মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

একটি গরুর হাট বদলে দিল শিক্ষার চিত্র, স্কুলে নেই কোনো ফি

মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

একটি গরুর হাট বদলে দিল শিক্ষার চিত্র, স্কুলে নেই কোনো ফি

ভর্তি ফি নেই, সেশন ফি নেই, মাসিক বেতনও দিতে হয় না। এমনকি এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ফিও লাগে না। অথচ বিদ্যালয়টি বেসরকারি এবং এখানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ছে ৭১৯ জন শিক্ষার্থী। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়—সবই বহন করা হয় বিকল্প একটি আয়ের উৎস থেকে। সেই উৎস হলো গরুর হাট। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার হরগজ ইউনিয়নের হরগজ শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের ওপর আর্থিক চাপ না দিয়ে সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে গ্রামের বাসিন্দারা গড়ে তুলেছেন বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা। গরুর হাট থেকে পাওয়া আয় দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বিদ্যালয়টি। ফলে আর্থিক সামর্থ্য যা-ই হোক, গ্রামের শিক্ষার্থীরা একই প্রতিষ্ঠানে বিনা খরচে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।

গরুর হাটের আয়েই চলে বিদ্যালয়ের সব ব্যয়

হরগজ শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের বিনা খরচে পড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালে হরগজের কৃতী সন্তান ও সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আ.খ.ম. নূরুল হক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম বশির উদ্দিন ঠান্ডু, আব্দুল হাকিমসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় উদ্যোগী ব্যক্তি বিদ্যালয়ের মাঠে গরুর হাট বসানোর ব্যবস্থা করেন। হাটে পশু বিক্রির বিপরীতে আদায় করা হাসিল থেকে যে অর্থ আসে, তা দিয়ে বিদ্যালয়ের পরিচালন ব্যয় মেটানো হয়। একই অর্থ থেকে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নেও ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায়ের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে গড়ে তোলা আয়ের ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে।

২০১৯ সালে বিদ্যালয়ের মাঠে গরুর হাট বসানো নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিলে হাট কমিটি বিদ্যালয়ের পাশে একটি জমি লিজ নিয়ে সেখানে হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। স্থান পরিবর্তন হলেও হাটের আয় থেকে বিদ্যালয় পরিচালনার ব্যবস্থা আগের মতোই অব্যাহত রয়েছে।

৭১৯ শিক্ষার্থীর জন্য নেই কোনো শিক্ষাব্যয়

বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৭১৯ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের ভর্তি ফি, সেশন ফি, মাসিক বেতন কিংবা অন্য কোনো বিদ্যালয় ফি দিতে হয় না। এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ফিও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় না বলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী লাবণ্য আক্তার ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামিম আল হাসান জানায়, গ্রামের মুরব্বিরা তাঁদের মতো শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এ বিদ্যালয়ে পড়তে কোনো টাকা লাগে না। অভিভাবক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, একটি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত সন্তানকে পড়াতে অনেক টাকা খরচ হতো। কিন্তু এই বিদ্যালয়ে সেই ব্যয় করতে হচ্ছে না। এতে অভিভাবকদের ওপর থেকে বড় ধরনের আর্থিক চাপ কমেছে। ধনী-গরিব পরিবারের শিক্ষার্থীরা একই সুযোগ পাওয়ায় শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যও কমছে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জড়িয়ে আছে বিদ্যালয়ের সঙ্গে

হরগজ শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। ১৯৭১ সালে হরগজ গ্রামের ২৪ জন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে আজাহার উদ্দিন, জয়নাল হোসেন ও জসিম উদ্দিন শহীদ হন। এই তিন বীর শহীদের স্মৃতি ধরে রাখতে ১৯৭২ সালে গ্রামে মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাঁদের স্মরণেই প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হয় হরগজ শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়। ২০ হাজারের বেশি বাসিন্দার হরগজ গ্রামে ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চারটি মাদ্রাসা রয়েছে। তবে হরগজ শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ই গ্রামের একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়। ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব আরও বেশি।

ফলাফলও ধরে রেখেছে বিদ্যালয়টি

বিনা খরচে পড়াশোনার সুযোগের পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি সাটুরিয়া উপজেলায় প্রথম স্থান অর্জন করে। ২০২৬ সালে আটটি জিপিএ-৫ নিয়ে উপজেলায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে এমপিওভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানটি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ বজলুর রহমান বলেন, হরগজ ইউনিয়নের বাসিন্দারা শিক্ষার বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা গরুর হাটের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, যাতে গ্রামের সব সন্তান বিনা বেতনে লেখাপড়া করতে পারে। তিনি জানান, প্রতি রোববার গরুর হাট বসে। হাটে ভালো বেচাকেনা হয়। যোগাযোগব্যবস্থা, গরু ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা এবং তুলনামূলক কম হাসিলের কারণে দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে গরু নিয়ে আসেন। এতে হাট থেকে বিদ্যালয়ের আয় ভালো হয়।

শিক্ষার্থীদের খোঁজ নেন শিক্ষকেরা

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার কামরুল হাসান রাজীব বলেন, প্রত্যেক শিক্ষকের কাছে এক থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীর দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকেরা রাতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের পড়াশোনার খোঁজখবর নেন। তিনি জানান, শিক্ষকদের কয়েকটি দলে ভাগ করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির ভিত্তিতে যে দলের ফল ভালো হয়, সেই দলের শিক্ষকদের অতিরিক্ত সম্মানি দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি শিক্ষকদের আরও মনোযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ১৯৭২ সাল থেকে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের নামের তালিকা তৈরি করে বিদ্যালয়ের দেয়ালে লেখার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরোনো কৃতী শিক্ষার্থীদের নাম দেখে বর্তমান শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় উৎসাহ পাবে বলে আশা করছেন তিনি। বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান আরও বাড়াতে দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনলাইনের মাধ্যমে নতুন শিক্ষণপদ্ধতি সম্পর্কে জানার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে গ্রামের ঐক্য

গ্রামের বাসিন্দা ও সাটুরিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মেহেদি হাসান আরিফ বলেন, সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়ে গ্রামের মানুষ ঐক্যবদ্ধ। সবাই চান, গ্রামের কোনো শিশু যেন আর্থিক কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। হরগজ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, কেউ যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই সব শিক্ষার্থীকে বিনা খরচে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। সাটুরিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফকির জাকির হোসেন বলেন, উপজেলায় ১৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে একমাত্র হরগজ শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিনা খরচে পড়াশোনা করছে। তাঁর মতে, গ্রামের বাসিন্দাদের উন্নত মানসিকতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের কারণেই শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ পাচ্ছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

Link copied!