জামালপুর সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০১:০২ পিএম

৬ বছরে পানিফলের আবাদ কমেছে ৪২ শতাংশ, সংকটে চাষিরা

জামালপুর সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০১:০২ পিএম

৬ বছরে পানিফলের আবাদ কমেছে ৪২ শতাংশ, সংকটে চাষিরা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জলাভূমিতে পানির প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, পোকার আক্রমণ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে সংকটে পড়েছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পানিফল চাষ। একসময় স্বাদ ও আকারের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশজুড়ে পরিচিত ছিল এ অঞ্চলের পানিফল। স্থানীয় বিভিন্ন বিল ও জলাশয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা এ চাষ এখন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। গত কয়েক বছরে চাষের জমি কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ। কমেছে ফলন, বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়; একই সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানিফল সরবরাহের বাজারও।

দেওয়ানগঞ্জের চুলকানি বিল, পুঁটিমারি বিল, গুজিমারি বিল, ভেগি বিল, টেংরাগুড়া বিল, ডাকাতিয়া বিল, ভেলামারি বিল ও চুনিয়াপাড়া কোলা একসময় পানিফল চাষের জন্য পরিচিত ছিল। উপজেলার অন্যান্য জলাশয়েও ব্যাপকভাবে এ ফলের আবাদ হতো। কিন্তু বৃষ্টিপাত ও বন্যার ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি জলাভূমিতে পানি কমে যাওয়ায় অনেক জায়গায় পানিফল চাষের উপযোগী জমি সংকুচিত হয়েছে। কোথাও কোথাও এসব জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষ করা হচ্ছে।

ছয় বছরে আবাদ কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেওয়ানগঞ্জে বছরে ৬০ হেক্টরের বেশি জমিতে পানিফল চাষ হতো। এরপর থেকেই আবাদি জমির পরিমাণ কমতে থাকে। ২০২৩ সালে পানিফল চাষ হয় ৪৫ হেক্টর জমিতে, ২০২৪ সালে ৪২ হেক্টর, ২০২৫ সালে ৪০ হেক্টর এবং ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩৫ হেক্টরে।

কৃষি অফিসের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে পানিফল চাষের জমি কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ। জলাভূমিতে পানির সংকট এবং চাষের খরচ বৃদ্ধির কারণে অনেক কৃষক আগের মতো পানিফল চাষ ধরে রাখতে পারছেন না। এভাবে আবাদ কমতে থাকায় শুধু কৃষকদের আয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, স্থানীয়ভাবে পানিফল চাষের সঙ্গে জড়িত বীজ সংগ্রহ, ফল পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ধারাবাহিকতাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

খরচ বেড়েছে, ফলন কমেছে অর্ধেকেরও বেশি

চুলকানি বিলের পানিফল চাষি হাসমত আলী, জাহের আলী ও করিম মিয়া জানান, ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বিঘা জমিতে পানিফল চাষ করতে দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হতো। অনুকূল পরিবেশে এক বিঘা জমিতে ফলন পাওয়া যেত প্রায় ৩০ মণ। কিন্তু বর্তমানে একই জমিতে ফলন কমে ১৪ থেকে ১৫ মণে নেমেছে। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকায়। প্রতি মণ পানিফল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না তাঁরা।

চাষিরা জানান, আগে একই চারা থেকে তিন দফায় পানিফল সংগ্রহ করা যেত। এখন দুই দফার বেশি ফল পাওয়া যায় না। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি চাষের ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় পানিফলের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণেও সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয়ভাবে পানিফলের বীজকে ‘পুল’ বলা হয়। পর্যাপ্ত ফলন না হওয়ায় পরবর্তী মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ সংগ্রহ করাও চাষিদের কাছে আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে।

লাল-কালো পোকার আক্রমণে বাড়ছে ক্ষতি

পানিফল চাষি বেলাল, মজেন, সুফিয়া ও ওমিছা বেগম জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পানিফলে লাল-কালো পোকার আক্রমণ বেড়েছে। এসব পোকা দমনে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করেও তাঁরা আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না। চাষিদের ভাষ্য, একসময় ‘ইন্ডিয়ান ডিডিটি পাউডার’ নামে পরিচিত একটি কীটনাশক পাওয়া যেত, যা তাঁদের মতে পোকার আক্রমণ দমনে কার্যকর ছিল। আগে ৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও পরে এর দাম বেড়ে ৩০০ টাকায় দাঁড়ায়। বর্তমানে ওই কীটনাশক আর পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তাঁরা। বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অথচ ফলন বাড়ছে না। এর সঙ্গে জলাভূমিতে পানির ঘাটতি যুক্ত হয়ে পানিফল চাষকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

ঢাকায় সরবরাহ কমেছে, স্থানীয় বাজারনির্ভরতা বেড়েছে

পানিফল ব্যবসায়ী সমিরুল জানান, একসময় দেওয়ানগঞ্জ থেকে প্রতিদিন দুটি লোকাল ট্রেন ও ট্রাকযোগে পানিফল ঢাকায় পাঠানো হতো। রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও সদরঘাটের আশপাশের বাজারে এসব ফল বিক্রি হতো। এতে স্থানীয় উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা বড় বাজারে পণ্য সরবরাহের সুযোগ পেতেন।

কিন্তু ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া, উৎপাদন কমে আসা এবং পরিবহনসংক্রান্ত সমস্যার কারণে এখন আর আগের মতো ঢাকায় পানিফল পাঠানো হয় না। মাঝেমধ্যে ময়মনসিংহ অঞ্চলে পানিফল পাঠানো হলেও উৎপাদিত ফলের বড় অংশ স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি দূরের বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সুযোগও সীমিত হয়েছে। স্থানীয় বাজারে বিক্রির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় পানিফল চাষ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের আয় ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে পানির স্বাভাবিক চক্রে পরিবর্তন

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রতন মিয়া বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন ও বন্যার স্বাভাবিক চক্রে পরিবর্তন এসেছে। গত কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে বন্যা কম হওয়ায় জলাভূমিতে পানির প্রাপ্যতা কমেছে। এর ফলে পানিফল চাষ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি জানান, পানিফল চাষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাষিদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে পানিফল চাষের সংকট মোকাবিলায় জলাভূমিতে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদ্ধতি শেখানো, উন্নত চাষপ্রযুক্তি ব্যবহার এবং বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন

দেওয়ানগঞ্জের পানিফল চাষের সঙ্গে স্থানীয় কৃষি, জীবিকা ও বাজারব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু জলাভূমি সংকুচিত হওয়া, পানির ঘাটতি, রোগবালাই ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এ ঐতিহ্য এখন অনিশ্চয়তার মুখে। চাষিদের সহায়তা, জলাভূমি সংরক্ষণ, পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, নিরাপদ ও কার্যকর বালাই ব্যবস্থাপনা, উন্নত চাষপদ্ধতি এবং সহজ বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে পানিফল চাষ টিকিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ জন্য কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বাজারব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

Link copied!