স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ কাটিয়ে উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা দেখছে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার চরাঞ্চল। যমুনা, কালীগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীবেষ্টিত বাচামারা, বাঘুটিয়া, চরকাটারী ও জিয়নপুরের মানুষের কাছে একসময় পাকা সড়ক ও ব্রিজে চলাচল ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। বর্ষা, নদীভাঙন আর কাঁচা-ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তাঁদের। এখন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সড়ক পাকা ও ব্রিজ নির্মাণের ফলে বদলাতে শুরু করেছে এই জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা। একসময় যে পথে পায়ে হেঁটে চলাচল করাই ছিল কষ্টসাধ্য, সেই পথেই এখন চলছে হ্যালো বাইক, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহন। কৃষকেরা উৎপাদিত ফসল সহজে হাটবাজারে নিতে পারছেন। পাশাপাশি দৌলতপুর, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ সদর ও পার্শ্ববর্তী নাগরপুরের মানুষের যাতায়াতও আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।
নদীভাঙনের চরের আঁকাবাঁকা পথ এখন পাকা
যমুনার ভাঙনের পর জেগে ওঠা চরের ওপর দিয়ে বাচামারা যাওয়ার একমাত্র আঁকাবাঁকা সড়কটি দীর্ঘদিন ছিল বেহাল অবস্থায়। ভাঙাচোরা ও অনুন্নত এই পথে মানুষের চলাচল যেমন কঠিন ছিল, তেমনি কৃষিপণ্য পরিবহনেও নানা বাধার মুখে পড়তে হতো। এলজিইডির উদ্যোগে সড়কটি পাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি সড়কের দুই পাশে সিসি ব্লক বসিয়ে যোগাযোগপথটিকে আরও সুসংগঠিত করা হয়েছে। এর ফলে চরাঞ্চলের কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল ও অন্যান্য পণ্য তুলনামূলক সহজে হাটবাজারে পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছেন। স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতেও এসেছে স্বস্তি। আগে যেখানে পথের দুরবস্থার কারণে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হতো, সেখানে এখন সড়ক উন্নয়নের সুফল পাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
ছয়টি বড় ব্রিজে সহজ হচ্ছে যোগাযোগ
দৌলতপুরের চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে এলজিইডির আওতায় নির্মিত ছয়টি বড় ব্রিজ। চকমিরপুর-কলিয়া সড়কের গাজী ছাইল, উলাইল ও কালিদহ এলাকায় তিনটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে কলিয়া-ধামশ্বর সড়কের পুরাতন ধামশ্বর, ধামশ্বর মাজারসংলগ্ন এলাকা এবং নতুন ধামশ্বর বাজার এলাকায় নির্মিত হয়েছে আরও তিনটি ব্রিজ। এসব ব্রিজের ফলে বিভিন্ন এলাকার মধ্যে যাতায়াতের পথ সহজ হয়েছে। নদী-খাল ও নিচু এলাকার কারণে আগে যে পথে চলাচলে বাড়তি সময় ও কষ্ট হতো, সেখানে এখন যানবাহন চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ব্রিজগুলো চালু হওয়ায় দৌলতপুরের পাশাপাশি সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ সদর এবং টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের যাতায়াতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
১৫ বছরের দুর্ভোগের কথা জানালেন চালকেরা
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণ কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের ভোগান্তি কমারও একটি বড় কারণ। হ্যালো বাইকচালক আবুল কাশেম ও আব্দুল আলী বলেন, গত ১৫ বছর ধরে এই সড়কে চলাচল করতে গিয়ে তাঁদের পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হতো। রাস্তার অবস্থা এমন ছিল যে যানবাহন চলাচল করতে পারত না। এখন সড়কের কাজ হওয়ায় হ্যালো বাইক, অটোরিকশা ও বড় যানবাহন চলাচল করছে। এতে তাঁদের যাতায়াত ও জীবিকার কাজ অনেক সহজ হয়েছে। তিল্লি গ্রামের এক পথযাত্রীও ব্রিজ নির্মাণে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য, ব্রিজটি হওয়ায় এলাকার মানুষের উপকার হয়েছে। এখন সহজেই বিভিন্ন যানবাহনে চলাচল করা যাচ্ছে। তবে গ্রামগঞ্জের যেসব কাঁচা রাস্তা এখনো সংস্কার বা পাকা করা হয়নি, সেগুলোও উন্নয়নের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সড়কের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক অবকাঠামোয় উন্নয়ন
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্থানীয় প্রশাসনিক অবকাঠামোতেও পরিবর্তন আসছে। লাউতারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মান্দারতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাঘুটিয়া ইউনিয়ন কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের কাজ এবং খলসী-শ্যামগঞ্জ সড়কসহ বেশ কয়েকটি পাকা সড়ক ও ব্রিজের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় মানুষের শিক্ষা, প্রশাসনিক সেবা গ্রহণ ও যোগাযোগের সুযোগ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে দুর্গম চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবা পাওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত সহজ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীরের টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের আওতায় রাস্তাঘাট, কালভার্ট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, গোরস্থান, ঈদগাহ ও মন্দিরসহ গ্রামীণ অবকাঠামোর প্রায় ৮০টি উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
উন্নয়ন হলেও নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধের দাবি
সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণে যোগাযোগের দুর্ভোগ কমলেও চরাঞ্চলের মানুষের প্রধান উদ্বেগ এখনো নদীভাঙন। নদীবেষ্টিত এই এলাকার মানুষের কাছে বসতভিটা, কৃষিজমি ও অন্যান্য সম্পদ রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই চলমান উন্নয়নের পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাচামারা গ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুর রউফ মিঠু বলেন, চরাঞ্চলবাসীর প্রধান দাবি এখন নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ। পাশাপাশি আমতলী নদীর ওপর প্রস্তাবিত ব্রিজটি নির্মিত হলে চারটি ইউনিয়নের সরাসরি সড়ক যোগাযোগে নতুন অধ্যায় সূচিত হবে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আমতলী নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ করা গেলে এলাকার যোগাযোগের আরও বিস্তৃত সুযোগ তৈরি হবে। এতে বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষের চলাচল সহজ হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
প্রায় শতকোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শেষ ও চলমান
দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলী খন্দকার এনামুস সালেহীন জানান, সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীরের দিকনির্দেশনা এবং নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল উদ্দিনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে প্রায় শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে এবং কিছু কাজ চলমান রয়েছে। তিনি জানান, আমতলী নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের জন্য জায়গা নির্বাচন ও মাটি পরীক্ষার কাজও সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রস্তাবিত ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চরাঞ্চলে নতুন সম্ভাবনার অপেক্ষা
দৌলতপুরের চরাঞ্চলে পাকা সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণ মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষিপণ্য পরিবহন, স্থানীয় বাজারে যাতায়াত এবং শিক্ষা ও প্রশাসনিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এসব অবকাঠামো নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণই যথেষ্ট নয়। নদীভাঙন প্রতিরোধ, চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন করা এবং দুর্গম এলাকাগুলোতে যোগাযোগের সুবিধা সম্প্রসারণও জরুরি। স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মানিকগঞ্জের চরাঞ্চলে উন্নয়নের সুফল আরও বিস্তৃত হবে এবং দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে জনপদটি এগিয়ে যাওয়ার নতুন সুযোগ পাবে।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
