আদালত প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

জুলাইয়ে স্বামীকে হারানোর বর্ণনা, ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়লেন লাকি বেগম

আদালত প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

জুলাইয়ে স্বামীকে হারানোর বর্ণনা, ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়লেন লাকি বেগম

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রিকশাচালক শহীদ ইসমাইলের মৃত্যুর ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী লাকি বেগম। তিনি বলেছেন, গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত স্বামীর মরদেহ বাড়িতে আনার পর দেখতে পান, তাঁর মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে এবং মগজ বের হয়ে এসেছে। স্বামী হত্যার বিচারও দাবি করেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এ মামলায় দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চার আসামির বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেন লাকি বেগম। সাক্ষ্য দেওয়ার একপর্যায়ে স্বামীর মৃত্যুর স্মৃতি তুলে ধরতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

১৯ জুলাই অটোরিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন ইসমাইল

জবানবন্দিতে লাকি বেগম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তাঁর স্বামী শহীদ হন। ওই বছরের ১৯ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে অটোরিকশা চালানোর জন্য বাসা থেকে বের হয়েছিলেন ইসমাইল।

তিনি বলেন, মাগরিবের নামাজের সময় ছেলের এক বন্ধু তাঁদের বাসায় এসে খবর দেন, তাঁর বাবা ডেল্টা কেয়ার হাসপাতালের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এ খবর শোনার পর তিনি ও তাঁর ছেলে অজ্ঞান হয়ে যান। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে তাঁরা দেখতে পান, এক প্রতিবেশী রিকশাভ্যানে করে ইসমাইলের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। তখন স্বামীর মরদেহের অবস্থা দেখে শোকাহত হয়ে পড়েন লাকি বেগম। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, তাঁর স্বামীর মাথায় গুলি লেগেছিল। মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, মগজ বের হয়ে এসেছিল এবং সারা শরীর রক্তাক্ত ছিল।

মরদেহ নিয়ে যেতে প্রয়োজন হয় অ্যাম্বুলেন্সের

লাকি বেগম জানান, মরদেহের মাথায় ব্যান্ডেজ করার জন্য তাঁরা বেটার লাইফ হাসপাতালে নিয়ে যান। ব্যান্ডেজ না করে মরদেহ নাড়াচাড়া করা যাচ্ছিল না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় স্বামীর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে সমস্যায় পড়েন তাঁরা। পরে তাঁর দেবর বাড়ি থেকে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে বেটার লাইফ হাসপাতালে আসেন। এরপর লাকি বেগম, তাঁর ছেলে ও নিকটাত্মীয়রা অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু পথে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের বাধার মুখে পড়তে হয় বলে জবানবন্দিতে অভিযোগ করেন তিনি।

‘বলেছিলাম, দুর্ঘটনায় মারা গেছেন’

লাকি বেগমের অভিযোগ, গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পথে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা তাঁদের নানাভাবে হেনস্তা করেন এবং অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখেন। পরিস্থিতির কারণে তাঁরা স্বামীর মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা গোপন করে বলেছিলেন, তিনি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। লাকি বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা বলার পর পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা অ্যাম্বুলেন্সটি ছেড়ে দেন। এরপর তাঁরা মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর সুযোগ পান। এই বর্ণনায় শোকাহত পরিবারের মরদেহ নিয়ে যাত্রার সময় বাধার মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা উঠে আসে। তবে জবানবন্দিতে উত্থাপিত এসব অভিযোগের সত্যতা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

২০ জুলাই দাফন, পরে গুলিতে নিহত হওয়ার তথ্য জানার দাবি

লাকি বেগম জানান, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই তাঁর স্বামীর মরদেহ দাফন করা হয়। পরে ফেসবুক, ইউটিউব ও সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে তিনি জানতে পারেন, পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে তাঁর স্বামী নিহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

জবানবন্দিতে তিনি মামলার চার আসামির নাম উল্লেখ করেন। তাঁরা হলেন বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম, মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং পুলিশের সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। লাকি বেগমের অভিযোগ, তাঁর স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় এই চারজন জড়িত। তবে এটি তাঁর জবানবন্দিতে উত্থাপিত অভিযোগ; মামলার চূড়ান্ত রায়ে আদালত প্রমাণ ও সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবেন।

দুই আসামি গ্রেপ্তার, দুজন পলাতক

মামলার চার আসামির মধ্যে দুজন বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন। তাঁরা হলেন বিজিবির সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম।অপর দুই আসামি পুলিশের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান পলাতক রয়েছেন বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।এ মামলায় ছয়টি অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।

স্বামী হত্যার বিচার দাবি

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় লাকি বেগমের বক্তব্যে উঠে আসে স্বামীকে হারানোর শোক এবং মৃত্যুর পর মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার কঠিন অভিজ্ঞতা। জবানবন্দির একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

Link copied!