মহাকাশের গভীরে লুকিয়ে থাকা রহস্য উন্মোচনে নতুন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আমাদের সৌরজগতের আবাসস্থল মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের চারপাশে গ্যাসীয় অবস্থায় ধাতব উপাদানের বিশাল ভান্ডারের সন্ধান মিলেছে। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এই চিত্র। বিজ্ঞানীদের ধারণা, নক্ষত্রের বিস্ফোরণ বা সুপারনোভার মাধ্যমে তৈরি ভারী মৌলগুলো সময়ের সঙ্গে ছায়াপথের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
গবেষণাটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সহায়তা করতে পারে—মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোল তার চারপাশের গ্যাস ও ধূলিকণা তুলনামূলক ধীরগতিতে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে কেন? ব্ল্যাকহোলের চারপাশে থাকা গ্যাসের রাসায়নিক গঠন, তাপমাত্রা ও আচরণ বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে নতুন ধারণা পাওয়া যেতে পারে। গবেষণার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল-এ।
ব্ল্যাকহোলের চারপাশে কী পাওয়া গেছে?
বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে ব্ল্যাকহোলের আশপাশের গ্যাসে বিভিন্ন ভারী মৌলের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের চেয়ে ভারী মৌলগুলোকে সাধারণভাবে ‘ধাতু’ বলা হয়। এই শ্রেণির উপাদানের মধ্যে রয়েছে কার্বন, অক্সিজেন, লোহা ও সোনার মতো মৌল।
এসব উপাদানের অনেকগুলো নক্ষত্রের অভ্যন্তরে নিউক্লীয় বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয়। নক্ষত্রের জীবনচক্রের শেষ পর্যায়ে, বিশেষ করে সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময়, এসব মৌল মহাকাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরে সেগুলো গ্যাস ও ধূলিকণার সঙ্গে মিশে নতুন নক্ষত্র, গ্রহ এবং অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর গঠনে ভূমিকা রাখে।
মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোলের আশপাশে পাওয়া গ্যাসীয় উপাদানের রাসায়নিক গঠন পার্শ্ববর্তী কয়েকটি নক্ষত্রের উপাদানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। এতে কেন্দ্রীয় অঞ্চলে নক্ষত্রের বিবর্তন এবং বিস্ফোরণের মাধ্যমে ভারী মৌল ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ব্ল্যাকহোলের ক্ষুধা নিয়ে কেন এত কৌতূহল?
মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল, যার নাম স্যাজিটেরিয়াস এ-স্টার। এর মহাকর্ষীয় আকর্ষণ আশপাশের গ্যাস, ধূলিকণা ও অন্যান্য পদার্থের গতিবিধিকে প্রভাবিত করে। তবে ব্ল্যাকহোলের কাছে থাকা সব পদার্থই সরাসরি এর ভেতরে চলে যায় না। পদার্থের তাপমাত্রা, ঘনত্ব, গতি এবং আশপাশের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে কতটা পদার্থ ব্ল্যাকহোলে প্রবেশ করবে।
কানাডার মন্ট্রিলের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী নিকোল ফোর্ডের মতে, মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোল আশপাশের উপাদান নিজের দিকে টেনে নিলেও অন্যান্য সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের তুলনায় এটি অনেক ধীরগতিতে পদার্থ গ্রহণ করছে। কেন এমন হচ্ছে, তা বুঝতে ব্ল্যাকহোলকে ঘিরে থাকা গ্যাস, ধূলিকণা এবং নক্ষত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।
বিজ্ঞানীদের কাছে তাই ব্ল্যাকহোলের চারপাশের গ্যাসের রাসায়নিক গঠন গুরুত্বপূর্ণ। এসব উপাদান কীভাবে উত্তপ্ত বা শীতল হচ্ছে, কীভাবে চলাচল করছে এবং কোন পরিস্থিতিতে ব্ল্যাকহোলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—এসব তথ্য এর কার্যকলাপ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
গ্যাসের শীতল হওয়ার সঙ্গে ধাতুর সম্পর্ক
ব্ল্যাকহোলের চারপাশের গ্যাসের আচরণ নির্ধারণে ভারী মৌল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গ্যাসের মধ্যে থাকা বিভিন্ন মৌল শক্তি বিকিরণের মাধ্যমে গ্যাসকে শীতল হতে সাহায্য করে। তবে এই প্রক্রিয়া নির্ভর করে গ্যাসের তাপমাত্রা, ঘনত্ব, রাসায়নিক গঠন এবং অন্যান্য ভৌত পরিস্থিতির ওপর।
গ্যাস কত দ্রুত শীতল হচ্ছে, তা তার গতিবিধি ও ঘনত্বে প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে গ্যাস ব্ল্যাকহোলের দিকে কীভাবে প্রবাহিত হবে, সেটিও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি গ্যাসের পরিমাণ দেখেই তার কার্যকলাপ পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়; গ্যাসের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও বিশ্লেষণ করতে হয়।
নতুন পর্যবেক্ষণে পাওয়া তথ্য এ ধরনের জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা আরও স্পষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে ছায়াপথের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ভারী মৌল কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেগুলো গ্যাসের আচরণকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জেমস ওয়েবের পর্যবেক্ষণে নতুন সম্ভাবনা
মহাবিশ্বের দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা আলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ গ্যাস ও ধূলিকণার রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এর পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীদের নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, ছায়াপথের বিবর্তন এবং ব্ল্যাকহোলের আশপাশের পরিবেশ বুঝতে সহায়তা করছে।
মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে অন্য ছায়াপথের সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের চারপাশে ভারী মৌলের বণ্টন বিশ্লেষণেও কাজে আসতে পারে। বিভিন্ন ছায়াপথের তথ্য তুলনা করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারবেন, কেন্দ্রীয় ব্ল্যাকহোলের কার্যকলাপের সঙ্গে গ্যাসের রাসায়নিক গঠনের সম্পর্ক কতটা গভীর।
পৃথিবীতে থাকা ভারী মৌলের উৎপত্তি ও বিস্তারের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হওয়া মৌল কীভাবে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে নতুন মহাজাগতিক বস্তুর অংশ হয়, সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার নানা দিক উন্মোচনে সহায়তা করতে পারে নতুন তথ্য।
তবে ব্ল্যাকহোলের চারপাশে ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত হওয়া মানেই সেখানে কোনো কঠিন ধাতব ভান্ডার পাওয়া গেছে, এমন নয়। এখানে ‘ধাতুর ভান্ডার’ বলতে গ্যাসীয় পরিবেশে থাকা ভারী মৌলের উপস্থিতি ও বণ্টনকে বোঝানো হচ্ছে। এই আবিষ্কারের গুরুত্ব মূলত মহাকাশে পদার্থের বিবর্তন এবং ব্ল্যাকহোলের কার্যকলাপ সম্পর্কে নতুন সূত্র পাওয়ার মধ্যে। সূত্র: লাইভ সায়েন্স ও দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল
কালের আলো/ইএকে/জেএন
