লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি হাসপাতালের পুরোনো ভবনে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনায় চিকিৎসক ও রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার দুপুরে ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়লে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার চিকিৎসক রাইসাসহ চারজন রোগী। এর আগে গত ১ অক্টোবর হাসপাতালের রেস্টরুমে পাখাসহ ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে চিকিৎসক ডা. ফৌজিয়া মোস্তফার কাঁধের ওপর। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
হাসপাতালের পুরোনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গত বছর প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে পুরোনো ভবন ও চিকিৎসকদের আবাসিক ভবন সংস্কার করা হলেও গত কয়েক মাস ধরে হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। এতে চিকিৎসক, কর্মচারী ও রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দুপুরে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ল
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে রায়পুর সরকারি হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিচতলার ১২১ নম্বর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার সময় কক্ষে চিকিৎসক ও রোগীরা অবস্থান করছিলেন। তবে অল্পের জন্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।
হাসপাতাল সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত প্রায় চার মাস ধরে ভবনের প্রায় প্রতিটি কক্ষের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। কখনো কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর, কখনো রোগীদের অবস্থানের জায়গায় এসব অংশ ভেঙে পড়ছে। এ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মানুষজনকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে অবস্থান করতে হচ্ছে। সোমবারের ঘটনার পর ঝুঁকিপূর্ণ অংশের নিচে অবস্থান করা রোগীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে ভবনের অন্যান্য অংশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই গেছে।
এর আগে পাখাসহ পলেস্তারা পড়ে আহত চিকিৎসক
গত ১ অক্টোবর দুপুরে হাসপাতালের রেস্টরুমে অবস্থান করছিলেন চিকিৎসক ডা. ফৌজিয়া মোস্তফা। এ সময় ছাদের পলেস্তারা পাখাসহ খসে তাঁর কাঁধের ওপর পড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরপর এ ধরনের ঘটনা ঘটায় হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো দ্রুত মেরামত না করা হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে রোগীদের ভিড় থাকা কক্ষগুলোতে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়লে প্রাণহানি বা গুরুতর আহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কারের পরও কেন এই দশা?
হাসপাতাল সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর রায়পুর সরকারি হাসপাতালের পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এবং চিকিৎসকদের আবাসিক ভবন প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু সংস্কারের পরও পুরোনো ভবনের বিভিন্ন কক্ষের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনা বন্ধ হয়নি।
গত চার মাস ধরে প্রায় প্রতিটি কক্ষে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়ায় সংস্কারকাজের মান ও ভবনের প্রকৃত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সংস্কারকাজে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দাবি, বড় কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটার আগেই ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা এবং চিকিৎসাসেবা চালু রাখার ক্ষেত্রে রোগীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
বারবার জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেই: তত্ত্বাবধায়ক
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নাঈমা নুসরাত জাবীন বলেন, হাসপাতালের পুরোনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অবকাঠামোগত ঝুঁকির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হয়েছে। কিন্তু জানানোর পরও ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন স্থানের ঝুঁকিপূর্ণ সরঞ্জাম ও অবকাঠামো নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো সময় আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
দ্রুত সংস্কার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি
একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীদের যেন ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে না হয়, সে জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার কারণ নির্ধারণ, ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় মেরামতকাজের মাধ্যমে চিকিৎসক, কর্মচারী ও রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রায়পুর সরকারি হাসপাতালের পুরোনো ভবনে ধারাবাহিকভাবে পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনা ভবনটির নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ঝুঁকির কথা জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের মধ্যে এখন বড় দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন চিকিৎসক, রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
