নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই দৈনিক মজুরিভিত্তিক ৬৯৮ কর্মচারীকে সহকারী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দিয়ে স্থায়ী করার উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। ২০১০ সালে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মচারীর চাকরি স্থায়ী করতে চাকরির প্রবিধানমালা সংশোধন এবং সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছরের শর্ত শিথিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একে নতুন নিয়োগ নয়, পুরোনো কর্মীদের স্থায়ীকরণ বললেও এ প্রক্রিয়ায় নিয়োগের স্বচ্ছতা, যোগ্যতা যাচাই, সমান সুযোগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কর্মকর্তাদের অনেকেই। খেলাপি ঋণের হার ৪০ শতাংশের বেশি এবং প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা—এমন আর্থিক পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক কর্মচারীকে কর্মকর্তা পদে নিয়োগের উদ্যোগ ব্যাংকের ব্যয় ও জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
- পরীক্ষা ও বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগের উদ্যোগ, বয়সসীমায় ছাড়
- মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও সমান সুযোগ নিয়ে কর্মকর্তাদের প্রশ্ন
স্থায়ীকরণের আড়ালে নিয়োগের প্রশ্ন
অগ্রণী ব্যাংকের মানবসম্পদ পরিকল্পনা বিভাগের ১২৯১ নম্বর স্মারক অনুযায়ী, ‘অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা-২০০৮’ সংশোধন করে ‘অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি. (কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা-২০২৫’-এর খসড়া তৈরির জন্য সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ১২ এপ্রিল থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাতটি সভা করেছে। প্রস্তাবিত প্রবিধানমালার তফসিল-২-এর ২৯ নম্বর ক্রমিকে সহকারী কর্মকর্তা পদে সরাসরি নিয়োগের শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু দীর্ঘদিন দৈনিক মজুরিভিত্তিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মকর্তা পদে নিয়োগের যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে? ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, কর্মচারীরা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত; তাঁদের চাকরি স্থায়ী করা হচ্ছে, নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। তবে পদ ও চাকরির মর্যাদা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোন বিধান প্রযোজ্য হবে, নিয়োগের শর্ত কীভাবে পূরণ হবে এবং যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজন আছে কি না—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর ছাড়া শুধু ‘স্থায়ীকরণ’ শব্দ দিয়ে বিতর্কের অবসান সম্ভব নয়।
৩২ বছরের শর্ত শিথিল, আইনি ভিত্তি কোথায়?
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ১ হাজার ২৮তম সভায় সহকারী কর্মকর্তা পদে নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছরের শর্ত শিথিলের সিদ্ধান্ত হয়। ব্যাংক কর্মকর্তাদের কারও কারও প্রশ্ন, সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণসংক্রান্ত আইনের সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের সামঞ্জস্য কতটা। বয়সসীমা শিথিলের এখতিয়ার, সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োগ এবং প্রস্তাবিত নিয়োগের বৈধতা—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন থাকলেই সিদ্ধান্তটির আইনগত ভিত্তি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। বরং এমন বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও বিধির ব্যাখ্যা প্রকাশ করা জরুরি, যাতে নিয়োগের বৈধতা নিয়ে অনিশ্চয়তা না থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা নিয়ে অস্বস্তি
গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি-১ সার্কুলার নম্বর ১৮/২০২৬ অনুযায়ী, যেসব এন্ট্রি পদে পূর্ব অভিজ্ঞতা আবশ্যক নয়, সেসব পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ওয়েবসাইট ও অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি নৈর্ব্যক্তিক বা লিখিত পরীক্ষার সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার বিধান রয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকের প্রস্তাবিত প্রবিধানমালায় সহকারী কর্মকর্তা (গ্রেড-১১) পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই বলে অভিযোগ কর্মকর্তাদের অনেকের। তাঁদের আশঙ্কা, যোগ্যতা যাচাই ছাড়াই কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হলে মেধাভিত্তিক নিয়োগের নীতি দুর্বল হবে এবং চাকরিপ্রত্যাশী অন্য প্রার্থীদের সমান সুযোগ ক্ষুণ্ন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রস্তাবিত নিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারটি কীভাবে প্রযোজ্য হবে। নিয়োগের প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানানো প্রয়োজন। নির্দেশনাটি প্রযোজ্য কি না, তা পরিষ্কার না করেই নিয়োগপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় আরও বাড়তে পারে।
আর্থিক সংকটে বাড়তি দায়ের আশঙ্কা
ব্যাংক কর্মকর্তাদের দাবি, অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪০ শতাংশের বেশি এবং প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে একসঙ্গে ৬৯৮ কর্মচারীকে কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দিলে বেতন-ভাতাসহ পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা। এ ছাড়া নতুন পদমর্যাদায় কর্মীদের দায়িত্ব, পদায়ন ও কর্মপরিবেশ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়োগে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ বা জনবল ব্যবস্থাপনার বিস্তারিত হিসাব উপস্থাপিত হয়নি। ফলে সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব নির্ধারণে স্বচ্ছ ব্যয় বিশ্লেষণ প্রয়োজন। ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে শুধু চাকরি স্থায়ীকরণের সিদ্ধান্ত এগিয়ে নেওয়া হলে জনবল ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ের দায় নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেছেন, ২০১০ সালে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী করার বিষয়ে সরকারি প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবং পরিচালনা পর্ষদ এ বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে। বয়স ও পদসংক্রান্ত বিষয়গুলো ব্যাখ্যাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, কর্মচারীরা আগে থেকেই ব্যাংকে কাজ করায় তাঁদের নিয়োগকে নতুন নিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত নয়। অস্থায়ী কর্মচারীদের আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শাহীন আক্তার চলতি মাসে নিয়োগ স্থায়ী হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বিষয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত। দীর্ঘদিন কর্মরত কর্মীদের চাকরির অনিশ্চয়তা নিরসন অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। কিন্তু সে যুক্তিতে নিয়োগবিধি, বয়সসীমা, যোগ্যতা যাচাই ও সমান সুযোগের প্রশ্ন উপেক্ষা করা যায় না। ৬৯৮ কর্মচারীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কর্মকর্তা নিয়োগের নীতি কীভাবে রক্ষা করা হবে, তারও জবাব দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে। সরকারি প্রতিশ্রুতি থাকলে তার বাস্তবায়ন হতে হবে আইনসম্মত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়—পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সেই প্রক্রিয়ার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে, বলছেন কেউ কেউ।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে
