বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সৌদি আরবের অবদান বিশাল। দেশটি শুধু বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার নয়, রেমিট্যান্স আয়েরও শীর্ষ উৎস। লাখ লাখ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান, পরিবারের জীবিকা এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি। অথচ অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখা সৌদি আরবেই বাংলাদেশি কর্মীদের একটি অংশের জীবন কাটছে নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে।
বিশেষ করে নারী কর্মীদের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে গিয়ে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অনেকে। এমনকি নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে সন্তান জন্ম দেওয়ার পরও কেউ কেউ জানেন না, তাঁর সন্তানের বাবা কে!
- ৫.৮৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্সের উৎস দেশেই বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তাহীনতা
- বেতন বঞ্চনা, রহস্যজনক মৃত্যু ও আইনি সংকট
- নারী নিপীড়ন, মৃত্যু ও মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মানবাধিকারকর্মী ও অভিবাসী অধিকার বিশেষজ্ঞ এম রায়হান কবিরের তুলে ধরা এমনই এক নারীর অভিজ্ঞতা সৌদি আরবে নারী কর্মীদের নিরাপত্তার ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সৌদি আরব থেকে সন্তান কোলে দেশে ফিরে আসা এক নারী জানিয়েছিলেন, তিনি মা হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সন্তানের পিতৃপরিচয় তাঁর কাছে অজানা। নিয়োগকর্তা, তাঁর ছেলে, বন্ধু কিংবা গাড়িচালক—কার দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি ওই নারী। রায়হান কবিরের দাবি, এ ধরনের ঘটনা সেখানে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং অহরহ ঘটছে।
একজন নারীর জীবনে এমন অভিজ্ঞতা শুধু যৌন সহিংসতার ভয়াবহতাই প্রকাশ করে না, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের অসহায়ত্বের গভীরতাও সামনে আনে। জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়ে যাওয়া একজন নারীকে যদি এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে বিদেশে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। আরও উদ্বেগজনক হলো, নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরার পর তাঁদের ন্যায়বিচার, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তারও স্পষ্ট চিত্র নেই।
ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসানের অভিযোগ, সৌদি আরব থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে শত শত নারী কর্মী দেশে ফিরছেন। অনেকে ফিরছেন লাশ হয়ে। কিন্তু এসব ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, তদন্ত, দায় নির্ধারণ কিংবা ভবিষ্যতে নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়ে প্রায় ১০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে বিদেশ থেকে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তাঁদের একটি অংশ নির্যাতনের শিকার। একই সময়ে বিদেশ থেকে দেশে এসেছে নারী কর্মীদের অন্তত ৮০০ মরদেহ। এসব পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য নারীর অপ্রকাশিত নির্যাতন, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন এবং পরিবারগুলোর দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ।
রেমিট্যান্সের শীর্ষ উৎস কিন্তু শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রশ্নবোধক
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে এসেছে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই প্রবাহ বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ। বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে দেশটি থেকে।
এই পরিসংখ্যান সৌদি আরবের শ্রমবাজারের গুরুত্ব এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান স্পষ্ট করে। ২০২৫ সালে দেশটিতে সাড়ে সাত লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সেখানে বসবাস করছেন আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ লাখ বাংলাদেশি।
কিন্তু বিপুল এই শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহের বিপরীতে কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নানা অভিযোগ রয়েছে। সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের সমস্যা শুধু শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মক্ষেত্রে বেতন আটকে রাখা, অতিরিক্ত সময় কাজ করানো, খাবার না দেওয়া, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, নিয়োগকর্তার হুমকি এবং আইনি প্রতিকার পেতে দীর্ঘসূত্রতার মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের।
অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার মতো পরিবেশও পান না কর্মীরা। আবার অভিযোগ করলে চাকরি হারানো, আটক হওয়া কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কায় অনেকে নীরব থাকতে বাধ্য হন। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব তাঁদের এই অসহায়ত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।
নির্যাতনের পর দেশে ফেরা, কিন্তু বিচার নেই
সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের পরিস্থিতি পুরুষ কর্মীদের তুলনায় আরও জটিল। বিশেষ করে গৃহকর্মে নিয়োজিত নারীদের অনেককে নিয়োগকর্তার বাড়িতে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হয়। স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ সীমিত, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা এবং দীর্ঘ সময় কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি।
রায়হান কবিরের তুলে ধরা ওই নারীর অভিজ্ঞতা এই সংকটের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিকটি প্রকাশ করে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে একজন নারীকে যখন সন্তানের পিতৃপরিচয় নিয়েও অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়, তখন বোঝা যায় বিদেশে তাঁর নিরাপত্তা ও মর্যাদা কতটা বিপন্ন হয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়, বরং নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়।
নির্যাতনের শিকার নারীদের দেশে ফিরিয়ে আনাই একমাত্র সমাধান হতে পারে না। তাঁদের চিকিৎসা, মানসিক পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন অভিবাসন অধিকারকর্মীরা।
শরিফুল হাসানের মতে, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশ নারী কর্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো বন্ধ রাখার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বড় শ্রমবাজার ধরে রাখার পাশাপাশি কর্মীদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
সৌদিতে নয় মাসে প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশির মৃত্যু
নারী কর্মীদের নির্যাতনের পাশাপাশি সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর পরিসংখ্যানও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সৌদি আরবে প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তবে এসব মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত কারণ কী, কতজন কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, কতজন অসুস্থতায় এবং কতটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও অনুসন্ধান জরুরি।
বিদেশে কোনো কর্মীর মৃত্যু হলে শুধু মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, পরিবারের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া, প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে সহায়তা এবং প্রয়োজন হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। বিশেষ করে রহস্যজনক মৃত্যু কিংবা নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানে যুক্ত হলেও এর পেছনের প্রকৃত ঘটনা ও দায় আড়ালেই থেকে যাবে। সম্প্রতি সৌদি আরবে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষার বিষয়টিকে আরও সামনে এনেছে। বিশেষ করে এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের অবগত না থাকার অভিযোগ কূটনৈতিক তৎপরতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দূতাবাসে সহযোগিতার অভাব
বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য দূতাবাস কেবল কূটনৈতিক যোগাযোগের কেন্দ্র নয়; বিপদের সময় সেটিই তাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আশ্রয়। অথচ সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, দূতাবাস থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা অনেক সময় পাওয়া যায় না।
সাংবাদিক মাসুদ কামালের অভিযোগ, দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা প্রবাসী শ্রমিকদের অনেকেই দূতাবাসে গিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বদলে অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের মুখোমুখি হন। কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল থাকলেও সাধারণ শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে সেই দক্ষতার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।
এখানে প্রশ্ন শুধু দূতাবাসের জনবল কত, সেটি নয়। বরং কর্মীদের অভিযোগ কত দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে, নির্যাতনের শিকার কতজনকে উদ্ধার করা হচ্ছে, আইনি সহায়তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে এবং গুরুতর মামলার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সৌদি আরবে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ বাংলাদেশির বসবাসের বিপরীতে দূতাবাসের জনবল, সক্ষমতা ও সেবার পরিধি যথেষ্ট কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে দূতাবাসের সেবা গ্রহণে শ্রমিকদের ভোগান্তি কমানো, জরুরি অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রত্যেকের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব
সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার, রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু এই সম্পর্কের সাফল্য শুধু কত কর্মী পাঠানো হলো কিংবা কত ডলার দেশে এল, তা দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এর মূল্যায়ন করতে হবে বিদেশে কর্মরত মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, সেটি দিয়েও।
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু সেই অবদানের বিপরীতে তাঁদের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখার সুযোগ নেই। রেমিট্যান্সের প্রতিটি ডলারের পেছনে রয়েছে একজন মানুষের শ্রম, ত্যাগ, স্বপ্ন এবং একটি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। যে নারী বিদেশে গিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে সন্তানের পিতৃপরিচয় নিয়েও অনিশ্চয়তায় ভোগেন, যে শ্রমিক মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে নিপীড়ন সহ্য করেন, কিংবা যে প্রবাসী বিদেশের আদালতে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হন—তাঁদের প্রত্যেকের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে
