স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ০৭:৫৭ পিএম

মাতৃত্বের বিরতি শেষে এবার বাংলাদেশের নেতৃত্বে নিশি

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ০৭:৫৭ পিএম

মাতৃত্বের বিরতি শেষে এবার বাংলাদেশের নেতৃত্বে নিশি

মাতৃত্বের কারণে একসময় আন্তর্জাতিক হ্যান্ডবলে বাংলাদেশের হয়ে খেলার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল ইসমেতারা নিশির। ছয় বছর পর সেই আন্তর্জাতিক মঞ্চেই ফিরছেন তিনি। তবে এবার প্রত্যাবর্তনটা কেবল একজন খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বাংলাদেশ নারী হ্যান্ডবল দলের অধিনায়ক হিসেবে। পঞ্চগড় থেকে উঠে আসা বাংলাদেশ আনসারের এই খেলোয়াড়ের সামনে এবার ঘরের মাঠে দলকে ফাইনালে তোলার বড় চ্যালেঞ্জ।

আগামী ১৮ অক্টোবর ঢাকার পল্টনের ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী জাতীয় হ্যান্ডবল স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়া আইএইচএফ নেশনস ট্রফি। চার দলের এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভারত, নেপাল ও মালদ্বীপ। দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভালো ফলের প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। আর দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে নিশির কাঁধে।

২০১৯ সালে সুযোগ এসেও খেলা হয়নি

২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক হ্যান্ডবল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হয়ে খেলার সুযোগ এসেছিল নিশির সামনে। কিন্তু তখন তাঁর সন্তান ছোট থাকায় জাতীয় দলে জায়গা হয়নি। মাতৃত্বের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে আন্তর্জাতিক হ্যান্ডবল থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। ছয় বছর পর সেই অপেক্ষার অবসান। এবার জাতীয় দলের জার্সিতে ফেরার পাশাপাশি নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বও পেয়েছেন তিনি। ফলে এবারের টুর্নামেন্ট নিশির কাছে শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফেরার উপলক্ষ নয়, নিজের সামর্থ্য প্রমাণেরও সুযোগ। তবে ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের চেয়ে দলীয় সাফল্যকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এই অধিনায়ক। ঘরের মাঠে সমর্থকদের সামনে ভালো খেলা উপহার দিয়ে বাংলাদেশকে ফাইনালে নিয়ে যাওয়াই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।

তিন মাসের নিবিড় অনুশীলনে নতুন কৌশল

আসন্ন টুর্নামেন্ট সামনে রেখে প্রস্তুতিতেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ দল। এবারই প্রথম বিদেশি কোচের অধীনে অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশের মেয়েরা। স্প্যানিশ কোচ আনা আলোনসো ফ্রাগুয়ার অধীনে টানা তিন মাসের নিবিড় অনুশীলনে আধুনিক হ্যান্ডবলের বিভিন্ন কৌশল শেখার সুযোগ হয়েছে তাঁদের। নিশির মতে, এই প্রশিক্ষণ দলের জন্য বড় প্রাপ্তি। দীর্ঘ সময় ধরে নিবিড় অনুশীলন করায় খেলোয়াড়েরা নিজেদের খেলার ধরন ও কৌশল আরও উন্নত করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘ তিন মাস আমরা নিবিড় অনুশীলন করেছি। এবারই প্রথম কোনো বিদেশি কোচের অধীনে অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছি, এর আগে এমন সুযোগ কখনো হয়নি। কোচের কাছ থেকে আমরা আধুনিক অনেক কৌশল শিখেছি। কোর্টে নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে খেলে দেশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনাই আমাদের মূল লক্ষ্য।” প্রথমবারের মতো বিদেশি কোচের অধীনে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মাঠে নিজেদের সেরাটা দিতে চান খেলোয়াড়েরা। এখন অনুশীলনে শেখা কৌশল প্রতিযোগিতার ম্যাচে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, সেটিই হবে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ফাইনালের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ভারত

অধিনায়ক হিসেবে নিশির লক্ষ্য পরিষ্কার—ফাইনালে খেলা। তবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে ভারতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বাংলাদেশকে। একই সঙ্গে নেপাল ও মালদ্বীপকেও কোনোভাবেই হালকাভাবে নিতে চান না তিনি। নিশির মূল্যায়নে, নেপালের রক্ষণভাগ বেশ শক্তিশালী। অন্যদিকে মালদ্বীপের খেলাতেও আগের তুলনায় উন্নতি হয়েছে। তাই প্রতিটি ম্যাচেই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সেরা পারফরম্যান্স তুলে ধরতে হবে বাংলাদেশকে। প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে ধারণা থাকলেও নিজেদের দল নিয়ে আশাবাদী নিশি। তাঁর মতে, বর্তমান স্কোয়াডের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁদের অনেকে ২০১৯ সালের দলেও ছিলেন। অভিজ্ঞতা ও বর্তমান প্রস্তুতির সমন্বয়ে দলটি ভালো ফল করতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। নিশি বলেন, “দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়েরই আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১৯ সালের দলেও অনেকেই খেলেছে। তবে তখন আমার সন্তান ছোট থাকায় আমি দলে থাকতে পারিনি। বর্তমানে দল বেশ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নিজেদের সেরা খেলাটা উপহার দিতে পারলে আশা করি ভারতের সঙ্গে আমরাই ফাইনাল খেলব।”

নারী হ্যান্ডবলে ভালো খেলোয়াড় তৈরির ভাবনা

নিশির ভাবনা শুধু আসন্ন প্রতিযোগিতার সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের নারী হ্যান্ডবলে ভবিষ্যতে আরও ভালো খেলোয়াড় তৈরি করতে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন, সে বিষয়েও নিজের মত তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশের নারী হ্যান্ডবলের অনেক খেলোয়াড় জেলা পর্যায় থেকে উঠে আসেন। স্কুলের শিক্ষকদের কাছেই তাঁদের হ্যান্ডবলের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তবে শুরু থেকেই আধুনিক প্রশিক্ষণ ও উন্নত কৌশল শেখার সুযোগ পেলে খেলোয়াড়দের বিকাশ আরও দ্রুত হতে পারে।

এ কারণে দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি কোচের অধীনে প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হ্যান্ডবল ফেডারেশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নিশি। তাঁর বিশ্বাস, খেলোয়াড়দের ভিত্তি মজবুত করার ওপর গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সাফল্যের সম্ভাবনাও বাড়বে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা সবাই মূলত জেলা পর্যায় থেকে উঠে আসি, স্কুলের শিক্ষকদের কাছেই আমাদের প্রাথমিক শেখা। শুরু থেকেই যদি দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পে এমন বিদেশি কোচের অধীনে অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করা যায়, তবে মেয়েরা গোড়াতেই আধুনিক হ্যান্ডবলের সঠিক পাঠ পাবে। শুরুটাই যদি সেরা মানের হয়, তবে মেয়েরা আরও দ্রুত উন্নতি করবে এবং ভবিষ্যতে দেশকে বড় সাফল্য এনে দিতে পারবে।”

ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন থেকে দলীয় সাফল্যের স্বপ্ন

মাতৃত্বের কারণে যে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একসময় খেলা হয়নি, সেখানেই এবার অধিনায়ক হিসেবে ফিরছেন নিশি। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ব্যক্তিগত জীবনের একটি নতুন অধ্যায় হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নারী হ্যান্ডবলের প্রত্যাশা। ১৮ অক্টোবর শুরু হতে যাওয়া বেগম খালেদা জিয়া আইএইচএফ নেশনস ট্রফিতে বাংলাদেশের সামনে থাকবে ভারত, নেপাল ও মালদ্বীপের চ্যালেঞ্জ। তিন মাসের নিবিড় প্রস্তুতি, অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয় এবং অধিনায়ক নিশির নেতৃত্ব কাজে লাগিয়ে ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখছে দল।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

Link copied!