ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দেশের সাড়ে তিন কোটি শিশু

প্রকাশিতঃ 11:09 am | July 31, 2020

ডেস্ক রিপোর্ট, কালের আলো:

বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ শিশুর শরীরে বিপজ্জনক মাত্রায় বিষাক্ত সীসা রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার(৩০ জুলাই) প্রকাশিত এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীসা বিষক্রিয়ায় শিশুরা ব্যাপকভাবে ও অজানা মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশন পরিচালিত এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। বৃহস্পতিবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা গেছে, সীসার কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা সাড়ে তিন কোটিরও বেশি।

‘দ্য টক্সিক ট্রুথ: চিলড্রেন্স এক্সপোজার টু লিড পলিউশন আন্ডারমিন্স এ জেনারেশন অব পোটেনশিয়াল’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি শিশুদের সীসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়া বিষয়ক হেলথ মেট্রিক্স ইভাল্যুয়েশনের করা একটি বিশ্লেষণ এবং এটি এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পারস্পেকটিভসে প্রকাশের জন্য অনুমোদিত একটি গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি তিনজন শিশুর একজন বা প্রায় ৮০ কোটি শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি। এই শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এই শিশুদের প্রায় অর্ধেকের বসবাস দক্ষিণ এশিয়ায়। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুমানিক ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটারের বেশি, যারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি তোমো হোজুমি বলেছেন, ‘সীসার বিষক্রিয়া শিশুদের জীবনভর শিক্ষাগ্রহণে অসামর্থ্য করে তোলাসহ তাদের স্বাস্থ্য ও বিকাশের ওপর মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং এর কারণে বড় হওয়ার পর তাদের আয়ের সক্ষমতাও প্রভাবিত হয়। বিপজ্জনক ধাতব বর্জ্য ও সীসার দূষণ এবং এর কারণে শিশুদের ক্ষতিজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়তা করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কাজ করবে ইউনিসেফ।’

বাংলাদেশে উন্মুক্ত বাতাসে এবং আবাসস্থলের কাছাকাছি এলাকায় ব্যবহৃত সীসা-এসিড ব্যাটারির অবৈধ পুনর্ব্যবহারকে সীসার সংস্পর্শে আসার একটি প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের জন্যই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিক্স ইভাল্যুয়েশনের তথ্য অনুসারে, সীসার বিষক্রিয়াজনিত কারণে বিশ্বে যেসব দেশে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি, সেই দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ এবং এ দেশের জনসংখ্যার প্রত্যেকের রক্তে সীসার উপস্থিতির গড় হার ৬.৮৩ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার, যা সর্বোচ্চ হারের দিক থেকে বিশ্বে ১১তম।

ওই অনুসন্ধানে বাংলাদেশের মশলায় উচ্চ মাত্রায় সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। হলুদের মান নির্দেশক হিসেবে রঙ ও ওজন বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত লেড ক্রোমেট শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সমানভাবে রক্তে সীসার মাত্রা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। এক সমীক্ষা অনুসারে, কিছু পণ্যে সীসার উপস্থিতি জাতীয় সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে ৫০০ গুণ পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীসার ভূমিকাজনিত কারণে বাংলাদেশে আইকিউ হ্রাস পাওয়ায় অর্থনৈতিক যে ক্ষতি হয় তা দেশের জিডিপির ৫.৯ শতাংশের সমান। সীসার বিষক্রিয়া শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশের সক্ষমতাকে ব্যহত করে এবং জীবনে পাওয়া সুযোগগুলোর সর্বাধিক সুবিধা গ্রহণে তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, প্রথম দিকে অল্প কিছু লক্ষণ দেখা দিলেও সীসা নীরবে শিশুদের স্বাস্থ্য ও বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে মৃত্যুর মতো পরিণতিও ডেকে আনে। সীসার দূষণ কতটা বিস্তৃত তা জানা এবং ব্যক্তি বিশেষ ও কমিউনিটিতে এটি যে ক্ষতি করে তা বুঝতে পারা শিশুদের সুরক্ষা প্রদানে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণকে অবশ্যই অনুপ্রাণিত করবে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সীসা একটি শক্তিশালী নিউরোটক্সিন যা শিশুদের মস্তিষ্কে অপূরণীয় ক্ষতি করে। এটি বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে আনে, কারণ এটি তাদের মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই এর ক্ষতি করে, যার ফলস্বরূপ তাদেরকে সারা জীবনের জন্য স্নায়বিক, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়।

কালের আলো/এসবি/এমকেআর

Print Friendly, PDF & Email