প্রধানমন্ত্রীকে ‘বিনম্র শ্রদ্ধা’ ডিসি’র, যেখানে ময়মনসিংহই ‘প্রথম’ জানালেন আমিনুল হক

প্রকাশিতঃ 10:49 am | April 21, 2020

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো :
শেরপুরের জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষ করেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই উচ্চারণ করলেন- ‘ময়মনসিংহ দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় আছে। আমরা একটু ময়মনসিংহ যাচ্ছি।’ জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে তখন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মিজানুর রহমানের পাশে সরকারের দুই প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ ও কেএম খালিদ বাবু। ঘটনা প্রবাহটি সোমবারের (২০ এপ্রিল)।

আরও পড়ুন: সিএমএসডি’র পরিচালককে প্রধানমন্ত্রীর ধন্যবাদ, সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ

সামনেই সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন স্থানীয় একাধিক সংসদ সদস্য, চিকিৎসক, হাসপাতাল পরিচালক, স্বাস্থ্যকর্মী, সশস্ত্র বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউস ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রান্তে যুক্ত হয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) মিজানুর রহমানকে সঞ্চালনার অনুরোধ জানান।

এরপর ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়েই ডিসি মিজানুর রহমান নিজের সংক্ষিপ্ত ভাষ্যে নিজ জেলায় করোনা সংক্রমণের চিত্র প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করেন। বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ময়মনসিংহ জেলার ৬০ লাখ মানুষের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

আরও পড়ুন: ‘দুর্যোগে ভেঙে পড়া যাবে না, শিগগির সংকট কেটে যাবে’

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ময়মনসিং জেলায় এ পর্যন্ত ৫৫৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩১ জনের দেহে কোভিড-১৯ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একজন মৃত্যুবরণ করেছে। আমরা শুরুর দিকেই আপনার চমৎকার একটি ৩১ দফা গাইডলাইন পেয়েছি।

এই গাইডলাইন আমরা সবার সঙ্গে সমন্বয় করে টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছি। এরপরেও যখনই কোন নির্দেশনার প্রয়োজন পড়ে আমরা আপনার কার্যালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা সেই কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করি।

আরও পড়ুন: করোনা পরিস্থিতি মনিটরিংয়ে প্রতি জেলার দায়িত্বে একজন করে সচিব

আমাদের এখানে চমৎকার একটি টিমওয়ার্ক চলছে। সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মাননীয় সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রীবৃন্দ, সবাই তাদের এলাকায় চমৎকারভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।’

ভয়াবহ ছোঁয়াচে ভাইরাস করোনা মহাপ্রলয় শুরুর মাসখানেক আগেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ময়মনসিংহ জেলায় যুক্ত হয়েছিলেন। পাশে ছিলেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও সদরের সংসদ সদস্য বেগম রওশন এরশাদ।

আরও পড়ুন: করোনা প্রতিরোধে নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহেই সেদিন কথা বলেছিলেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো: ইকরামুল হক টিটু। নগরজুড়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্র্যাশ প্রোগ্রামের নাতিদীর্ঘ উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী মুগ্ধ হয়েছিলেন কর্মমুখর নগর সেবক টিটু’র সম্মোহনী বক্তব্যে। স্বভাবতই ময়মনসিংহের কাজের স্পিরিট ও নির্দেশনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি সম্পর্কে পজেটিভ ধারণাই রয়েছে বঙ্গকন্যার।

ময়মনসিংহ প্রথম যেসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে
সোমবারও (২০ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেনেছেন তার ৩১ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও করোনা সংক্রমণ রোধে ময়মনসিংহ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি’র বাস্তবায়নকৃত নানা পদক্ষেপের কথা। বিশেষ করে সারা দেশের মধ্যে ময়মনসিংহই প্রথম এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।

আরও পড়ুন: চলতি মৌসুমে ২১ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য কিনবে সরকার

প্রধানমন্ত্রীর সামনে সেইসব বাস্তবায়নকৃত কর্মযজ্ঞের বিশদ বিবরণ তুলে ধরেন দি ময়মনসিংহ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের টানা তিনবারের নির্বাচিত পরিচালক আমিনুল হক শামীম। দেশের বিশিষ্ট এই ব্যবসায়ী নেতা আবার ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা মেয়র মো: ইকরামুল হক টিটু’র সহোদর বড় ভাই।

প্রধানমন্ত্রীকে সালাম জানিয়ে নিজের বক্তব্যের শুরুতেই ময়মনসিংহ চেম্বার সভাপতি আমিনুল হক শামীম বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার নিকনির্দেশনা পাওয়ার পর আমরা ময়মনসিংহ জেলা চেম্বার ময়মনসিংহের জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে তাৎক্ষণিক আপনার ৩১ দফা বাস্তবায়নে পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করি।

আরও পড়ুন: করোনা পরিস্থিতি মনিটরিংয়ে প্রতি জেলার দায়িত্বে একজন করে সচিব

আমাদের ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে মাঠে নেমে পরি। বাংলাদেশে আমরাই প্রথম জেলা প্রশাসক মহোদয়, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন এবং সুযোগ্য মেয়র ওনাদের নিয়ে গণপরিবহন জীবাণুমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করি। এবং স্প্রে এর মাধ্যমে ওনাদের সহযোগীতায় জীবাণুনাশক প্রদান করি এবং টার্মিনাল গুলোতে আমাদের নিজ উদ্যোগে চেম্বারের উদ্যোগে হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন করি।’

তিনি বলেন, ‘আমরাই প্রথম বাসের সময়সীমা ৬ টা পর্যন্ত নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে আমরা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা সকল বাজার সমিতি নিয়ে মিটিং করি। মিটিং করে একটি মনিটরিং টিম গঠন করি যাতে সাধারণ পাবলিকেও সংযুক্ত করি। তখন বাজার কিছুটা উর্ধ্বমুখী ছিল। সেই সময়ে আমরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হই।’

আরও পড়ুন: কৃষকের ধান কেটে দেওয়ায় ছাত্রলীগের প্রশংসায় প্রধানমন্ত্রী

প্রতিদিন বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ, মজুদ সম্পর্কে আমরা ডাটা সংগ্রহ করে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করি, উল্লেখ করে এফবিসিসিআই’র ইতিহাসে রেকর্ড ভোটে বারবার নির্বাচিত এই সাবেক পরিচালক বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গায় সরবরাহ বিঘ্নিত হলে আমরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ওই জায়গাগুলোতে সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্ষম হই।

আমরা ১৯ তারিখে সকল মার্কেটে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা সম্পন্ন করি। এবং ১৯ তারিখ থেকে ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করে স্বেচ্ছায় সকাল ১১টা থেকে সন্ধা ৬টা পর্যন্ত দোকান চালু রাখি এবং অপ্রয়োজনীয় দোকান বন্ধের উদ্যোগ গ্রহন করি। ব্যবসায়ীরা এটি স্বেচ্ছায় মেনে নেয়।’

আরও পড়ুন: ভিডিও কনফারেন্সে সেনাবাহিনীর প্রতিনিধির কথা শোনতে চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

ময়মনসিংহ চেম্বার সভাপতি আমিনুল হক বলেন, ‘আমরা পরবর্তীতে আপনার (প্রধানমন্ত্রী) নির্দেশনা মোতাবেক চেম্বার থেকে যথেষ্ট পরিমাণ সুরক্ষা সামগ্রী শ্রমিকদের মাঝে মাস্ক ও সাবান বিতরণ করি গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত।

আপনি জেনে খুশি হবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার নিকনির্দেশনা অনুযায়ী আমরা নিজেদের উদ্যোগে এবং ব্যবসায়ী মহলের এবং দানশীল ব্যক্তিবর্গের সহায়তায় গত ৩০ মার্চ থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের, কর্মচারী, হকার, মাঝি, ফুটপাত ও পরিবহন শ্রমিকের মাঝে খাদ্যবিতরণ কর্মসূচী অব্যাহত রেখেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা দুস্থ পরিবারকে সম্মানিত মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের মাধ্যমেও খাদ্যদ্রব্য প্রদান করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি শোনে খুশি হবেন, আমরা এই খাদ্যদ্রব্য প্রদান কর্মসূচী আশা করি ঈদ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে সক্ষম হবো, ইনশাআল্লাহ। আর আমাদের বাজারের মজুদ যথেষ্ট আছে। আসন্ন মাহে রমজানে ছোলা ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের কোন অভাব হবেনা।’

আপনি ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকবো
ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম সহ-সভাপতি আমিনুল হক শামীম। চিরায়ত ধারার রাজনীতির বিপরীতে সৃষ্টিশীলতাকেই প্রাধান্য দেন। বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্ত:প্রাণ এ রাজনীতিক ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের অন্যতম সংগঠক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

নিজের বক্তব্যের শেষভাগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে তার আশাবাদী বক্তব্য- ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি সুস্থ থাকুন। আপনি সুস্থ থাকলেই আমরা ভালো থাকবো, দেশবাসী ভালো থাকবে।’

একজন ব্যবসায়ী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার প্রশংসা করে আমিনুল হক শামীম বলেন, ‘আমরা আপনার কাছে যাওয়ার আগে আপনি আমাদের যে প্রণোদনা দিয়েছেন আমরা ইনশাআল্লাহ ব্যবসার চাকা চালু রাখতে পারবো। এবং আগামী দিনে আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তর করতে পারবো। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আপনার মাধ্যমেই বাস্তাবয়ন হবে ইনশাআল্লাহ।’

প্রধানমন্ত্রী বললেন, সবাই দোয়া করেন
ভিডিও কনফারেন্সে ঘন্টার পর ঘন্টা সবার বক্তব্য শোনেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রয়োজনীয় নোট নেন এবং দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। ময়মনসিংহ চেম্বারের সভাপতির বক্তব্য শেষ হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক ধন্যবাদ। ব্যবসায়ীরা যাতে ব্যবসা চালাতে পারে এজন্যই এই সুযোগ দিয়েছি। সবাই দোয়া করেন যাতে আমরা এই দুর্যোগ থেকে মুক্তি পাই।’

অনুষ্ঠানে গণভবন প্রান্তে অন্যদের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড.খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমেদ চৌধুরীসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এসআর/এএম

Print Friendly, PDF & Email