সকাল হলেই বাইসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মোস্তফা মাদবর। কাঁধে কিংবা হাতে থাকে পত্রিকার বোঝা। মানুষের হাতে তুলে দেন দেশ-বিদেশের নানা খবর। এভাবেই কেটে গেছে তাঁর জীবনের ৩৫ বছর। অথচ প্রতিদিন মানুষের সুখ-দুঃখ আর সংকটের খবর পৌঁছে দেওয়া এই মানুষটির নিজের জীবনেই জমেছে অভাবের পাহাড়। পত্রিকা বিক্রি কমেছে, বেড়েছে সংসারের খরচ। স্ত্রী, দুই ছেলে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে এখন দিশেহারা ৪৮ বছর বয়সী মোস্তফা। দীর্ঘ সংগ্রামের পর তাঁর মুখে এখন একটাই আক্ষেপ—‘আর পারা যাচ্ছে না।’
মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামে ভাড়া থাকেন মোস্তফা। প্রায় ২০ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছেন তিনি। আগে সিরাজদিখান এলাকায় থাকলেও তুলনামূলক কম ভাড়ার আশায় শহরসংলগ্ন এলাকা ছেড়ে চরাঞ্চলের কমলাপুরে আশ্রয় নেন। সেখানে একটি ঝুপড়ি ঘরের ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে দিতে হয় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ভাড়া পরিশোধের পর সংসারের অন্যান্য খরচ মেটানো তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
একসময় দিনে প্রায় ১ হাজার ২০০ কপি বিভিন্ন পত্রিকা বিক্রি করতেন মোস্তফা। ছাপা পত্রিকার চাহিদা বেশি থাকায় তখন আয়ও তুলনামূলক ভালো ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে পাঠকের সংখ্যা ও পত্রিকা বিক্রি কমে এসেছে। বর্তমানে দিনে প্রায় ২৩০ কপি পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি। আয় কমে যাওয়ায় সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম তাঁর সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিদিনের আয় থেকে চাল-ডালসহ খাবারের খরচ, ঘরভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়া এবং পরিবারের চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হয়। কোনো মাসে বাড়তি খরচ দেখা দিলে বিপাকে পড়তে হয় তাঁকে। সীমিত আয়ে সব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় প্রয়োজনীয় খরচের হিসাবও মেলাতে পারেন না।
দুই ছেলে আলামিন মাদবর (২২) ও ইয়াছিন মাদবরের (১৪) ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকেন মোস্তফা। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানোর পাশাপাশি নিজের ও বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ কিনতে হয় তাঁকে। পরিবারের সবার চাহিদা পূরণ করতে না পারার কষ্টও তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়।
ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবেও স্বস্তি ফেরে না মোস্তফার সংসারে। চারদিকে যখন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কেনে, তখন তাঁকে ভাবতে হয় কীভাবে নিত্যদিনের খরচ মেটাবেন। পরিবারের সবার জন্য ভালো পোশাক কেনা তো দূরের কথা, দৈনন্দিন খাবার ও প্রয়োজনীয় ব্যয় সামলানোই তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই মোস্তফার। বয়স বাড়ছে, বাড়ছে পরিবারের দায়িত্বও। অথচ আয় বাড়ার বদলে কমেছে পত্রিকা বিক্রি। এই পেশার ওপর নির্ভর করে আর কত দিন সংসার চালাতে পারবেন, কীভাবে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন—এসব প্রশ্নই তাঁকে ভাবিয়ে তোলে।
সম্প্রতি নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে সাংবাদিকের কাছে আক্ষেপ করে মোস্তফা বলেন, ‘আর পারা যাচ্ছে না।’ তাঁর এই সংক্ষিপ্ত কথাতেই ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পরিবারের দায়িত্ব সামলানোর ক্লান্তি।
মোস্তফার জীবন কেবল একজন পত্রিকা বিক্রেতার ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি জীবিকার জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করে যাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। মানুষের হাতে প্রতিদিন খবর পৌঁছে দেওয়া এই পরিশ্রমী মানুষটির নিজের জীবনেই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা সংসার চালানো।
৩৫ বছরের শ্রমের পরও মোস্তফার জীবনে স্বস্তি ফেরেনি। আগামীকালও তাঁকে পত্রিকার বোঝা নিয়ে বের হতে হবে। কারণ থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই তাঁর। স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধ মায়ের জীবনযাপনের ভার যে তাঁর আয়ের ওপরই নির্ভরশীল।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
