সমুদ্রদূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ব্যতিক্রমী ভাস্কর্য ‘প্লাস্টিক দানব’। পাঁচ টন প্লাস্টিক ব্যবহার করে তৈরি এ ভাস্কর্য মানুষের অসচেতনতা ও প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিবেশগত ক্ষতির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে পরিবেশসচেতনতা বাড়াতে চার মাসব্যাপী এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।
সোমবার সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। আয়োজকদের আশা, ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগের মাধ্যমে সমুদ্রদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলে সঠিকভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় উৎসাহিত হবেন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
পাঁচ টন প্লাস্টিকে দূষণের প্রতীক
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসা মানুষের কাছে সমুদ্রের সৌন্দর্য যেমন আকর্ষণের কেন্দ্র, তেমনি প্লাস্টিক বর্জ্য এ সৌন্দর্য ও সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। সৈকতে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য একপর্যায়ে সমুদ্রে মিশে সামুদ্রিক প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করতে পারে।
এ বাস্তবতা তুলে ধরতেই পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘প্লাস্টিক দানব’ ভাস্কর্য। পাঁচ টন প্লাস্টিকের ব্যবহার ভাস্কর্যটিকে শুধু একটি শিল্পকর্মে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং প্লাস্টিক বর্জ্যের বিপুল পরিমাণ ও এর সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টিও সামনে এনেছে।
আয়োজকদের মতে, ভাস্কর্যটি দেখে দর্শনার্থীরা যেন শুধু ছবি তুলে চলে না যান, বরং নিজেদের দৈনন্দিন অভ্যাস এবং প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিণতি নিয়েও ভাবেন—এটাই উদ্যোগটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
দুটি প্লাস্টিকের বোতলেই দেখা যাবে সচেতনতামূলক চলচ্চিত্র
ভাস্কর্য প্রদর্শনের পাশাপাশি সৈকতে নির্মাণ করা হয়েছে একটি বিশেষ থিয়েটার। সেখানে দায়িত্বশীল পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতামূলক চলচ্চিত্র দেখানো হবে। চলচ্চিত্রটি দেখার প্রবেশমূল্য হিসেবে দর্শনার্থীদের সঙ্গে আনতে হবে দুটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল।
এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনোদনের সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা নিজেদের কাছে থাকা ব্যবহৃত বোতল জমা দিয়ে চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পাবেন। এতে প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ এবং পুনর্ব্যবহারের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির সুযোগ হবে।
আয়োজকেরা মনে করছেন, প্রচলিত প্রচারণার বাইরে এ ধরনের উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব আচরণে মানুষকে উৎসাহিত করতে পারে। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হওয়া কক্সবাজার সৈকতে এ বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
‘সমুদ্রকে দূষিত করার পেছনে আমাদেরও ভূমিকা আছে’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সমুদ্র দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মানুষের অসচেতনতার কারণে প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্র ও সৈকতের পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দূষণের ভয়াবহতা মানুষের সামনে দৃশ্যমান করে তুলবে এবং নিজেদের আচরণ পরিবর্তনে উৎসাহিত করবে। কক্সবাজারকে পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি পর্যটক, স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের পরিচালক জামাল উদ্দিন বলেন, মানুষ প্রায়ই সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করে, কিন্তু সেই সমুদ্রকে দূষিত করার পেছনে নিজেদের ভূমিকার কথা ভুলে যায়। পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি ‘প্লাস্টিক দানব’ মানুষের অসচেতনতারই প্রতিচ্ছবি।
তিনি বলেন, ভাস্কর্যটি দেখে মানুষ যেন নিজের ব্যবহৃত প্লাস্টিক কোথায় ফেলছে এবং তা সমুদ্রের জন্য কী ধরনের ক্ষতি তৈরি করছে, সেই প্রশ্ন নিজের কাছেই করে।
প্লাস্টিকের বিনিময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন সারা বছর ‘প্লাস্টিক এক্সচেঞ্জ স্টোর’-এর মাধ্যমে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক সংগ্রহ করে। এ কার্যক্রমে মানুষ প্লাস্টিক বর্জ্য জমা দিয়ে তার বিনিময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নেওয়ার সুযোগ পায়।
আয়োজক প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা জানান, এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে যথাযথ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ কার্যক্রমে সংগৃহীত প্লাস্টিকের একটি অংশ ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে ‘প্লাস্টিক দানব’ ভাস্কর্যটি।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, ভাস্কর্যটি প্লাস্টিক দূষণের দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং দায়িত্বশীল পর্যটনের বার্তাও ছড়িয়ে দেবে।
পরিচ্ছন্ন সৈকনের জন্য প্রয়োজন সবার দায়িত্বশীলতা
কক্সবাজার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন সৈকতের পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। এ পরিস্থিতিতে শুধু পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়, পর্যটকদের আচরণে পরিবর্তন আনা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
চার মাসব্যাপী ‘প্লাস্টিক দানব’ প্রদর্শনী ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব আচরণ গড়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা করছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।
সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষা এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, ব্যবহৃত বোতল ও প্যাকেট নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগে অংশ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ টন প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি ‘দানব’ তাই শুধু একটি ভাস্কর্য নয়, বরং পরিচ্ছন্ন সমুদ্র ও দায়িত্বশীল পর্যটনের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি
