বরিশাল সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২০, ২০২৬, ০২:২৮ পিএম

এক আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, ৫৪ বছর ধরে সম্প্রীতির অনন্য নজির

বরিশাল সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২০, ২০২৬, ০২:২৮ পিএম

এক আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, ৫৪ বছর ধরে সম্প্রীতির অনন্য নজির

একই মাঠে পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির। দুই উপাসনালয়ের দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট। একদিকে মসজিদে আজান ও নামাজ, অন্যদিকে মন্দিরে ঢাকঢোল, শঙ্খধ্বনি আর পূজার্চনা। তবে আজান শুরু হলে থেমে যায় পূজার বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। ধর্মীয় আচার পালনের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৫৪ বছরের বেশি সময় ধরে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হয়ে আছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা এলাকার শেনেরহাট বাজার জামে মসজিদ ও সার্বজনীন দুর্গা মন্দির।

প্রতিবছরের মতো এবারও সেখানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিরোধ তো নেই-ই, বরং স্থানীয় মুসলিম পরিবারগুলো প্রতিবেশী হিন্দুদের পূজা উদ্‌যাপনে সহযোগিতা করে আসছে। একইভাবে ঈদ, বিয়ে কিংবা পারিবারিক আয়োজনে অংশ নিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।

একই মাঠের এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে দুর্গা মন্দির। দুই উপাসনালয়ের মধ্যে দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট। এত কাছাকাছি অবস্থান হলেও দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৫৪ বছর ধরে এখানে দুই ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রয়েছে। দুর্গাপূজার সময় মন্দিরে ঢাকঢোল, উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি ও রাতভর আরতির আয়োজন হয়। অন্যদিকে মসজিদে নিয়মিত আজান ও জামাতে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মসজিদে আজান শুরু হলে মন্দিরের পূজারি ও ভক্তরা বাদ্যযন্ত্রের শব্দ বন্ধ রাখেন। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই রীতিই স্থানীয় মানুষের কাছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মন্দিরের পূজারি স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, মসজিদে আজান শুরু হলেই তাঁরা পুরো অনুষ্ঠানে বিরতি দেন। নামাজ শেষ হলে আবার পূজার কার্যক্রম শুরু করেন। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এখানে কেউ কারও জন্য বিরক্তির কারণ হননি; বরং দুই ধর্মের অনুসারীরা নিজেদের উপাসনালয়কে পরস্পরের সহযোগিতায় আগলে রেখেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মানকে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। পাশাপাশি অবস্থান করেও দুই উপাসনালয়ের কার্যক্রম যাতে একে অপরের অসুবিধার কারণ না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয়ভাবে সমন্বয় বজায় রাখা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মাকসুদ মৃধা বলেন, এখানে সবাই মিলেমিশে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করেন। তাঁদের পূর্বপুরুষেরাও এভাবেই বসবাস করেছেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁরা পূজা দেখতে মণ্ডপে যান। অন্যদিকে ঈদ কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিবেশীরাও তাঁদের আয়োজনে অংশ নেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, পারস্পরিক যাতায়াত, উৎসবে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন গড়ে উঠেছে। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তাঁরা।

মন্দির কমিটির সভাপতি শংকর চন্দ্র দাস জানান, ১৯৭২ সালে আধুনা শেনের বাড়ি সার্বজনীন দুর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী সময়ে একই মাঠে আধুনা জামে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন। তিনি বলেন, মন্দিরের মাত্র ১০ ফুট দূরে মসজিদ থাকলেও তাঁদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। দুই পক্ষই নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করেন এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন।

দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে পাশাপাশি দুই উপাসনালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া স্থানীয়দের কাছে স্বাভাবিক সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। উৎসবের সময়ও এই সহাবস্থানের রীতি বজায় থাকে। আধুনা শেনের বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা কামরুল ইসলাম বলেন, এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। মসজিদে আজান হলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা ঢাকঢোলের আওয়াজ বন্ধ রাখেন। আজান ও নামাজ শেষ হলে আবার তাঁদের কার্যক্রম শুরু হয়।

তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর ধরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে এখানে সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন। কেউ কখনো কারও প্রতি বিরক্তির কারণ হননি। স্থানীয় মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার যে চর্চা রয়েছে, তা নতুন প্রজন্মের কাছেও সম্প্রীতির শিক্ষা পৌঁছে দিচ্ছে।

গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইব্রাহীম বলেন, উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা গ্রামের একই স্থানে মসজিদ ও মন্দির দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি অনন্য উদাহরণ।

তিনি আরও বলেন, সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে বসবাস করবে—এমন সমাজব্যবস্থাই তাঁরা চান। আধুনা এলাকার পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদ ও মন্দির কেবল দুটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক বন্ধনেরও প্রতীক। আজানের সময় পূজার বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা কিংবা একে অপরের উৎসবে অংশ নেওয়ার মতো চর্চা দেখায়, ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা হলেও পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে একসঙ্গে বসবাস করা সম্ভব।

দীর্ঘ ৫৪ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য স্থানীয়দের কাছে সম্প্রীতির পরিচিত দৃষ্টান্ত। ধর্মীয় ভিন্নতাকে বিরোধের কারণ না বানিয়ে সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যের মাধ্যমে সম্পর্ক ধরে রাখার এই চর্চা অন্য এলাকার মানুষের কাছেও অনুকরণীয় হতে পারে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

Link copied!