজাকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরুর অনুসারী হিসেবে নিজেকে দাবি করেন। যদিও তার ছোটভাই আলী আজগর তালুকদার ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির ক্যাডার। বর্তমানে জামায়েতের রুকন। তার বাবা আবদুল হেকিম তালুকদার ছিলেন ইউনিয়ন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।

সূত্র জানায়,  ১৯৯৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর যে হামলা চালায় আলী আজগর তার নেতৃত্ব দেন। ওই সময় তার ডান হাতে গুলি লাগে। এক পর্যায়ে গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলেও তিনি ছাড়া পান। তবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হওয়ার কারণে রাজধানীর তেজগাঁও কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর করেন বিয়ে করেন নেত্রকোনা জেলা জামায়াতের আমিরের মেয়ে। এক পর্যায়ে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলেও ২০০৯ সালের পর তার চাকরি চলে যায়।

ইউনিয়নের বাসিন্দা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আবদুল ওয়াহেদ আহমেদ বলেন, আলী আকবর তালুকদারের বাবা ছিলেন শান্তি কমিটির একজন সদস্য ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। তার ভাই জামায়াতের রুকন। গত নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেওয়ায় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রায়পুরের মানুষ স্বভাবতই মানুষ থেকে সরে যায়। এছাড়া দলীয় ব্যানারে একবার চেয়ারম্যান হলেও এলাকার গরিব—দুঃখী তাকে কাছে পায়নি। জীবন রক্ষা বাঁধ প্রকল্পেও দুর্নীতির অভিযোগের দুদকের মুখোমুখি হন তিনি।

সাবেক এই শিক্ষক বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করি, তার ডাকে যুদ্ধে গিয়েছিলাম। আওয়ামী লীগকে ভালোবাসি, শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে চাই। তাই আসন্ন নির্বাচনে কোনো বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব নয়। দক্ষ, সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত এবং তরুণ প্রার্থী চাই। কারণ একমাত্র সুশিক্ষিত তারুণ্যেই সম্ভব সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব।  এ বিষয়ে কেন্দ্রকে খেয়াল রাখার বিনীত অনুরোধ করছি।

সার্বিক বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু বলেন, আমরা তৃণমূলের প্রার্থীদের তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিয়েছি। মনোনয়ন যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেবে।

এদিকে নেত্রকোনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশনা না থাকায় বিএনপির প্রার্থীরা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কালের আলো/এমএ/বিএসএ

Print Friendly, PDF & Email