কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ৫, ২০২৬, ১০:২৬ এএম

চিলমারীতে পশু চিকিৎসার সংকট

চরে নেই পশু চিকিৎসক, চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে গবাদিপশু

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ৫, ২০২৬, ১০:২৬ এএম

চরে নেই পশু চিকিৎসক, চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে গবাদিপশু

উত্তাল ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন গবাদিপশু পালন। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার নদীবেষ্টিত নয়ারহাট, অষ্টমীর চর ও চিলমারী ইউনিয়নের হাজারো পরিবার গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তবে পর্যাপ্ত সরকারি চিকিৎসাসেবা না থাকায় ঝুঁকিতে পড়েছে তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

চরাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোতে স্থায়ী ভেটেরিনারি সার্জন বা প্রাণিসম্পদ চিকিৎসক না থাকায় গবাদিপশু অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া যায় না। ফলে অনেক সময় নদী পেরিয়ে উপজেলা সদরে নেওয়ার পথেই মারা যায় অসুস্থ পশু। এতে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেক প্রান্তিক খামারি।

উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নয়ারহাট, অষ্টমীর চর ও চিলমারী ইউনিয়নে প্রায় ৯ হাজার ৬২৪টি পরিবার বসবাস করে। এসব পরিবারের কাছে রয়েছে প্রায় ২৯ হাজার ২৬০টি গরু-মহিষ এবং ২৮ হাজার ৯৭০টি ছাগল-ভেড়া। এ ছাড়া রয়েছে এক লাখ ১৪ হাজারের বেশি হাঁস-মুরগি। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের মতে, চরাঞ্চলে গবাদিপশুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

চরাঞ্চলের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা পশু চিকিৎসার সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি পরিবারেই পাঁচ থেকে ১০টি গরু-মহিষ রয়েছে। কোনো পশু অসুস্থ হলে মাইলের পর মাইল নদীপথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়। বর্ষাকালে উত্তাল নদী এবং রাতে নৌযান সংকটের কারণে জরুরি চিকিৎসা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য নেওয়ার সময় নৌকাতেই অসুস্থ পশুর মৃত্যু হয়।

কড়াই বরিশাল গ্রামের খামারি জেল হক জোদ্দার বলেন, গরু-ছাগল পালন করেই তাদের সংসার চলে। কোনো পশু অসুস্থ হলে কাছাকাছি চিকিৎসক পাওয়া যায় না। নৌকা ভাড়া করে উপজেলা সদরে নিতে নিতে অনেক সময় পশুর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। একটি গরু মারা গেলে তাদের সংসারের ওপর বড় ধরনের চাপ পড়ে।

খামারি আব্দুস সালাম জানান, ৯০ হাজার টাকা দামের একটি গরুর পেট ফুলে যাওয়ার পর নৌকা না পাওয়ায় সেটিকে উপজেলা সদরের পশু হাসপাতালে নিতে পারেননি। পরে স্থানীয় এক হাতুড়ে চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা করালেও গরুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তার অভিযোগ, চরাঞ্চলে সরকারি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক থাকলে হয়তো এত বড় ক্ষতি হতো না।

স্থানীয়রা জানান, স্থায়ী চিকিৎসক না থাকায় জরুরি চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান, কৃমিনাশক প্রয়োগ ও রোগ প্রতিরোধমূলক সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। ফলে বাধ্য হয়ে অনভিজ্ঞ স্থানীয় ‘হাতুড়ে’ চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে ভুল চিকিৎসায় পশুর মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়ছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১১টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন সাতজন। গুরুত্বপূর্ণ চারটি পদই শূন্য রয়েছে। জনবল সংকটের পাশাপাশি দুর্গম চরাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থার জটিলতার কারণে নিয়মিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, চরবাসীর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস গবাদিপশু। তাই পশু অসুস্থ হলে তাদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। দ্রুত ইউনিয়ন পর্যায়ে উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা পদায়নের পাশাপাশি স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানান তিনি। স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত নৌ মেডিকেল টিমের মাধ্যমে চরাঞ্চলে পশুর চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম চালুরও দাবি জানান তিনি।

চিলমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বীরেন্দ্র নাথ রায় বলেন, সীমিত জনবল নিয়েও তারা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে চরাঞ্চলের প্রতিটি ইউনিয়নে স্থায়ী প্রাণিসম্পদ চিকিৎসক নিয়োগ এবং শূন্য পদগুলো পূরণ করা গেলে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

Link copied!