মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বড় একটি অংশ পদ্মা নদীর চরাঞ্চল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা। বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকার অনেক স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে নৌপথই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। এমন বাস্তবতায় হরিরামপুরকে সরকারি গেজেটে দুর্গম উপজেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে দুর্গম ভাতা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সেখানে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ইতোমধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমের আওতায় হরিরামপুরকে দুর্গম এলাকা হিসেবে বিবেচনা করার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গেজেটভুক্ত দুর্গম এলাকার তালিকায় উপজেলার নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ইসির তালিকায় দুর্গম
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমের জন্য দেশের ২৩ জেলার ৭৫টি উপজেলাকে দুর্গম এলাকা হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে দুর্গম এলাকা হিসেবে বিবেচিত হলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট গেজেটে হরিরামপুরের নাম নেই। ফলে একই ধরনের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও তারা দুর্গম এলাকার জন্য প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চরাঞ্চল ঘিরে ভোগান্তি
সরকারি নথি অনুযায়ী, মানিকগঞ্জের দৌলতপুর ও হরিরামপুরকে গ-শ্রেণির উপজেলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দৌলতপুরকে চর উপজেলা হিসেবে দুর্গম এলাকার তালিকায় রাখা হলেও হরিরামপুরকে রাখা হয়নি।
হরিরামপুরের আজিমনগর, লেছরাগঞ্জ ও সুতালড়ি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পদ্মা নদী ও চরাঞ্চলবেষ্টিত। বর্ষায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায়ও বাড়তি সমস্যায় পড়তে হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০ শতাংশ ভাতার দাবি
দুর্গম উপজেলা হিসেবে গেজেটভুক্ত করার দাবিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর হরিরামপুরের চরাঞ্চলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রেসক্লাবে।
আবেদনে ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, নদীভাঙন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় হরিরামপুরকে দুর্গম উপজেলা হিসেবে সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দুর্গম এলাকার জন্য প্রযোজ্য ২০ শতাংশ ভাতা দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা। তবে এ ভাতা চালুর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
শিক্ষা-স্বাস্থ্যেও প্রভাব
চরাঞ্চলের দুর্গমতার কারণে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত যাতায়াত ও পদায়নে সমস্যা হচ্ছে। নদীভাঙনে বিদ্যালয়ের অবস্থান পরিবর্তন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং বর্ষায় নৌপথনির্ভরতার কারণে শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষি ও নদীনির্ভর জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ফলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে নেওয়াও বর্ষাকালে কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়।
প্রশাসনিক কাজেও বাড়তি চাপ
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, দুর্গম চরাঞ্চলে সরকারি তথ্য সংগ্রহ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, বিভিন্ন জরিপ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি সময় ও শ্রম ব্যয় হয়। তাদের মতে, দুর্গম এলাকায় কর্মরতদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে সেখানে কাজের পরিবেশ উন্নত হতে পারে।
হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, ‘চর ভাতার বিষয়ে ডিসি স্যার বরাবর একটা আবেদন দেওয়া হয়েছে, এটার বিষয়ে লেখাও হয়েছে। মিনিস্ট্রি থেকে আমরা এখনো কোনো ফিডব্যাক পাইনি। ডিসি স্যারকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।’
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
