মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ১০:৫৭ এএম

লেবু চাষে সাফল্যের গল্প, মানিকগঞ্জের বৈলতলা এখন ‘লেবুর গ্রাম’

মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ১০:৫৭ এএম

লেবু চাষে সাফল্যের গল্প, মানিকগঞ্জের বৈলতলা এখন ‘লেবুর গ্রাম’

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বৈলতলা গ্রাম। একসময় এ এলাকায় আখের চাষ হতো। কিন্তু প্রায় ৩০ বছর ধরে ধীরে ধীরে বদলে গেছে গ্রামের কৃষিচিত্র। এখন যেদিকে চোখ যায়, দেখা মেলে সারি সারি লেবুর বাগান। কাগজি, এলাচি ও কলম্বোসহ বিভিন্ন জাতের লেবু চাষ করে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর চেষ্টা করছেন এখানকার কৃষকেরা। ব্যাপকভাবে লেবুর আবাদ হওয়ায় স্থানীয়ভাবে গ্রামটি এখন পরিচিত ‘লেবুর গ্রাম’ নামে। গ্রামের কৃষকদের কাছে লেবু চাষ এখন অন্যতম প্রধান পছন্দ। সবুজ পাতার আড়ালে ঝুলে থাকা লেবুতে ভরে আছে বাগানগুলো। সামনে রমজান মাসকে ঘিরে বাগান পরিচর্যা, সার প্রয়োগ, লেবু সংগ্রহ ও বাজারজাত করার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা।

৯০ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ
সরেজমিনে বৈলতলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে লেবুর বাগান। কোথাও শ্রমিকেরা গাছ থেকে লেবু তুলছেন, কোথাও ঝুড়িতে করে বাগান থেকে লেবু এনে রাস্তার পাশে স্তূপ করা হচ্ছে। আবার কেউ ছোট-বড় ও পাকা লেবু বাছাই করছেন। বিক্রির জন্য খাঁচিতে ভরে গাড়িতে তোলা হচ্ছে লেবু।

সাটুরিয়ার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক জানান, চলতি মৌসুমে সাটুরিয়া উপজেলায় ১১০ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বৈলতলা গ্রামেই রয়েছে ৯০ হেক্টর জমির লেবুর বাগান। তিনি বলেন, বৈলতলা লেবু চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানকার কৃষকেরা সারা বছরই বাগান থেকে লেবু সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। এ অঞ্চলের লেবুর চাহিদা দেশের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে।

বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু, এখন বিস্তীর্ণ বাগান
বৈলতলা গ্রামের লেবুচাষি আবদুল মালেকের বয়স ৭৬ বছর। তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে লেবু চাষ করছেন। বর্তমানে তাঁর পৌনে দুই বিঘা জমিতে লেবুর বাগান রয়েছে। আবদুল মালেক বলেন, একসময় গ্রামের বাড়ির আঙিনা থেকেই লেবু চাষের সূচনা হয়েছিল। ধীরে ধীরে চাষের পরিধি বাড়তে থাকে। প্রায় ৩০ বছরের ব্যবধানে বৈলতলা পুরোপুরি লেবুর গ্রামে পরিণত হয়েছে। গ্রামের আরেক চাষি শাহ আলম (৫০) জানান, তিনি ২৫ বছর ধরে লেবু চাষ করছেন। তাঁর সাড়ে তিন বিঘা জমিতে লেবুর বাগান রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একবার লেবুর চারা রোপণের পর যথাযথ পরিচর্যা করলে ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। বছরে চারবার ব্যাপকভাবে লেবু সংগ্রহ করা সম্ভব। এ ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়েও বাগান থেকে কমবেশি লেবু তুলে বিক্রি করা যায়।

লেবু যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন বাজারে
বৈলতলার লেবু শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। এখানকার উৎপাদিত লেবু কুমিল্লার নিমসার ও রাজধানীর কারওয়ান বাজারের আড়তসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে পাঠানো হয়। প্রতিদিন লেবুভর্তি গাড়ি গ্রামের বিভিন্ন বাগান থেকে দেশের নানা গন্তব্যে রওনা হয়। গ্রামে প্রথম দিকে লেবু চাষ শুরু করা কৃষকদের একজন খোরশেদ আলম (৬৮)। তিনি জানান, একসময় তাঁদের এলাকায় আখের চাষ হতো। প্রায় ৩০ বছর আগে তাঁরা লেবু চাষ শুরু করেন। অন্য ফসলের তুলনায় লেবু চাষে লাভ বেশি হওয়ায় পরে গ্রামের অন্য কৃষকেরাও এ চাষে আগ্রহী হন। এভাবেই বৈলতলার পরিচিতি হয়ে ওঠে ‘লেবুর গ্রাম’।

বাগান কিনেও লাভের আশা
বৈলতলার লেবুর পাইকার আজাহারের (৫৬) মতে, লেবু চাষ ও ব্যবসায় লাভের সম্ভাবনা থাকলেও তা অনেকটাই বাজারদরের ওপর নির্ভরশীল। এ বছর তিনি এক বছরের জন্য ছয় বিঘা জমির লেবুর বাগান দুই লাখ ২০ হাজার টাকায় কিনেছেন।

আজাহার জানান, শ্রমিকের মজুরি, সার ও সেচের খরচ বাদ দিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকা লাভ হবে বলে তিনি আশা করছেন। প্রতিবছরই তিনি লেবুর বাগান কিনে পরিচর্যা করেন এবং উৎপাদিত লেবু সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। বাজারে লেবুর দাম বেশি থাকলে লাভ বাড়ে, আর দাম কমে গেলে লাভও কমে যায়।

গ্রামের অধিকাংশ মানুষ জড়িত লেবু চাষে
সাটুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন পিন্টুর বাড়িও বৈলতলা গ্রামে। তিনি নিজেও নয় বিঘা জমিতে লেবুর আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, বৈলতলা গ্রামের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে লেবু চাষের সঙ্গে জড়িত। প্রায় ৩০ বছর আগে নিজাম উদ্দিন নামের এক সবজি ব্যবসায়ী প্রথম এ গ্রামে লেবু চাষ শুরু করেন। পরে চাষটি লাভজনক হওয়ায় অন্যরাও ধীরে ধীরে এতে যুক্ত হন। এখন প্রতিদিন গ্রাম থেকে লেবুভর্তি গাড়ি দেশের বিভিন্ন বাজারে যায়।

বিভিন্ন জাতের লেবু চাষে বাড়ছে আগ্রহ
সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. তানিয়া তাবাসসুম বলেন, উপজেলার মধ্যে বৈলতলা গ্রামেই সবচেয়ে বেশি লেবুর বাগান রয়েছে। এ গ্রামের উৎপাদিত লেবুর চাহিদা দেশের বিভিন্ন এলাকায়। লাভজনক হওয়ায় দিন দিন এ অঞ্চলে লেবু চাষের প্রসার ঘটছে।

তিনি জানান, বৈলতলার কৃষকেরা এলাচি, সিডলেস, কলম্বো, কাগজি ও স্থানীয় জাতের লেবু চাষ করেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, নিয়মিত পরিচর্যা এবং বাজারে চাহিদার কারণে লেবু চাষকে ঘিরে গড়ে উঠেছে গ্রামের কৃষি অর্থনীতি। একসময় আখের ক্ষেত আর বাড়ির আঙিনায় সীমিত থাকা লেবু চাষ এখন বৈলতলার বিস্তীর্ণ জমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষকদের পরিশ্রম ও লাভের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই চাষই গ্রামটির নতুন পরিচয় তৈরি করেছে—‘লেবুর গ্রাম’ বৈলতলা

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

Link copied!