করোনায় প্রেম ও ভালোবাসা

প্রকাশিতঃ 9:42 am | October 14, 2020

ডা. শামীম তালুকদার:

করোনাভাইরাস মহামারি মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। বিশেষ করে করোনা ঠেকাতে সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা এবং অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ থাকায় একপ্রকার বন্দি জীবন-যাপন করতে হয়েছে প্রায় সকল বয়সের মানুষকে। বিশ্বে করোনা সংক্রমণের ১০টি মাস অতিক্রান্ত হতে চললেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় করোনা সংক্রমণ রোধে এখনও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকায় তরুণরা ঘরের ভেতরে তাদের সময় কাটাচ্ছেন। ইন্টারনেট, মোবাইল, কম্পিউটার বা ল্যাপটপ হয়ে উঠেছে তাদের সময় কাটানোর অন্যতম সঙ্গী। ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই সেই সঙ্গে পড়াশোনার চাপ না থাকায় অনলাইনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মেরে, মুভি দেখে তাদের সময় কাটছে। কিন্তু এতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য পুরোপুরি বিকশিত হচ্ছে না। করোনার আর্থসামাজিক ইস্যুগুলোর মধ্যে এ বিষয়টি ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ। তবে করোনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও সামাজিক যে বিষয়টি লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাচ্ছে সেটি হচ্ছে, করোনাকালীন প্রেম অর্থাৎ বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির মানুষের প্রেম, ভালোবাসা ও শারীরিক সম্পর্কের ওপর করোনার প্রভাব এবং এই প্রভাব থেকে সৃষ্ট সামাজিক সংকট।

দাম্পত্য জীবনের ওপর করোনার প্রভাব
বিশ্বে করোনা সংক্রমণের পর স্বাভাবিকভাবে একটি প্রশ্ন উঠেছিল যে, করোনার মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক কতটুকু নিরাপদ? এমন প্রশ্নের উত্তরে ব্রিটেনের চিকিৎসক ডা. অ্যালেক্স জর্জ বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, ‘আপনি যদি একটি সম্পর্কের মধ্যে থাকেন এবং দুজন যদি একসঙ্গে একই বাড়িতে এবং একই পরিচিত গণ্ডির ভেতর থাকেন, তাহলে উদ্বিগ্ন হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। তবে দুজনের মধ্যে একজনের শরীরে যদি করোনাভাইরাসের কোনো উপসর্গ দেখা যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে হবে। যার শরীরে উপসর্গ, তাকে বাড়িতেই আইসোলেশনে চলে যেতে হবে।’ একই প্রশ্নের উত্তরে শারীরিক সম্পর্ক বিষয়ক লেখিকা অ্যালিক্স ফক্স বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, ‘এটা ভেবে নেয়া ঠিক হবে না যে আপনার শরীরে অল্পস্বল্প উপসর্গ থাকলে তাতে আপনার সঙ্গীর কিছু হবে না। উপসর্গ দেখা দিলেই তার কাছ থেকে দূরে থাকুন।’ [১] সুতরাং এই দুই বিশেষজ্ঞের মতামত থেকেই বোঝা যায় যে, করোনাকালীন স্বামী-স্ত্রীও একে-অপরের কাছে নিরাপদ নন যদি তাদের কারও শরীরে করোনার উপসর্গ থাকে। বাস্তব কয়েকটি উদাহরণও সে কথাই বলছে- ১. স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরিজীবী। মে মাসের মাঝামাঝি স্ত্রীর করোনা শনাক্ত হওয়ার পর রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করানো হয়। একপর্যায়ে স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে পড়ে। সংক্রমণের ভয়ে স্বামী একদিনের জন্যও স্ত্রীকে দেখতে হাসপাতালে যেতে পারেননি। উদ্বিগ্ন স্বামী বাসাতেই থাকতেন। একসময় স্বামীরও করোনা শনাক্ত হয়। হাসপাতালে স্ত্রী বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। দুজন করোনামুক্ত হলেও পরিবারটির বিপর্যয় কাটেনি। আত্মীয়রা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন কি-না, তা বুঝে উঠতে পারছেন না। [২] ২. কর্মসূত্রে রল্ফকে সারা সপ্তাহ ধরে স্ত্রীর থেকে দূরে থাকতে হতো। হোম অফিস করার সুযোগ পেয়ে তিনি শুরুতে খুশি হলেও এক সপ্তাহ পর তিনি হাড়েহাড়ে টের পেলেন যে, সারাক্ষণ বাসায় থাকা তার জন্য মোটেই সুখকর নয়। সংসারের কাজ ভাগাভাগি করা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার ফলে শারীরিক সম্পর্ক মোটেই আনন্দদায়ক হচ্ছিল না। ফলে তিনি আবার নিজের কর্মস্থলের ছোট বাসায় ফিরে গেলেন। [৩] ৩. মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল্লাহ আল মারুফ রাসেল। রোগীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই ডাক্তার সাধারণের চিকিৎসা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হন করোনাভাইরাসে। সেই সঙ্গে উনার স্ত্রী গাইনিরোগ বিশেষজ্ঞ মির্জা ফারজানা হলিও আক্রান্ত হন। এরপর থেকেই তারা চলে যান আইসোলেশনে। গত ৫ মে তাদের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। ডা. রাসেল পরিবার নিয়ে মৌলভীবাজারে বসবাস করছেন চাকরির সুবাদে। তিনি আক্রান্ত হওয়ার পরের দিন ৭ মে ঢাকায় বসবাসরত তার বাবা মো. আব্দুর রহিম (৭০) অসুস্থ হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং গত ১১ মে মৃত্যুবরণ করেন। বাবার অসুস্থতা থেকে মৃত্যুর মুহূর্ত এমনকি জানাজাতেও অংশ নিতে না পারার আফসোস ডা. আবদুল্লাহ আল মারুফ রাসেলকে করোনা আক্রান্ত হওয়ার চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়েছে বলে তিনি জানান। [৪] ৪. করোনার উপসর্গ নিয়ে সাভারের নবীনগর থেকে স্বামীর বাড়ি ফেরায় ভয়ে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছেন স্ত্রী। ঘটনাটি ঘটেছে আলমডাঙ্গার হারদী ইউনিয়নের প্রাগপুর গ্রামে। জানা গেছে, প্রাগপুর গ্রামের ওয়াজেদ আলীর ছেলে রেজাউল করিম স্ত্রী-সন্তান বাড়িতে রেখে সাভারের নবীনগরে একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। সেখানেই তার শরীরে করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেয়। বাড়িতেও তিনি এ খবর দেন। শরীরের অবস্থা অবনতি হওয়ায় তিনি বাড়িতে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। রেজাউল করোনার উপসর্গ নিয়ে শুক্রবার দুপুরে গ্রামের বাড়িতে এসে ওঠেন। তিনি করোনা নিয়ে উপস্থিত হওয়ায় আঁতকে ওঠেন বাড়ির লোকজন। ভয়ে রেজাউলের স্ত্রী তার পুত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। রাত পর্যন্ত তিনি আর বাড়িতে ফিরে আসেননি। [৫] ৫. করোনা আক্রান্ত স্ত্রীর সঙ্গেই হাসপাতালে থাকছেন সুস্থ স্বামীও।

করোনায় বেড়েছে নারী ও শিশুসহ সামাজিক সহিংসতার হার
[১. ‘করোনাভাইরাস এবং সেক্স: আপনার কী কী জানা প্রয়োজন‘, ৩০ মার্চ ২০২০, বিবিস বাংলা; ২. শিশির মোড়ল, ‘করোনায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা গভীর হচ্ছে’, ১৩ জুলাই ২০২০, প্রথম আলো; ৩. ‘সেক্স ইন টাইমস অব দ্য করোনাভাইরাস’, ২৪ মার্চ ২০২০, ডয়চে ভেলে; ৪. রিপন দে, ‘চিকিৎসা দিতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত ডাক্তার দম্পতি, দেখতে পারেননি মৃত বাবাকেও’, ১৩ মে ২০২০, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড; ৫. ‘করোনা উপসর্গ নিয়ে স্বামীর বাড়ি ফেরায় ভয়ে স্ত্রী পলাতক’, ৬ জুন ২০২০, ইত্তেফাক]

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্ত্রীর জন্য ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন তিনি। এ ঘটনা দেখা গিয়েছে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর হেলথ ইন্সটিটিউটের আইসোলেশন ওয়ার্ডে। নানা বাধা বা সরকারি নিয়মকে তোয়াক্কা না করে আক্কেলপুরের এক যুবক তার করোনা আক্রান্ত স্ত্রীর সঙ্গে জোর করেই আইসোলেশনে থাকছেন। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই নাকি তিনি স্ত্রীর সঙ্গে আইসোলেশন সেন্টারে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানকার কর্তৃপক্ষও তাকে আইসোলেশনে থাকার অনুমতি দিতে কার্যত বাধ্য হয়। আইসোলেশন ইউনিটের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. শাহীন রেজা ঘটনাটি তার নিজের ফেসবুকে শেয়ার করেন। [৬] ৬. করোনাকালীন স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘদিন দেখা না হওয়ায় অবসাদে আত্মহত্যা করেছেন ভারতের আর আহমেদ ডেন্টাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক পিজিটি ছাত্রী। আত্মঘাতী ওই জুনিয়র চিকিৎসকের নাম মানসী মণ্ডল। তিনি পুরুলিয়ার বাসিন্দা। তার হোস্টেলের ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতর গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতী হন এই জুনিয়র চিকিৎসক। তার ঘরের ভেতর থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করে পুলিশ। সেই সুইসাইড নোটে মানসিক অবসাদের কথা লেখা রয়েছে। [৭] ৭. ইংল্যান্ডে সম্প্রতি নতুন আইন পাস হয়েছে যেখানে স্বামী-স্ত্রী বা সঙ্গীরা যদি একসঙ্গে না থাকেন, তাহলে ঘরের ভেতর শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হওয়া বা রাত্রিযাপন করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যজুড়ে বিলি করা সরকারি নির্দেশনাতেও যুগলরা একই ছাদের নিচে একসঙ্গে না থাকলে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে ‘না’ বলা হয়েছে। ঘরের বাইরে অন্য কারও সঙ্গেও শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হতে বারণ করা হয়েছে। [৮] ৮. মিশরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এক নারীকে পাঁচতলা থেকে ফেলে দিয়েছে তার স্বামী। এ ঘটনায় ওই স্বামীকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। তবে পাঁচতলা থেকে নিচে পড়ার পরও বেঁচে গেছেন ২৫ বছর বয়সী ওই নারী। ওই ঘটনার পর প্রতিবেশীরা আহত মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তিনি বেঁচে যান। তবে মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পান তিনি। [৯]

করোনাকালীন বিবাহিত দম্পতিরা অনেকেই তাদের কাছের মানুষটিকে লম্বা সময়ের জন্য কাছে পেয়েছেন। এতে তারা একসঙ্গে অনেকটা সময় থাকার সুযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি একেক দম্পতির কাছে একেক রকম। যারা নব্যবিবাহিত তাদের কাছে সময়টা দীর্ঘ হানিমুনের মতো মনে হয়েছে। আবার যারা বৈবাহিক জীবনের অনেকটা সময় একসঙ্গে পার করে এসেছেন, তাদের কাছে বিষয়টি সমঝোতার। একসঙ্গে বাড়ির কাজকর্ম, সন্তান-সন্ততি নিয়ে কিছুদিন একসঙ্গে ছুটি উপভোগ করেছেন তারা। কিছু দম্পতি পেশাগত প্রয়োজনে হয়তো দূরে থেকেছেন কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া ও আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন অ্যাপ (হোয়াটস অ্যাপ, মেসেঞ্জার, ইমো, স্কাইপে) ব্যবহারের মাধ্যমে প্রিয়জনের সঙ্গে সবসময় কানেক্টেড থেকেছেন। ডাক্তারদের অনেকের ক্ষেত্রেই করোনার সময়টাতে দেখা গেছে তারা বাড়িতে যেতে পারেননি। সেক্ষেত্রে এসব অ্যাপের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ রক্ষা করেছেন তাদের স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে। তবে সমস্যা হলো, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য শারীরিক সংস্পর্শের প্রয়োজন রয়েছে। কেননা স্পর্শ শরীরে বিভিন্ন হরমোনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে, যা প্রয়োজনীয় অনুভূতির জন্ম দেয় এবং মানসিক চাপমুক্তি ঘটায়। ইতিবাচক স্পর্শে মানুষের শরীরে ডোপামিন, সেরোটোনিন, অক্সিটোসিন নামের হরমোন নিঃসরণ বাড়ায় এবং করটিজল নিঃসরণ কমায়, যার ফলে ইতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টি হয়। যেমন- অনুপ্রেরণা, সন্তুষ্টি, নিরাপত্তা, মানসিক চাপমুক্তি ইত্যাদি। দীর্ঘদিন সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা মানসিক দূরত্ব তৈরি করতে পারে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমাতে পারে এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও আদান-প্রদানের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার একটি ভয়াবহ সম্ভাবনা থাকে। যার দ্বারা পরবর্তীতে সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার শঙ্কা অনেক বেশি।

[৬. শফিউল বারী রাসেল, ‘কাছাকাছি তারা, আইসোলেশনে খুঁজে পেয়েছেন ভালোবাসা’, ১১ মে ২০২০, চ্যানেল আই; ৭. ‘লকডাউনে স্বামীকে কাছে না পেয়ে স্ত্রীর আত্মহত্যা’, ২৩ জুলাই ২০২০, সময় নিউজ; ৮. ‘যৌনমিলন কি করোনার ঝুঁকি বাড়ায়?’, ৫ জুন ২০২০, ইনকিলাব; ৯. ‘করোনায় আক্রান্ত স্ত্রীকে ৫ তলা থেকে ফেলে দিল স্বামী’, ২৫ জুন ২০২০, একুশে টেলিভিশন লিমিটেড]

করোনার কারণে দম্পতিদের কাছে আসার সুযোগ তৈরি হওয়া বা একসঙ্গে দীর্ঘসময় কাটানোর পজিটিভ দিকগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কিছু নেগেটিভ দিকও লক্ষণীয়। যেমন- দীর্ঘসময় একসঙ্গে থাকার কারণে, কাজের প্রেশার কম থাকার কারণে এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় মানুষের মধ্যে একঘেয়েমি চলে আসে এবং হতাশা তৈরি হয়। হতাশা একসময় রাগে রূপান্তরিত হয়। ফলে খুঁটিনাটি বিষয়ে ঝগড়াসহ বিভিন্ন পারিবারিক কলহ তৈরি হতে দেখা যায়। দিনের পর দিন ঘরে থেকে অনেকেই মানসিক অস্থিরতা ভেতরে চেপে রাখতে পারেন না। ছোট ছোট বিষয়ে হয়তো রিঅ্যাক্ট করেন, রেগে যান। এই রাগ বেশিরভাগ সময় ঝরে পড়ে সঙ্গীর ওপর। ফলাফল দাম্পত্য কলহ, অশান্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঙ্গী সবসময় কাছে থাকলে আকর্ষণ অনেক সময় কমে যায়। বিচ্ছেদের ফলে সেই আকর্ষণ বেড়ে যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক মেখলা সরকার তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি দেখতে পাচ্ছি যে, করোনার কারণে সৃষ্ট গৃহবন্দি পরিস্থিতিতে পারিবারিক সহিংসতা অনেকাংশে বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ঝগড়া বা বিভিন্ন নেতিবাচক আচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনার সময় পরিবারের সবার সঙ্গে মিলেমিশে একটি আন্তরিক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে যেভাবে আমাদের বসবাস করার প্রয়োজন ছিল সেটি হচ্ছে না। আর পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি বা সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে, আমরা এখন একটি কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি এবং আমরা জানি না যে, কবে আমরা এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাব। যার কারণে আমাদের মধ্যে হতাশা বা উদ্বিগ্নতা কাজ করে এবং এ হতাশা বা উদ্বিগ্নতা থেকে সৃষ্ট রাগের কারণেই কিন্তু পারিবারিক সহিংসতা তৈরি হয়।’

করোনার মধ্যে বেড়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারও
করোনার ফলে স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে ঘরে অবস্থান করায় পারিবারিক কলহ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে আদালত বন্ধ থাকায় এবং পুলিশ প্রশাসন করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত থাকায় এ ধরনের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনার কারণে গৃহস্থালি কর্মীরা ছুটিতে থাকায় বা কাজে না আসায় নারীদের ওপর আগের চেয়ে গৃহস্থালি কাজের চাপ বেড়ে গেছে এবং এর ফলে গৃহস্থালি কাজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়াও বেড়েছে। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল এবং ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার যৌথ গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বিবাহ বিচ্ছেদের ২৫ শতাংশই হয় গৃহকর্ম নিয়ে ঝগড়ার কারণে। করোনার মধ্যে গৃহস্থালি কাজের চাপ অনেক বেড়েছে এবং একে কেন্দ্র করে দম্পতিদের মধ্যে সৃষ্ট ঝগড়া বা সহিংসতা অনেক সময় ভয়াবহ আকার ধারণ করে বিচ্ছেদ পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনার বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বেসরকারি একটি এনজিওর কর্মকর্তা সাইফুল হাসান লকডাউনের ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ঘরে অবস্থান করায় প্রায়ই তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি হতো। গৃহকর্মীকে ছুটি দেয়ায় ঘরের সব কাজসহ দুই বাচ্চাকে সামাল দিতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন সাইফুলের স্ত্রী সামিরা। কিছুদিন ধরে মায়ের বাড়ি চলে যাওয়ার ভয় দেখালেও মে মাসের শুরুতে সত্যি সত্যি বাচ্চাদের নিয়ে মায়ের বাড়ি চলে যান তিনি। সাইফুল এরই মধ্যে সামিরাকে বিচ্ছেদ দেবেন বলে মৌখিকভাবেও জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছিলেন, ‘করোনার কারণে বর্তমানে মোবাইলেই সেবাপ্রত্যাশীদের কাউন্সিলিং দিচ্ছি। অনেক ভুক্তভোগী আমার কাছে ফোন করে তাদের ওপর হওয়া নির্যাতনের ব্যাপারে আইনি পরামর্শ নিচ্ছেন। স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে ঘরে অবস্থান করায় তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেড়েছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছিলেন, ‘করোনা সংক্রমণের সময়ে হওয়া পারিবারিক সহিংসতাকে সাধারণ সহিংসতার মতো মনে করা যাবে না। কোনো পরিবারে সহিংসতার ঘটনা ঘটলে সেক্ষেত্রে পরিবারের সমঝদার ব্যক্তিকে ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু এ পরিস্থিতি যদি দীর্ঘদিন চলে তাহলে বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল থেকে এ ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে মানুষকে উপদেশ দেয়া সহজ হবে।’ [১০] খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি জাতীয় জরুরি হেল্পলাইন ও বিভিন্ন এনজিওতে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ জানিয়ে ভুক্তভোগীদের কলের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। ভুক্তভোগী অনেক নারী ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য আত্মীয়স্বজনসহ পরিচিতদের সহযোগিতা চাইছেন। ভালো নেই শিশুরাও। স্কুল বন্ধ এবং করোনা সংক্রমণের ভয়ে ঘরবন্দি থাকায় দেশের কোটি কোটি শিশু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। ঘরের ভেতর তারা টিভি দেখে ও ভিডিও গেম খেলেই সময় পার করছে। একটানা দীর্ঘদিন ঘরে থেকে অনেক শিশু মা-বাবার কাছে ছাদে যাওয়ার আবদার করছে। যারা পারছে না তারা উদাস মনে ঘরের বারান্দাতেই দাঁড়িয়ে থাকছে। শিশুদের এ মানসিক অস্থিরতায় উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও। অন্যদিকে বিনোদন ছাড়া ঘরবন্দি অবস্থায় মা-বাবার সহিংসতা দেখে শিশুদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। শিশুরা মানসিক বিকারগ্রস্তভাবে বড় হচ্ছে। শিশুদের মনোবল সঠিক পথে রাখা ও মানসিক চাপমুক্ত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একটি গাইডলাইন দিয়েছে। এর আলোকে স্বাস্থ্য অধিদফতর যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। অভিভাবকসহ সবার উদ্দেশ্যে গাইডলাইনে বলা হয়েছে, শিশুকে মানসিক চাপমুক্ত রাখতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। তাদের কথা মন দিয়ে শুনুন। ভালোবাসা দিন ও তাদের প্রতি মনোযোগী হোন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শিশুরা বড়দের ভালোবাসা একটু বেশি চায়। তাদের আশ্বস্ত করুন এবং সদয় হয়ে কথা বলুন। সুযোগ থাকলে শিশুকে খেলতে দিন। এ বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে শিশু-কিশোরদের ওপর মানসিক চাপটা বেশি পড়ছে। কারণ বাবা-মায়ের মানসিক চাপ তাদের ভেতরে সংক্রমিত হচ্ছে। ঘরবন্দি শিশুদের মানসিক চাপমুক্ত রাখতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন খুবই কার্যকর। শিশুকে স্বাভাবিক সময়ের রুটিন যথাসম্ভব মানানোর চেষ্টা করতে হবে। স্কুলের সময়েই পড়ালেখা করান, বাকি সময়ে ইনডোরে খেলাধুলা ও শারীরিক ব্যায়াম করান। পুষ্টিকর খাবারের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। আতঙ্কিত না করে তাদের সাহস দিন।’ [১১]

বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কের হার অনেক বেড়েছে
করোনার সময়ে দাম্পত্য কলহ প্রভাব ফেলছে দম্পতিদের স্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্কের ওপরও। গবেষণা বলছে, দাম্পত্য জীবনে শারীরিক সম্পর্কের ঘাটতি হলে (যে কারণেই হোক) অনেকেই মনে করেন যে, তার সঙ্গী বুঝি তার সঙ্গে প্রতারণা করছেন; হয়তো অন্য কোনো সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এর থেকে শুরু হয় অবিশ্বাসের এবং একই সঙ্গে জন্ম নেয় রাগ ও বিতৃষ্ণা। যার পরিস্ফুটন ঘটে দাম্পত্য কলহে এবং সবশেষে ডিভোর্স। করোনার কারণে যেসব দম্পতি এক হতে পারছেন না তাদের জন্য অপর একটি আশঙ্কা হচ্ছে, এক্সট্রাম্যারিটাল অ্যাফেয়ার বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। করোনার কারণে দীর্ঘসময় ধরে পার্টনারকে কাছে না পাওয়ার ফলে সাইকোলজিক্যাল ও ফিজিক্যাল চাহিদার প্রয়োজনে স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দম্পতি শারীরিক সম্পর্কে কম লিপ্ত হন তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ বেশি হয়। তার প্রধান কারণ হিসেবে লস অ্যাঞ্জেলেস বেইজড থেরাপিস্ট ভেনেসা মারিন বলেছিলেন, ‘শারীরিক সম্পর্ক বলতে শুধুমাত্র আপনার সঙ্গী যে আপনার কাছে একটু সুখানুভূতি চাইছে তা নয়। বরং এটা প্রমাণ করে যে আপনি হাজারও বিষয়ের মধ্যে আপনার সঙ্গীকে কতটুকু প্রাধান্য দিচ্ছেন। সঙ্গীর কাছ থেকে প্রাধান্য পাওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ [১২]

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও মনোবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল যুগান্তরকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি, হতাশা বা দূরত্ব বাড়ার অন্যতম একটি কারণ হলো শারীরিক চাহিদা অপূর্ণ থাকা। আমাদের দেশের অধিকাংশ ছেলে জানে না একটা মেয়েকে কীভাবে শারীরিকভাবে সুখী করতে হয়। এভাবে দিনের পর দিন মেয়েরা বঞ্চিত হতে হতে একটা সময় তাদের মধ্যে একধরনের উদাসীনতা বা হতাশার সৃষ্টি হয়। এ রকম ঘটনা যে শুধু ছেলেদের ক্ষেত্রেই ঘটে সেটি নয়। অনেক মেয়েও তার সঙ্গীর শারীরিক চাহিদা পূরণে সচেতন কিংবা আগ্রহী নন। এ শারীরিক অপূর্ণতাই পরপুরুষ বা পরনারীতে আগ্রহের সৃষ্টি করে। কাজেই শারীরিক চাহিদা পূরণের ব্যাপারে উভয়কে সচেতন হতে হবে।’ [১৩]

[১০. জিন্নাতুন নূর, ‘বাড়ছে সামাজিক সংকট’, ৮ অক্টোবর ২০২০, বাংলাদেশ প্রতিদিন; ১১. রশিদ আল রুহানী, ‘করোনা সংকটে শিশুকে চাঙ্গা রাখুন’, ৩১ মার্চ ২০২০, দেশ রূপান্তর; ১২. রতন কে সমাদ্দার, ‘দাম্পত্য কলহ: সমস্যা ও সমাধান’, ২৩ মার্চ ২০১৯, এলোমেলো ভাবনা, SANNYASI RATAN’S BLOG; ১৩. যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ, ‘নৈতিকতার অবক্ষয়ে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা’, ৯ জুলাই ২০১৯, যুগান্তর]

শারীরিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এটি করোনার মতো আতঙ্ক ও ত্রাসের সময়ে অনেকাংশে ভয় তাড়াতে সাহায্য করে। করোনার সময় দীর্ঘ ছুটিতে বাসায় থেকে শারীরিক সম্পর্ককে আরও চাঙ্গা করার সুযোগ পেয়েছেন অনেক দম্পতি। অন্য কিছু করার বেশি সুযোগ না থাকায় সময় কাটাতে এটিই তাদের কাছে হয়ে উঠছে সেরা কার্যকলাপ। তবে এর নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট হিসেবে দেশে শিশুর জন্মহার অনেকাংশে বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকরা। আবার করোনার সময়ে বিপরীত্য হচ্ছে, এ সময়ে পার্টনারদের মধ্যে যেকোনো একজনের কিংবা দুজনেরই শারীরিক সম্পর্কের প্রতি আকর্ষণ কমে যেতে পারে। এর কারণ হিসেবে দাম্পত্য কলহ ছাড়াও আরেকটি প্রধান বিষয় কাজ করে এবং সেটি হচ্ছে ভয় বা টেনশন। করোনা পরিস্থিতিতে আর্থিকভাবে অনেক পরিবার ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার অনেক পরিবারে স্বামী বা স্ত্রী যেকোনো একজন বা দুজনই হয়তো করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের আর্থিক নিশ্চয়তার টেনশন এবং করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়— উভয় কারণেই দম্পতিদের শারীরিক সম্পর্কে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া শারীরিক সম্পর্কের সফলতার পেছনে পরিবেশ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। গবেষকদের মতে, মানুষের শারীরিক সম্পর্কের অভিমুখিতার ক্রমবিকাশে পরিবেশগত প্রভাবের একটি সম্ভাবনা আছে। করোনার সময়ে পারিবারিক জনসমাগমের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক কতটা উপভোগ করা যায় বা দম্পতিরা আদৌ কতটুকু সিকিউর অনুভব করেন সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে যৌথ পরিবারগুলোতে দম্পতিদের শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের হার একক পরিবারের তুলনায় কতটুকু তারতম্যপূর্ণ সেটিও খুঁজে বের করা দরকার।

তরুণ-তরুণীদের প্রেম
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তরুণ-তরুণীদের প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। কারণ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হওয়ায় বিবাহ-পূর্ব শারীরিক সম্পর্ক বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু তাই বলে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এ বিষয়ে আগ্রহ কম নয়। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তরুণ-তরুণীরা শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারে জ্ঞান লাভ করে থাকে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ভুল ধারণা পায়। এর একটি প্রধান কারণ হলো, আমাদের দেশে এ বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনার পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে শারীরিক সম্পর্ক এখনও একটি গোপন বিষয় বা ট্যাবু। শহরাঞ্চলে ইন্টারনেট বা আনুষঙ্গিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকায় তরুণ-তরুণীরা এসব বিষয়ে জানার সুযোগ পেলেও বিষয়গুলো নিয়ে ওপেন ডিসকাশন হয় না কখনওই। যার কারণে তৈরি হয় ‘সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিপ্রোডাকটিভ হেলথ কমপ্লেক্সিটি’ বা ‘যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য জটিলতা’। একটি নির্দিষ্ট বয়সে উপনীত হওয়ার পর মানুষের শরীরে হরমোনগত বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে শারীরিক কাঠামোর পরিবর্তনসহ বিপরীত লিঙ্গের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয়। এ সময়কে আমরা বয়ঃসন্ধি বলে জানি, যেটি মানুষের জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এ বয়সে একজন কিশোর বা কিশোরী তাদের নিজেদের শরীর সম্পর্কে এবং একই সঙ্গে তার বিপরীত লিঙ্গের প্রতি জানার আগ্রহ বোধ করে। যার কারণে বিভিন্ন মাধ্যমে তারা তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করে। ঠিক এ সময়টাতেই যদি তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেয়ার ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তাদের বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। নয়তো বিভিন্ন ভুল ও অসত্য তথ্য তাদের প্রজনন স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। বয়ঃসন্ধিকালের কাউন্সিলিং তরুণ-তরুণীদের স্বাধীনতাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সাহায্য করে। নিজেদের আবেগগুলো নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভবিষ্যতের জটিল থেকে জটিলতর সমস্যার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস জোগায়।

করোনার এ ঘরবন্দি সময়টাতে তরুণ-তরুণীরা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না ঠিকই কিন্তু তাদের প্রেম চলছে অনলাইনে। ঘর থেকে বের হতে না পারলেও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে তারা যোগাযোগ বজায় রাখছেন। যারা আগে পার্কে, রেস্টুরেন্টে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোণায় বসে নিজেদের প্রেমটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন তারা এখন অনলাইনে হোয়াটস অ্যাপ, মেসেঞ্জার, স্কাইপেতে প্রেমটা সারছেন। অডিও ও ভিডিও, দুই মাধ্যমেই যোগাযোগ বজায় রাখছেন তারা। তবে সম্পর্কের মাঝে স্পর্শের যে অনুভূতি সেটা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে তাদেরকে। যার কারণে তরুণ প্রেমিক-প্রেমিকা দূরত্ব ঘোচাতে অনলাইনেই শেয়ার করছেন নিজেদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি কিংবা ভিডিও। কিন্তু বিষয়টি তাদের জন্য ঝুঁকি বয়ে আনছে। তরুণকালে ভালোবাসার সম্পর্কটা আবেগের বশবর্তী হয়ে তৈরি হয়, সেই অতি-আবেগেই যখন সম্পর্কটা শেষ হয়ে যায় তখন এসব ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও হয়ে ওঠে প্রতিশোধ নেয়ার মাধ্যম। এমন অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে ঘটছে। পূর্বেও বিভিন্ন সেলিব্রেটিসহ অসংখ্য তরুণ-তরুণীর ব্যক্তিগত মুহূর্ত প্রকাশ পেয়ে তাদের সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। আবার করোনার মধ্যেও তরুণ-তরুণীদের শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে দেখা গেছে। করোনার মধ্যেও সিলেটের এক হোটেল থেকে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে সাত তরুণ-তরুণীকে আটক করা হয়। আবার জয়পুরহাটে আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় এক তরুণ ও এক তরুণীর মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় এবং সেই প্রেম থেকে পরে বিয়ের ঘটনাও ঘটে। করোনার কারণে অনেকের ভালোবাসার সম্পর্কে ফাটলও তৈরি হয়। দীর্ঘদিন সরাসরি যোগাযোগ বঞ্চিত থাকায় অনেক তরুণ-তরুণী ভিন্ন সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে তাদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে এবং পরবর্তীতে তারা প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। উন্নত বিশ্বে করোনার সময়টাতে ঘরবন্দি অবস্থার অবসাদ থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে বিভিন্ন ডেটিং সাইটগুলো অনেক রকম সুযোগ দিচ্ছে। এসব সাইটের ট্রাফিক এখন অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। অসংখ্য পর্নো সাইট তাদের প্রিমিয়াম মেম্বারশিপ ফ্রি করে দেয়ায় এসব অশ্লীল সাইটে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই তরুণ। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে করোনার লকডাউনের সময়টাতে পর্নো সাইটগুলোর ট্রাফিক ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে গত বছর ২২ হাজার পর্নো সাইট বন্ধের ঘোষণা দেয়া হলেও তরুণদের এসব সাইটে প্রবেশ করতে সমস্যা হচ্ছে না। তারা ভিপিএন বা প্রক্সি সার্ভার ব্যবহারের মাধ্যমে পর্নো সাইটগুলোতে ভিজিট করছেন। এখন শত শত প্রক্সি সার্ভার আছে। প্রক্সি সার্ভারগুলো অতি সহজেই প্লে-স্টোর, গুগল-স্টোর বা ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা যাচ্ছে। যেগুলো দিয়ে সহজে নিষিদ্ধ ওয়েব সাইটগুলোতে প্রবেশ করা যায়, যার নিয়ন্ত্রণ থাকে না তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের কাছে। ফলে সহজে পর্নো সাইট ব্যবহার করতে পারছেন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। এ ব্যাপারে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার মানবজমিনকে বলেছিলেন, ‘প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে যতটুকু সম্ভব দেশে পর্নো ওয়েবসাইট বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। আশা করি এর বাইরে যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার আমরা সেটা বাস্তবায়নে সক্ষম হব। সেজন্য কিছুটা সময় লাগবে।’ [১৪]

কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য
২০১৮-তে গেইজ (জিএজিই) প্রকল্পের অধীনে ঢাকার তিনটি বস্তিতে ১০০ এরও বেশি বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোর-কিশোরী এবং তাদের পরিবার ও পারিপার্শ্বিক সমাজকে নিয়ে চালানো গবেষণায় উঠে আসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও চমকপ্রদ তথ্য। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্কুল পাঠ্যক্রমে প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে ঠিকভাবে শেখানো হয় না। এই কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধির ব্যাপারে যথেষ্ট ধারণাও নেই। শতকরা ১৭ ভাগ কিশোর ও ২৭ ভাগ কিশোরী ঠিকমতো কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির নাম বলতে পেরেছে। স্কুলের বইতে শুধু একটি অধ্যায়েই কৈশোরকালীন শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা রয়েছে, তাও কেবল মাসিক ও বয়ঃসন্ধি নিয়ে আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ। মজার বিষয় হচ্ছে, শিক্ষকরা যখন ক্লাসে ‘মাসিক’ নিয়ে পড়ানো শুরু করেন, তখন ছেলেদের ক্লাস থেকে বের করে দেয়া হয়। ফলে তারা এ সম্পর্কিত জ্ঞান থেকে দূরেই থেকে যায়! এমনকি ছেলেদের ক্ষেত্রে শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে বাবা কিংবা মায়ের সঙ্গে আলোচনা করার বিষয়টিও ঘটে না, লজ্জা ও সংকোচের কারণে। ছেলেদের ক্ষেত্রে তাদের মনোদৈহিক পরিবর্তন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বা জানার বিষয়টা সীমাবদ্ধ মূলত বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ কিংবা স্কুলের শারীরিক শিক্ষা বইয়ের সেই একটি অধ্যায়ে সীমিত জ্ঞান। মায়েরা তাদের কন্যাসন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি আলাপ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও ছেলেসন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করতে মোটেই স্বাচ্ছন্দ নন। একই কথা প্রযোজ্য কিশোরীদের ক্ষেত্রেও। তাদের অনেকেই বড়জোর মায়েদের সঙ্গে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক আলাপ করে থাকে। কেবল বাবা-মা নন, স্কুলের শিক্ষকরাও তাদের প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষাদানের ব্যাপারে সংকোচবোধ করেন।

গেইজ-এর গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপ চালানো ৩৯ শতাংশ কিশোরীর স্কুলে ঋতুকালীন যে সুবিধাগুলো পাওয়া যায়, সেই হার প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মেয়েদের প্রজননবিষয়ক স্বাস্থ্যসেবার জন্য এলাকার ঔষধের দোকান বা ফার্মেসির ডাক্তারই প্রধান ভরসা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অধিকাংশই জানায় যে তাদের এলাকায় ধারেকাছে এমনকি পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বের ভেতর কোনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতাল বা ক্লিনিক নেই। কেউ কেউ দূরের সরকারি হাসপাতালে যায় তুলনামূলক কম খরচে ভালো স্বাস্থ্যসেবার জন্য। কেউবা রঙধনু সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিকে কিংবা মেরি স্টোপস ক্লিনিকে অথবা এনজিও-পরিচালিত ক্লিনিকে যায়। অর্থাৎ কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহের প্রতুলতা দূরে থাক, সার্বিক প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার ধারণাই নেই। নেই সচেতনতা সৃষ্টির পর্যাপ্ত প্রয়াস, কিংবা স্কুল ও স্কুলের শিক্ষকদের সে সম্পর্কিত যথাযথ উদ্যোগ। মাসিক বা ঋতুস্রাব ও প্রজনন স্বাস্থ্য যেন এক ধরনের ট্যাবু। [১৫]

বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে এ বিষয়ে ৩২টি কার্যক্রম চালু রয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালের প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্কুল কার্যক্রমে সঠিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সাহায্যে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান অত্যন্ত সহায়ক এবং নির্ভরযোগ্য হতে পারে। বয়ঃসন্ধিকালের শারীরিক পরিবর্তন, ঋতুস্রাব সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা থাকলে এ সময়ের শারীরিক পরিবর্তনগুলো কিশোর বা কিশোরীদের পক্ষে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়াটা অনেক বেশি সহজ হতে পারে। বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনবিষয়ক সচেতনতা নিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। মৌলিক এ সচেতনতার অভাবে তারা অনেক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। যেমন- অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, সংক্রমণ ব্যাধি (এসটিডি), শারীরিক সহিংসতার ঝুঁকি, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবাহ, মতামত প্রকাশে ব্যর্থতা ইত্যাদি। কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যের চাহিদা পূরণের ওপর লক্ষ্য রেখে সরকার স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি অর্জনের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে এবং এসআরএইচের ২০১৬-২০-এর পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। তারপরও প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এখনও বেশ কয়েকটি উদ্বেগের বিষয় রয়ে গেছে। প্রথমত, সরকারের পঞ্চবার্ষিক (২০১৬-২০) পরিকল্পনায় কিশোর বয়সী ছেলেদের এবং অবিবাহিত কিশোরীদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবার নির্দেশিকা নেই। দ্বিতীয়ত, সরকার প্রণীত কিশোর-কিশোরীদের যে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র (এএফএইচসি) চালু হয়েছে তার কর্মসময় সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত। যারা শিক্ষার্থী, তাদের পক্ষে এ সময় মোটেও সুবিধাজনক নয় কারণ এ সময়ে শিক্ষার্থীরা সাধারণত স্কুল বা কলেজে অধ্যয়নরত থাকে। আর করোনার সময় এসব এএফএইচসির সেবা প্রদান অনেক জায়গাতেই বন্ধ আছে। তৃতীয়ত, জাতীয় কিশোর-কিশোরী স্বাস্থ্য নীতিমালা ২০১৭-৩০ (এনএসএএইচ)-এ তৃতীয় লিঙ্গ, সমকামী, উভকামী এবং ট্রান্সজেন্ডার (এলজিবিটি) কিশোর-কিশোরীদের কথা উল্লেখ নেই। তদুপরি এ প্রস্তাবে শারীরিক বা মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জ বিভাগে এই সংখ্যালঘু (এলজিবিটি) কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্তির কোনো নীতিমালা সংযোজিত হয়নি। চতুর্থত, এই সরকারি নীতিমালায় অতি অল্প বয়সী কিশোর-কিশোরীদের (১০ থেকে ১৪ বছর) বয়সের উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তাবের অভাব রয়েছে। উল্লেখ্য যে, এই দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালাতে প্রারম্ভিক কিশোরকালীন জটিলতা মোকাবিলা ও যুগোপযোগী কর্মসূচির অন্তর্ভুক্তি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। কারণ সাধারণত এ সময়েই তাদের মধ্যে যৌন আচরণ, যৌন জীবন এবং সেই সংশ্লিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির গঠন শুরু হয়। পঞ্চমত, অন্যান্য উদ্বেগের মধ্যে, সরকারি স্বাস্থ্য নীতিমালাতে বিশেষত কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী সংক্রমণ ব্যাধি প্রতিরোধের ব্যবস্থা এবং এইচআইভি প্রতিরোধ ও নির্ণয়ের ওপর সুনির্দিষ্ট মনোযোগের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী। সংখ্যায় প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ। একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৫০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়সে। ১৮ শতাংশ মেয়ের ক্ষেত্রে ১৫ বছর বয়সে পরিবার থেকে বিয়ে দেয়া হয়। একজন কিশোরী মেয়ের প্রজননক্ষমতা একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর তুলনায় ১১৩গুণ বেশি থাকে। ফলে অসময়ে গর্ভধারণ ও মাতৃমৃত্যু হারের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। [১৬]

[১৪. মোহাম্মদ ওমর ফারুক, ‘প্রক্সি সার্ভারে চলছে পর্নো সাইট’, ১২ জুলাই ২০১৯, মানবজমিন; ১৫. ‘কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য: না বলা কথা’, ৬ জুন ২০২০, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গর্ভনেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট; ১৬. তামান্না আফরোজ, ‘কিশোর স্বাস্থ্য: বয়ঃসন্ধি নিয়ে ওদের জানতে দিন’, ২৯ অক্টোবর ২০১৯, প্রথম আলো]

শারীরিক সম্পর্কের আগে আসে প্রেমের অধ্যায়। কারণ প্রেম থেকেই শারীরিক সম্পর্কের সৃষ্টি, সেটা যে বয়সেই হোক না কেন। কিন্তু সেই প্রেমটা যখন কিশোর বয়সের প্রেম তখন সেই কিশোর প্রেম আসলে কী, সেটা বুঝতে একটা নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শবনম আযিম। তিনি বলেন, ‘কিশোর বয়সের প্রেম প্রকৃত অর্থে প্রেমই নয়। কারণ প্রেমের সংজ্ঞায়নে যেসব সম্পৃক্ততা বা সম্পর্কের গাঢ়ত্ব থাকা প্রয়োজন বলে মনে করা হয়, তার অধিকাংশই কিশোর প্রেমে অনুপস্থিত। প্রেমের প্রধানতম শর্ত: থ্রি-সি, অর্থাৎ ক্যারিং (যত্নশীল), কমিটমেন্ট (প্রতিশ্রুতি) এবং কমপ্লেটনেস (সম্পূর্ণতা)- এর যথাযথ উপস্থিত না থাকার কারণে অথবা এগুলোর আবশ্যিকতা বোঝার মতো পরিপক্কতা না আসার জন্যই কিশোর প্রেম যথার্থ প্রেম হয়ে উঠতে পারে না। এ কেবল বয়ঃসন্ধিকালের স্বাভাবিক নিয়মে অপর লিঙ্গের প্রতি কৌতূহল কিংবা আকর্ষণের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে।’ [১৭]

কিশোরকালীন প্রেম অনেক ক্ষেত্রে ভয়াবহ হতে পারে মানুষের জীবনে। কারণ এ বয়সটাতে আবেক নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সাপোর্ট দেয়ার বা তাদের যথাযথভাবে কাউন্সিলিং করার সুযোগ একেবারেই নেই বলা যায়। কারণ অধিকাংশ পরিবারে মা-বাবা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত জীবন গঠনের প্রতি যত বেশি গুরুত্ব দেন, তাদের বর্তমান চাহিদা বা মানসিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়া বা তাদের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজন তেমন মনে করেন না। ফলে মানসিক অস্থিরতায় ভুগে অনেক কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এমন বাস্তব অনেক উদাহরণ আছে। বাবা-মার সঙ্গে অভিমান করে মানসিক অস্থিরতায় ভুগে অনেক কিশোর-কিশোরীর আত্মহত্যার খবর আমরা প্রায়ই গণমাধ্যমে দেখতে পাই। করোনার সময়টাতে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য যথেষ্ট হুমকির সম্মুখীন। কারণ তারা দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি অবস্থায় থাকায় এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের জীবন-যাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। বন্ধুবিহীন, খেলাধুলা-আনন্দবিহীন জীবনে তাদের মানিয়ে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে। যেখানে কিশোর-কিশোরীরা ঘরের মধ্যে বন্দি জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে তখন তাদের মানসিক, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের কথা খুব কমই সামনে আসছে। অধিকাংশ কিশোর-কিশোরী করোনার এই সময়কালে ডিপ্রেশনে ভুগছে। যারা সম্ভব হচ্ছে ইন্টারনেটে বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, গেমিং করে বা মুভি দেখে সময় কাটাচ্ছে। তবে ডিপ্রেশনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ হচ্ছে মানসিকভাবে সহিংস হয়ে ওঠা। নিয়মিত এক্সারসাইজ হচ্ছে না, খেলাধুলা হচ্ছে না, পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ততা নেই, যার কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে কিশোর-কিশোরীরা সহিংস হয়ে উঠছে এবং পরিবারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়ছে। মানসিক অস্থিরতা দূর করতে বিভিন্ন মাধ্যমে তারা আনন্দ লাভের চেষ্টা করছে। যার মধ্যে মাদকের ব্যবহার, পর্নো-আসক্তি, ইন্টারনেটে বিভিন্ন অশ্লীল ডেটিং সাইটগুলোতে ভিজিট করার মাধ্যমে তারা মানসিক প্রশান্তি লাভের চেষ্টা করছে। এসবের মাধ্যমে তাদের কৈশোর প্রজনন স্বাস্থ্যের যথাযথ বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।

প্রেমহীন শারীরিক সম্পর্ক
সকল শারীরিক সম্পর্কই প্রেম থেকে সৃষ্টি, তা নয়। ভালোবাসা বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক আমাদের সমাজে বিদ্যমান রয়েছে। মানুষ তার জৈবিক চাহিদা মেটাতে সব সময় প্রেমনির্ভর নয়, কারণ প্রেম ছাড়াও অর্থের বিনিময়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব। বিশ্বের এমন কিছু দেশ রয়েছে যেগুলোতে অর্থের বিনিময়ে শারীরিক সম্পর্ক একটি প্রধান ব্যবসা। বাংলাদেশেও অর্থের বিনিময়ে জৈবিক চাহিদা মেটাচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। শুধু যৌনপল্লী নয় বরং বিভিন্ন উচ্চমানের হোটেল বা অনেক উচ্চপদস্থ মানুষ তাদের ব্যক্তিগত সময় কাটানোর জন্য গড়ে তুলেছেন আলাদা আবাসস্থল, যেখানে অবাধে অর্থের বিনিময়ে চলছে অবাধ শারীরিক সম্পর্ক। যারা যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করছেন তাদের সবাই যে নিম্ন শ্রেণির তা নয়, বরং যৌনকর্মীদের মধ্যেও রয়েছে শ্রেণিবিভাগ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, করোনাকালীন অর্থের বিনিময়ে প্রেমহীন যৌনতার কী অবস্থা? বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে রাজবাড়ী জেলার দৌলতদিয়ায় যৌনপল্লীকে ২০ দিনের জন্য লকডাউন করা হয় গত ২০ মার্চ। এ পল্লীতে ১৬০০ জনের মতো কর্মী রয়েছেন যারা এ পেশার সঙ্গে জড়িত। তাদের ছেলে-মেয়ে এবং পল্লীতে ঘরের মালিক ও দালালসহ আরও ৪০০ জনের মতো মানুষ আছেন। ঘিঞ্জি পরিবেশ, অল্প জায়গায় বেশি মানুষের উপস্থিতি, বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের আগমন, শারীরিক সম্পর্কে সুরক্ষা পদ্ধতি ব্যবহারের অনিচ্ছা, সেই সঙ্গে পল্লীর বাসিন্দাদের অসচেতনতায় প্রাণঘাতী এ ভাইরাস ভয়াবহ রূপ নেয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। যার কারণে এটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। লকডাউনে যেহেতু আয়-উপার্জন বন্ধ থাকবে, সে কারণে ২০ দিন চলার জন্য এ পেশার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক কর্মীকে ২০ কেজি করে চাল এবং তার সঙ্গে পরিমাণ মতো ডাল দেয়ার কথা বলা হয়। ওই এলাকার সব ঘরমালিক বা বাড়িওয়ালাকে এসব কর্মীর কাছ থেকে ২০ দিনের ভাড়া না নিতে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু এতটুকু সহায়তা দিয়ে এ পেশার সঙ্গে জড়িতদের বেঁচে থাকা কতটুকু সহজ হবে, সেটা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। সবচেয়ে করুণ অবস্থা হলো, ভাসমান যেসব কর্মী এ পেশায় নিয়োজিত, তারা এখানে-সেখানে ছোটখাটো খুপরি ভাড়া করে থাকেন। করোনার সময় তারা রাস্তায় বের হতে পারেননি। যারা বের হয়েছেন তারাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কোনো আয় না থাকায় না খেয়ে জীবন-যাপন করতে হয়েছে তাদের অনেককে। [১৮] তবে মূল আলোচনার যে বিষয়টি সেটি হলো, যেসব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাভাবিক সময়ে অর্থের বিনিময়ে তাদের জৈবিক চাহিদা মেটাতেন তাদের বর্তমান অবস্থা কী? লকডাউনে তারা অর্থের বিনিময়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেননি। তাহলে তারা কীভাবে তাদের জৈবিক চাহিদা পূরণ করছেন? করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশে ধর্ষণের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। শিশু বা নারী উভয়েই ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। দেশে যৌনপল্লীগুলো বন্ধ থাকার সঙ্গে ধর্ষণ বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক আছে কি-না, সেটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

[১৭. শবনম আযীম, ‘কৈশোরের প্রেম: প্রেম নাকি…?’, ১১ জানুয়ারি ২০১৬, জাগো নিউজ২৪.কম; ১৮. কাদির কল্লোল, ‘করোনাভাইরাস: বাংলাদেশের দৌলতদিয়ার যৌনপল্লী ২০দিনের জন্য লকডাউন’, ২০ মার্চ ২০২০, বিবিসি বাংলা, ঢাকা]

সামাজিক সহিংসতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশেই করোনারোগীদের বা তাদের পরিবারের সদস্যদের এলাকা থেকে বিতাড়িত করা হচ্ছে, বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে, সামাজিকভাবে বয়কট করা হচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার, করোনা সন্দেহে কোনো রোগী হাসপাতালে গেলে তাকে সঠিক চিকিৎসাসেবাও দেয়া হচ্ছে না, মৃত্যুর পর মৃতদেহ যথাযথ সম্মানে দাফন করারও মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। করোনা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে এ ধরনের সামাজিক সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনা আক্রান্ত রোগীদেরও সামাজিক বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। ফলে করোনারোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের মানসিক চাপের শিকার হতে হচ্ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও মনোবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘করোনার কারণে মেন্টাল এপিডেমিক বিশ্বব্যাপী শুরু হয়েছে। কিন্তু করোনায় মৃত্যুহার এখন এত বেশি যে বিষয়টি ‘আন্ডারমাইন’ হচ্ছে। যখন মৃত্যুহার কমে যাবে তখন মানসিক দুরবস্থার বিষয়টিও দৃশ্যমান হবে। করোনায় যখন একটি পরিবার সংক্রমিত হয় তখন তাদের প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা দেখতে আসেন না। তাদের দুঃসহ অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ফোনে হয়তো পরিচিতরা খবর নেন। কিন্তু যাদের ঘরে করোনারোগী আছে তারা যে কি মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন এটি বলে বোঝানো যাবে না। একটি বাসায় কেউ মারা গেলে তার লাশ দাফন করার জন্যও কেউ যাচ্ছে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অন্তত আমরা অনলাইনে বা ফোনে একে-অন্যের খবর নিতে পারি। এটি করা হলে যারা মানসিক ট্রমার শিকার তারা সুস্থ থাকতে পারবেন। বুঝতে হবে যে, মানুষ যতই অসতর্ক হবে ততই চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে এবং এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে আমাদের নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তখন সেই ব্যক্তির পরিবারও সুরক্ষিত থাকবে। এই মুহূর্তে এটিই হবে সবার মূল দায়িত্ব। এজন্য স্বাস্থ্যবিধিগুলো যথাযথভাবে মানতে হবে।’

করোনার মধ্যে বাড়ছে সামাজিক অপরাধ প্রবণতাও। অপরাধের কৌশলেও এসেছে ভিন্নতা। বিশেষ করে সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদপত্রে খবর এসেছে যে, পকেটমার, ছিনতাইকারী ও মলমপার্টির সদস্যরা এখন মাস্ক-বিক্রেতা সেজে সর্বস্ব হাতিয়ে নিচ্ছে অথবা বসতবাড়িতে ঢুকে স্বর্ণালঙ্কার-মোবাইল, টিভিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে। চুরি-ডাকাতির সংখ্যা বাড়ছে। মানুষের আয় নেই, তাই যেকোনো উপায়ে তারা অন্নের ব্যবস্থা করতে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। যদি করোনা আরও ব্যাপকভাবে ছড়ায় তাহলে ধারণা করা হচ্ছে যে, অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়বে। করোনা-পরবর্তী সময় বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম মন্দা অবস্থা চলতে পারে এবং তার প্রভাবে হাজার হাজার মানুষকে তাদের পেশা থেকে ছাঁটাই করা হতে পারে। কর্মহীনতার হতাশা থেকে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশে করোনার লকডাউনের মধ্যেও নারী ও শিশুরা পারিবারিকভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এমনকি মোবাইল ফোনে অভিযোগ জানাতে গিয়েও স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন স্ত্রী। এদিকে বাল্যবিবাহও থেমে নেই। বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ তাদের এক জরিপে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার চিত্র তুলে ধরেছে। তারা বলছে, দেশের ২৭টি জেলায় এপ্রিল মাসে চার হাজার ২৪৯ জন নারী এবং ৪৫৬ টি শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বাল্যবিবাহ হয়েছে ৩৩টি। ২৪টি সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে ২৭ জেলার ৫৮ উপজেলার ৬০২টি গ্রাম ও চারটি সিটি করপোরেশনের ১৭ হাজার ২০৩ জন নারী ও শিশুর সঙ্গে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮৪৮ নারী, মানসিক নির্যাতনের শিকার দুই হাজার আটজন, যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৫ জন এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক হাজার ৩০৮ নারী। এর বাইরে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন চারজন নারী, হত্যা করা হয়েছে এক জনকে এবং যৌন হয়রানি করা হয়েছে ২০ জন নারীকে। উত্তরদাতা চার হাজার ২৪৯ শিশুর মধ্যে ৪২৪ শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। অন্যান্য সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২টি। চার শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ১৬ জনকে ধর্ষণচেষ্টা করা হয়েছে, অপহৃত হয়েছে দুজন, যৌন হয়রানির শিকার ১০ শিশু। এমনকি ত্রাণ নেয়ার সময় ১০ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। [১৯] নারী ও শিশু নির্যাতনের পেছনে স্বামীরাই প্রধানত জড়িত। কারণ করোনায় তাদের কোনো কাজ নেই, অধিকাংশের আয় নেই, খাবার নেই। তারা বাইরে যেতে পারছেন না, আড্ডা দিতে পারছেন না। এ কারণে মানসিক অস্থিরতা বাড়ছে। এসব কিছুর জন্য তারা আবার নারীকেই দায়ী করছেন। নারীকে দায়ী করার এই মানসিকতার পেছনে নির্যাতনের প্রচলিত মানসিকতাই কাজ করছে। এর বাইরে শ্বশুর-শাশুড়ি এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও ভূমিকা আছে। সারাবিশ্বে করোনাকালীন লকডাউনে নারী নির্যাতন ২০ ভাগ বেড়েছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। এখানে স্বাভাবিক অবস্থায়ও নারীর প্রতি সহিংসতা বেশি। করোনার সময় পুরুষরা এখন ঘরে থাকছেন। পরিবারের সব সদস্য ঘরে থাকছেন। ফলে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। এ সময়ে নারীর অভিযাগ জানানোর সুযোগ কমে গেছে। সে ঘরের বাইরে যেতে পারে না। আবার স্বামীসহ সবাই ঘরে থাকায় টেলিফোনেও অভিযোগ করতে পারেন না। তাই নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপশি সচেতনতামূলক কর্মসূচির প্রয়োজন। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে হটলাইন নম্বর ১০৯ এবং পুলিশি সহায়তার জন্য ৯৯৯-কে আরও বেশি কার্যকর করা দরকার। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারীরা যাতে আশ্রয় পেতে পারেন সেই ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন। পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতিতে নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল চলমান রাখার জন্য ‘ভার্চুয়াল কোর্ট অর্ডিন্যান্স’ দ্রুত পাস করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

[১৯. হারুন উর রশীদ স্বপন, ‘করোনাকালেও থামেনি নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা’, ৬ মে ২০২০, ডয়চে ভেলে]

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক
করোনার মধ্যে বাংলাদেশে বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কের হার অনেক বেড়েছে। এ নিয়ে যদি কোনো গবেষণা হতো তাহলে বোঝা যেত এই হারটি আসলে কত। শুধুমাত্র স্ত্রীর সঙ্গে সর্ম্পকেই সন্তুষ্ট, এমন মানুষের সংখ্যা এখন উদ্বেগজনকভাবেই কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অবৈধ এ শারীরিক সর্ম্পকের কোনো বয়সভেদও দেখা যাচ্ছে না। টিনএজ থেকে শুরু করে বৃদ্ধরা, সবাই নানা রকম শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহী। একজন পুরুষ ও নারীর মধ্যে আবেগ, ভালোবাসা, প্রেম কাজ করবে— এটাই স্বাভাবিক। এই প্রেমের অনিবার্যতায় তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হতেই পারে। কিন্তু এখন যে শারীরিক সম্পর্কগুলো হচ্ছে তার কতটুকু প্রেম? নাকি এটা শুধু টাইম পাস। অনেকেই স্বীকার করেছেন যে, একাকিত্বের জীবনে টাইম পাসের জন্য তাদের শারীরিক সম্পর্ক জরুরি। এই শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে তারা সজীব হন, সতেজ হন। তাদের তারুণ্য ধরে রাখতে পারেন। অবসাদ থেকে তারা মুক্ত হন। আবার অনেকেই বলছেন যে, শারীরিক সম্পর্কের প্রধান কারণ হলো প্রেম। প্রেম থেকেই প্রিয় মানুষকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই ঘনিষ্ঠতা, ঘনিষ্ঠতা থেকেই তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের জন্ম। তারা মনে করেন যে, বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। পুরুষ ও নারী যদি একমত হন, তাহলে সেই শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকার কথা নয়। কিন্তু এরাই কয়েকদিন পর ধর্ষিত হওয়ার অভিযোগ তোলেন। অনেকে বহুগামিতার পথেও আকৃষ্ট হচ্ছেন। এক নারী বা এক পুরুষ নয়, বহু নারী বা বহু পুরুষের সঙ্গে বিচিত্র বহুগামী সম্পর্কে আকৃষ্ট হচ্ছেন অনেকে। এটা যে, শুধু পুরুষের বেলায় প্রযোজ্য, তা না। পুরুষ ও নারী দুজনের মধ্যেই বহুগামিতা দেখা যাচ্ছে। একজন পুরুষের অনেকগুলো মেয়ে বান্ধবী। দিন-তারিখ নির্ধারণ করে তারা শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করেন। আবার অনেক মেয়েরও একাধিক বয়ফ্রেন্ড এবং একাধিক সম্পর্ক রয়েছে। করোনার ঘরবন্দি অবস্থার অবসাদ থেকে নিজেদের চাঙ্গা করতেই এসব বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে মানুষ। [২০]

বাড়ছে ধর্ষণ
ধর্ষণের একাধিক কারণ বিদ্যমান। একাকিত্ব বোধ, অক্ষমতাবোধ, রাগ, অপমানজনক অনুভূতি, হতাশা, ব্যর্থতা বা ব্যক্তিজীবনে কষ্ট, অপ্রাপ্তি— এসব থাকলে মানুষের মধ্যে ধর্ষণের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। কোনো মেয়ে প্রেমে বা বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্কে রাজি না হলে মেয়েটির ‘না’-কে সহ্য করতে না পেরে পুরুষটি তাকে ধর্ষণ করেছে, এমন ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। সাইকোপ্যাথিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী লোকেরা ধর্ষণ করে, ধারাবাহিক ধর্ষণের কারণও এটি। মাদকাসক্তি মানুষের স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ লোপ করে, এটিও ধর্ষণের আরেকটি কারণ। ক্ষমতাসীন ব্যক্তি সুযোগ পেয়ে কোনো দুর্বল মেয়ে, শিশু বা ছেলের ওপর ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটায় ধর্ষণের মাধ্যমে। করোনাকালে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির বেশ কয়েকটি কারণ বিদ্যমান। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট, এই আট মাসে দেশে অন্তত ৮৯২ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।[২১] ধর্ষণের শিকার নারী লজ্জায় ও আতঙ্কে থাকেন। তিনি পুলিশের কাছে গিয়ে সেই অভিজ্ঞতা বা ধর্ষক সম্পর্কে তথ্য জানাতে ভয় পান, কুণ্ঠা বোধ করেন। অনেকদিন লেগে যায় ধর্ষণের কথা কাউকে বলতে। করোনার সময় ধর্ষণ বৃদ্ধির মানসিক ও সামাজিক উভয় কারণ বিদ্যমান। এ সময় সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কঠোরতায় শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ ব্যাহত হয়। এ কারণে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পেতে পারে। করোনার মধ্যে মানসিক চাপ ও অস্থিরতা বৃদ্ধির ফলে ধর্ষণের ঘটনা বাড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ধর্ষকের মধ্যে একপ্রকার হীনম্মন্যতাবোধ, ক্ষমতা দেখানোর প্রবণতা, মমত্ববোধের অভাব, নারীর প্রতি অবমাননাকর মনোভাব কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের যৌন নিপীড়করা নানা রকম যৌন অসুস্থতা, পেডোফিলিয়া, স্যাডিজম ইত্যাদি সমস্যায়ও ভোগে। রাস্তায়, গণপরিবহন বা কর্মস্থলে নারীদের শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, সুযোগসন্ধানী আচরণে তাদের মানসিক বিকৃতির প্রকাশ পায়। ধর্ষণের সামাজিক যে কারণগুলো রয়েছে, সেগুলো সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের অসহায়ত্বেরই প্রকাশ। রয়েছে অপরাধীদের প্রতি উপরমহলের প্রশ্রয়। ধর্ষকদের পুলিশ গ্রেফতার করলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধ করে। আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অপরাধীদের তালিকা না থাকা এবং যথাযথ তদারকির অভাবে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম খান সময় নিউজকে বলেন, ‘একই অপরাধের পুনরাবৃত্তির পেছনে আইনি ও সামাজিক কাঠামো অনেকাংশে দায়ী। যেহেতু শাস্তি হয়নি, সেহেতু এটা তারা ঘটাচ্ছে বারবার। সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ উৎঘাটন ছাড়া অপরাধ নিমূল সম্ভব নয়।’

[২০. ‘শারীরিক সম্পর্ক: প্রেম, টাইম পাস নাকি আসক্তি?’, ১ অক্টোবর ২০২০, বাংলা ইনসাইডার; ২১. ‘বাংলাদেশে করোনাকালে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে’, ১ অক্টোবর ২০২০, ভয়েস অব আমেরিকা]

আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি
সাধারণত পারিবারিক ও মানসিক অশান্তি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব বলছে, প্রতি বছর বিশ্বে আত্মহননে প্রাণ দেন গড়ে আট লাখ মানুষ। সে হিসাবে বিশ্বব্যাপী প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন করে মানুষ আত্মহত্যা করছে। বিশ্বের যেকোনো দেশে আত্মহত্যার এ প্রবণতা অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে বেড়ে যায়। আয় কমে যাওয়া, চাকরি হারানো, অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যত নিয়ে ভীতি, এ সময় মানুষের মধ্যে একধরনের হতাশা তৈরি করে। এ হতাশা থেকেই কারও কারও মধ্যে তৈরি হয় আত্মহত্যার প্রবণতা। এছাড়া তরুণ-তরুণী বা কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রেমে ব্যর্থতা, চাহিদা পূরণ না হওয়া, পিতা-মাতার সঙ্গে অভিমান, পিতা-মাতার বিচ্ছেদ বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক প্রভৃতি কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। পুলিশের তথ্য বলছে, আমাদের দেশে প্রতিদিন আত্মহত্যা করে গড়ে ৩০ জন মানুষ। অন্যদিকে আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধে গড়ে তোলা সামাজিক আন্দোলন ‘অনিকের জন্য উদ্যোগ’ বলছে, প্রতি বছর দেশে আত্মহত্যাকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। চলমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতি বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বকেই নিয়ে গিয়েছে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে। মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে বৈশ্বিক অর্থনীতি। লকডাউন, শিল্প ও সেবা খাতের ধস এবং ব্যাপক কর্মহীনতার কারণে বিশ্বব্যাপী মন্দা এখন অবশ্যম্ভাবী। এ পরিস্থিতিতে বন্ধ হয়ে যেতে পারে অনেক প্রতিষ্ঠান। অস্তিত্ব বাঁচাতে বড় ধরনের ছাঁটাইয়ের পথেও হাঁটতে পারে কেউ কেউ। এর ধারাবাহিকতায় বেকার হয়ে পড়তে পারেন অনেকেই। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা চলাকালে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায় এবং এ তথ্য প্রমাণিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশে এক ধরনের মেন্টাল হেলথ এপিডেমিক তৈরি হবে। আর উল্লেখযোগ্য মানুষ তখন বিষণ্ণতাসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত হবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জন্মনিয়ন্ত্রণের মতো নিয়মিত সেবা থেকে এ সময় বঞ্চিত অনেকে। ফলে অধিক জন্মহারের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে

করোনাভাইরাসের কারণে অনেকেই এখন পরিবারের সদস্যদের হারাচ্ছেন। একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষের দিন কাটছে। যেসব মানুষ করোনাকালীন এ কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছেন না অর্থাৎ বর্তমানের সামাজিক চাপ থেকে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং তারা আত্মহত্যার মতো দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছেন। কিন্তু করোনা শেষে অনেকেই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, মানুষ ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসওর্ডারে’ ভুগবেন। গবেষণাতেও জানা গেছে যে, করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বিষয়ে ‘ব্রেন, বিহ্যাভিয়ার, অ্যান্ড ইমিউনিটি’ জার্নালে নতুন একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। তাতে ফুটে উঠেছে কোভিড-১৯ এর কারণে বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার মতো হতাশাজনক এক প্রবণতার কথা। আর এমন আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ, ভারত, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও ব্রিটেনের মতো দেশে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ সারাবাংলা ডটনেট-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘কেউ আত্মহত্যা করতে চাইলে তার সেই ইচ্ছাকে হালকাভাবে নেয়া উচিত নয়। কেউ আত্মহত্যার ইচ্ছা প্রকাশ করলে সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাকে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং ঘনিষ্ঠজনদের এগিয়ে আসতে হবে। স্বজনদের আন্তরিকতা ও চেষ্টাই পারে ‘মৃত্যুইচ্ছা’ প্রকাশ করা ব্যক্তিকে আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে।’

অধিক জন্মহারের সম্ভাবনা
কোভিড-১৯ এর সঙ্গে লড়ছে গোটা বিশ্ব। এমন পরিস্থিতি নারীদের জন্য অধিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। এর মধ্য দিয়েও আগে যত সহজে নারীরা স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছিলেন, বর্তমানে সেভাবে পাচ্ছেন না। কারণ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলো অনেক বেশি ব্যস্ত কোভিড-১৯ নিয়ে। ফলে সাধারণ চিকিৎসা বা নারীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। কিছুদিন আগেও আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, গাইনি ওয়ার্ডগুলোতে চিকিৎসক বসছেন না। ফলে প্রসূতি নারীরা সমস্যায় পড়েছেন। অনেকেই পরিবার পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণের মতো নিয়মিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা অধিক জন্মহারের কারণ হতে পারে। করোনার সময় জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির উপকরণসমূহ বিতরণ বন্ধ রয়েছে অনেক জায়গায়। এটিও জন্মহার বাড়াতে পারে। অনেকেই ঘরবন্দি অবস্থায় আছেন বা ঘর থেকে কাজ করছেন। বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে অনেকেই যৌনমিলনকে বেছে নিচ্ছেন, যা পরবর্তী বছরে জন্মহারে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

সাইবার অপরাধ
সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও করোনার সময় সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোবাইল ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় যে কেউই এখন ইন্টারনেট জগতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। জনগণের মধ্যে করোনাভাইরাসের আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে নিম্নমানের মাস্কসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নকল পণ্য অনলাইনে বিক্রির চেষ্টা চালাচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। প্রতারণার ফাঁদ পেতে অর্থ আদায়েও তৎপর হয়ে উঠেছে একটি মহল। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর ভিডিও ধারণ করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। ফলে এমনিতেই ধর্ষণের শিকার হয়ে বিপর্যস্ত ভিকটিম ও তার পরিবার নতুন করে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছেন। করোনার মধ্যে মানুষ ইন্টারনেটে বেশির ভাগ সময় কাটানোয় নানা রকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবির অপব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলিংসহ নানা রকম হয়রানির পরিমাণ বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিকটিম নিজেও জানছেন না তার তথ্য ও ছবি ব্যবহার করে অপরাধীরা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিকার চাওয়া তো দূরের কথা, অনেক সময় সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে তা প্রকাশ করাও মুশকিল হয়ে পড়ে। এ ধরনের ঘটনা রোধে সরকারের সাইবার ক্রাইম ইউনিট কাজ করলেও অপরাধ দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং দায়ীদের কঠোর সাজার সম্মুখীন করতে হবে। পাশাপাশি ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

লেখক : প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এমিনেন্স, বাংলাদেশ; গবেষণা সহকারী : মো. আজিজুল হক

Print Friendly, PDF & Email