নাটোর সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম

ফাঁদ, বিষটোপে চলছে পাখি শিকার, বিপন্ন চলনবিলের জীববৈচিত্র্য

নাটোর সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম

ফাঁদ, বিষটোপে চলছে পাখি শিকার, বিপন্ন চলনবিলের জীববৈচিত্র্য

শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে নাটোরসহ চলনবিলের বিভিন্ন জলাশয়, বিল, নদী ও ফসলের মাঠে বাড়তে শুরু করেছে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির পাখির আনাগোনা। খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে প্রতিবছর শীত মৌসুমে এসব এলাকায় পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটে। তবে পাখির এই আগমনকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে ওঠে একশ্রেণির অসাধু শিকারি। ফাঁদ, জাল, বিষটোপ ও এয়ারগান ব্যবহার করে নির্বিচারে পাখি শিকার ও বিক্রি চলছে। এতে দিন দিন কমছে পাখির সংখ্যা, হুমকিতে পড়ছে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য।

শীতকালে অতিথি ও দেশীয় পাখি শিকার এবং কেনাবেচা সম্পূর্ণ অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান থাকলেও তা উপেক্ষা করে বিভিন্ন এলাকায় পাখি শিকার করছে চক্রটি। স্থানীয় প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে শিকারিদের কারাদণ্ড, জরিমানা এবং পাখি উদ্ধার করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এ অবৈধ কর্মকাণ্ড।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর, নলডাঙ্গার হালতিবিল এবং লালপুর উপজেলার পদ্মাচরে শীতের শুরু থেকেই ফাঁদ, জাল ও বিষটোপ দিয়ে পাখি শিকার করা হয়। পরে এসব পাখি স্থানীয় হাট-বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান ও চায়ের দোকানে গোপনে বিক্রি করা হয়। পাখির চাহিদা থাকায় শিকারিরাও উৎসাহিত হচ্ছে।

গত শনিবার (৩ অক্টোবর) থেকে সোমবার পর্যন্ত চলনবিল ও হালতিবিল এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বিলের ধানক্ষেত ও জলাশয়ের পাশে লতাপাতা দিয়ে বিশেষ ফাঁদ বা ‘কিল্লাঘর’ তৈরি করা হয়েছে। এসব ফাঁদে একটি জীবন্ত পাখিকে আটকে রেখে তার ডাকের মাধ্যমে অন্য পাখিকে আকৃষ্ট করা হয়। পরে জালে ধরা পড়া পাখি খাঁচায় বন্দি করে বিক্রি করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, শিকারিরা কখনো কখনো ধরা পড়া পাখির চোখ অন্ধ করে দেয়। আবার কোনো পাখির পা সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের লম্বা কঞ্চির সাহায্যে গাছের মগডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পাখিটি ছটফট ও ডাকাডাকি করলে আশপাশের অন্য পাখি কাছে আসে এবং জালে আটকা পড়ে।

চলতি সপ্তাহে সিংড়া উপজেলার পাটশাঐল মৌজার ধানক্ষেতে কয়েকজন শিকারিকে বড় পাতার ফাঁদ ও টোপ হিসেবে ব্যবহৃত পাখি নিয়ে তৎপর থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে প্রতি জোড়া পাখি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। এক শিকারি জানান, গত দুই-তিন বছর ধরে শখের বশে পাখি শিকার করছেন। প্রতিদিন ছয়-সাতটি পাখি শিকার করে প্রায় দেড় হাজার টাকা আয় হয় বলেও জানান তিনি।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির বিভিন্ন অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার বক, ৭৩৯টি ঘুঘু, ১০৫টি শামুকখোল, ২২০টি টিয়া, ১৭১টি শালিক, ৮৫টি পাতি সরালি, ৫৫টি ডাহুক, ৩৫০টি চাকলা, ৩০টি মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া পেঁচা, মদনটাক, হিমালয় গৃধিনী শকুন, পানকৌড়ি ও হটটিটিসহ বিভিন্ন বিরল প্রাণীও উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পাখি শিকারের ঘটনায় এ পর্যন্ত ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা, ৪২ জনকে জরিমানা এবং ৭২ জনের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১০টি এয়ারগান জব্দ, ১৬০টি কিল্লাঘর ফাঁদ ধ্বংস এবং প্রায় ৫০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি ১১০টি বাটুল ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে, আবার কিছু পাখি বীজ ছড়িয়ে উদ্ভিদের বংশবিস্তারে সহায়তা করে। পাখির সংখ্যা কমে গেলে পুরো বাস্তুতন্ত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

তিনি জানান, ২০১২ সালে সংগঠনটি গঠিত হয়। ২০১৪ সাল থেকে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ (রাজশাহী বিভাগ) থেকে লাইসেন্স নিয়ে সংগঠনটি পাখি ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় কাজ করছে।

সিংড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত আনজুম বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পাখি হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ পেলে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। শনিবার চলনবিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিন শিকারিকে একদিন করে কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ২ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ সময় অর্ধশতাধিক বক পাখি অবমুক্ত এবং ১০টি কিল্লাঘরের ফাঁদ ধ্বংস করা হয়।

রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, ফাঁদ পেতে পাখি শিকার সম্পূর্ণ অবৈধ। বন বিভাগ সচেতনতামূলক প্রচার, নিয়মিত টহল, মোবাইল কোর্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেমিনার ও লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে।

নাটোর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াত বলেন, শুধু প্রশাসনিক অভিযান চালিয়ে পাখি শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য জনসচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসনগুলোকে জলাশয় ও পাখির আবাসস্থলে নিয়মিত নজরদারি এবং পাখি কেনাবেচা বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবিদদের মতে, নিয়মিত নজরদারি, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমেই চলনবিলকে দেশি ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে রক্ষা করা সম্ভব। একই সঙ্গে বাজারে শিকার করা পাখি কেনা থেকে বিরত থাকা এবং কোথাও পাখি শিকার বা বিক্রি হতে দেখলে প্রশাসন, পুলিশ কিংবা বন বিভাগকে জানানো প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

Link copied!