তাড়াশ(সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১১:০২ এএম

ট্রাক্টর-পাওয়ার টিলারের ভিড়ে তাড়াশে ঘোড়ার হালচাষ

তাড়াশ(সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১১:০২ এএম

ট্রাক্টর-পাওয়ার টিলারের ভিড়ে তাড়াশে ঘোড়ার হালচাষ

জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে আবারও বাড়ছে ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ ও মই দেওয়ার চাহিদা। আধুনিক কৃষিযন্ত্রের যুগে পুরোনো এই পদ্ধতি একদিকে কৃষকদের চাষাবাদের খরচ কমাচ্ছে, অন্যদিকে কয়েকজন কৃষকের জন্য তৈরি হয়েছে বাড়তি আয়ের সুযোগ।

তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের গোস্তা, জন্তিপুর, পাড়িল, লাউতা, হারিসেনা, রোকনপুর ও গুল্টাসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষিজমিতে বর্তমানে ঘোড়া দিয়ে হালচাষ ও মই দেওয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। প্রয়োজনের সময় ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার না পাওয়া এবং জ্বালানির বাড়তি খরচের কারণে অনেক কৃষক তুলনামূলক কম খরচের এই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) তালম ইউনিয়নের গোন্তা গ্রামের একটি কৃষিজমিতে ঘোড়া দিয়ে মই দিতে দেখা যায় কৃষক শফিকুল ইসলামকে। কাদামাটির জমিতে ঘোড়াটি নিয়ন্ত্রণ করে জমির উঁচু-নিচু অংশ সমান করছিলেন তিনি।

শফিকুল ইসলাম জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে ২৪ হাজার টাকা দিয়ে ঘোড়াটি কিনেছেন। এরপর থেকে বিভিন্ন কৃষকের জমিতে হালচাষ ও মই দেওয়ার কাজে ঘোড়াটি ব্যবহার করছেন। বর্তমানে এটিই তার আয়ের অন্যতম মাধ্যম। প্রতি বিঘা জমিতে মই দেওয়ার জন্য তিনি ২৫০ টাকা নেন। দিনে প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে মই দিতে পারেন। এতে তার দৈনিক আয় হয় প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকা। আমন ও বোরো মৌসুমে হালচাষ ও মই দিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। বীজতলা তৈরির কাজেও ঘোড়াটি ব্যবহার করা হয়।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, এলাকায় গরুর জোয়াল-মই এখন প্রায় বিলুপ্ত। কোথাও কোথাও মহিষ দিয়ে মই দেওয়া হলেও প্রয়োজনের সময় ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার পাওয়া যায় না। আবার আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাষাবাদের ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে কম খরচে ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ ও মই দেওয়ার দিকে ঝুঁকছেন অনেকে।

তাদের মতে, ঘোড়া দিয়ে মই দিলে জমির উঁচু-নিচু অংশ তুলনামূলক ভালোভাবে সমান করা যায়। একই জায়গায় প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকবার মই দেওয়া সম্ভব হওয়ায় জমিতে সেচের পানি সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

তালম ইউনিয়নের জন্তিপুর গ্রামের আয়েজ উদ্দিন ফকির বলেন, আগে ঘোড়ার গাড়িতে ধান ও বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করতেন। এখন ঘোড়া দিয়ে জমিতে হালচাষ ও মই দেওয়ার কাজ করছেন। তাকে দেখে তার নাতি আশরাফুল ইসলামও এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

আশরাফুল ইসলাম জানান, প্রায় চার বছর আগে তার নানা বোরো মৌসুমে ঘোড়া দিয়ে হালচাষ শুরু করেন। পরে আরও কয়েকজন এ কাজে যুক্ত হন। তাদের দেখে তিনিও আমন ও বোরো মৌসুমে অর্থের বিনিময়ে অন্যের জমিতে হালচাষ ও মই দেওয়া শুরু করেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ বিঘা জমিতে হালচাষ ও মই দেওয়া যায় বলে জানান তিনি। প্রতি বিঘায় নেন ২০০ টাকা।

তাড়াশের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলাতেও কয়েকজন ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সিংড়ার মোখলেছুর রহমান জানান, আগে ঘোড়ার গাড়িতে মালামাল পরিবহন করতেন। পরে আরও একটি ঘোড়া কিনে প্রশিক্ষণ দিয়ে জমি চাষের কাজে ব্যবহার শুরু করেন। বর্তমানে প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন বিঘা জমি চাষ করে তার আয় হয় প্রায় ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। তবে দুটি ঘোড়ার খাবার বাবদ প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হয়।

ট্রাক্টরচালক সেরাজুল ইসলাম বলেন, তেলের দাম বাড়ায় জমি চাষের খরচও বেড়েছে। ফলে বাড়তি ব্যয় এড়াতে অনেক কৃষক ট্রাক্টরের পরিবর্তে ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ করাচ্ছেন। ঘোড়া দিয়ে চাষে জ্বালানি খরচ না থাকায় ব্যয় তুলনামূলক কম।

তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারের কারণে বর্তমানে ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ সচরাচর দেখা যায় না। তবে প্রয়োজন ও বাড়তি আয়ের জন্য উপজেলার কিছু কৃষক ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ ও মই দেওয়ার কাজ করছেন। কৃষি বিভাগ কৃষকদের আধুনিক ও উন্নত কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকে।

ট্রাক্টর-পাওয়ার টিলারের যুগে তাড়াশের মাঠে ঘোড়ার হালচাষ যেন পুরোনো দিনের কৃষিচিত্র ফিরিয়ে এনেছে। তবে কয়েকজন কৃষকের কাছে এই পুরোনো পদ্ধতিই এখন হয়ে উঠেছে জীবিকার মাধ্যম এবং কম খরচে চাষাবাদের একটি বিকল্প।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

Link copied!