শৃঙ্খলা বজায় রাখার দৃপ্ত অঙ্গীকারে প্রত্যয়ী নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান

প্রকাশিতঃ 10:15 pm | June 23, 2024

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :

রোববার (২৩ জুন) ২০২৪; প্রতিদিনের সঙ্গে এ দিনটির আপাতদৃষ্টিতে কোনো তফাত নেই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ দিনটিই চির-নূতনেরে স্বাগত জানানোর। এক নতুন আমেজ, নতুন শক্তি আর নতুন পথচলার গৌরবান্বিত একদিন। এদিনের সূর্যের কিরণেই দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী খুঁজে পেয়েছে আশাজাগানিয়া নতুন আলো। অন্য যে কোনো দিনের তুলনায় এই দিনের আলো মনে-প্রাণে জাগিয়েছে আশা, দেখিয়েছে নতুন স্বপ্ন। উচ্ছ্বাস আর আনন্দের বাতাবরণ। ধন্যি ধন্যি চারপাশ। দেশপ্রেমী এই বাহিনীটির ১৮তম সেনাপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বর্ণাঢ্য সামরিক রীতিতে বরণ করে নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নতুন এই অভিভাবককে।

  • মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায়
  • নবনির্মাণের রূপকার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আন্তরিক কৃজ্ঞতা
  • সুগভীর প্রজ্ঞা আর দূরদৃষ্টিতে নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও দেশপ্রেমের মন্ত্র

বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল ড.এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ’র কাছ থেকে রোববার (২৩ জুন) নেতৃত্বভার গ্রহণ করার পর গণভবনে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে নবনিযুক্ত এই সেনাবাহিনী প্রধানকে ‘জেনারেল র‌্যাঙ্ক ব্যাজ’ পরিয়ে দেন নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। পরে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় রাষ্ট্রপতি নবনিযুক্ত সেনাবাহিনী প্রধান’কে দায়িত্বভার গ্রহণ করার জন্য অভিনন্দন জানান এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করছেন। বিদেশে বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে সেনাবাহিনীর সদস্যদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা প্রশংসিত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, এছাড়া জাতীয় দুর্যোগসহ বিভিন্ন ক্রান্তিকালে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে আরো এগিয়ে যাবে। সাক্ষাৎকালে নতুন সেনাবাহিনী প্রধান দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতির দিকনির্দেশনা ও সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।

নব আনন্দে নব প্রত্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
পরে সেনা সদর দপ্তরের হেলমেট ভবনে ফিরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। নব আনন্দে নব প্রত্যয়ে দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তিনি নিজের বক্তব্যের শুরুতেই মহান আল্লাহ’র কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে কামনা করেছেন সবার সহযোগিতা। তাকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়ায় নবনির্মাণের অনন্য রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

  • নব আনন্দে নব প্রত্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
  • কোন রকম উসকানিতে পা না দেবে না সেনাবাহিনী
  • শান্তিপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের প্রয়াস

দেশপ্রেমিকের দৃপ্ত উচ্চারণে নিজ বাহিনীর শৃঙ্খলা বজায় রাখার দৃপ্ত অঙ্গীকারে হয়েছেন প্রত্যয়ী। বাঙালিত্ব, আদর্শবাদিতা, পেশাদার, সজ্জন, সুশৃঙ্খল, সৃজনশীল, বলিষ্ঠ নেতৃত্বগুণ, পরিশীলিত মনন ও ভিন্ন আঙ্গিকের অবিস্মরণীয় শক্তিময়তার আপন শৌর্যে মহীয়ান করেছেন নিজেকে। কোন রকম উসকানিতে পা না দিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের চেষ্টার কথা জানিয়েছেন।

একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কাজ করে যাবে জানিয়ে নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘সেনাবাহিনী ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারে তাঁর দায়িত্ব পালন করে, যদি সরকার আমাদের দায়িত্ব দেয় আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করবো। দুর্যোগ মোকাবিলায় যখন সরকার আমাদের নিয়োগ দিবে ইনশাআল্লাহ আমরা সেই সমস্ত দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করবো। দেশ গঠনে আমাদের নিয়োগ দিলে আমরা সেটাও করবো।’

তিনি বলেন, ‘শৃঙ্খলা একটি ইস্যু থেকেই যায়, সেনাবাহিনীকে সব সময় সুশৃঙ্খল রাখতে রাখতে আমি কাজ করে যাবো। সেনাবাহিনীর কিছু কিছু ইনফরমেশন আছে যেগুলো সংবেদনশীল সেইসব দিক বিবেচনা করে আপনারা সব সময় রিপোর্ট করেছেন। এজন্য আপনাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আমি আশা করবো পরবর্তী সময়েও আপনারা দায়িত্বের সঙ্গে রিপোর্টিং করবেন। আমি কথা দিচ্ছি অতীতেও কখনও হয়নি ভবিষ্যতেও হবে না; যেসব ইনফরমেশন আমরা আপনাদের দিবো সেগুলো হবে বস্তুনিষ্ঠ।’

মিয়ানমার ইস্যুতে কোন উসকানিতে পা দেবে না সেনাবাহিনী, এমনটি জানিয়ে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, কোন ধরণের প্রভোকেশন আমরা করি না। মিয়ামারের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়া দেয়ার ইজ নো আদার ইস্যু। আমরা চাই তাঁরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে যাক। তাছাড়া তাদের প্রতি কোন রকমের বিদ্বেষ সমস্যা আমি দেখি না। উই আর এনগেজড উইথ দেম। ডিফেন্স ডিপ্লোমেসি বলে একটা কথা আছে। যখন দুই ফোর্সেস একে অপরের সঙ্গে কমিউনিকেট করে সেই ফোর্সের পক্ষে হঠাৎ করে যুদ্ধ শুরু করা ভেরি ডিফিকাল্ট, এটি হয় না। এজন্য ডিফেন্স ডিপ্লোমেসি ইজ ভেরি ইম্পোর্টেন্ট। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছি। শান্তিপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের শ্বশুর জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানও একসময় সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৯৭-২০০০ মেয়াদে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মুস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে রেখেছেন প্রশংসনীয় ভূমিকা। তাঁর সময়ে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। গুরুত্বপূর্ণ এ অবদানের জন্য তিনি স্মরণীয়।

সুগভীর প্রজ্ঞা আর দূরদৃষ্টিতে নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও দেশপ্রেমের মন্ত্র
মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। দেশের মানুষের অন্যতম আস্থার একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠান। ৩৯ বছরের বর্ণাঢ্য চাকরি জীবনে নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নিজের সুগভীর প্রজ্ঞা আর দূরদৃষ্টিতে নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও দেশপ্রেমের মন্ত্রও যেন গেঁথে দিয়েছেন নিজ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মন-মননে। এর আগে গত মঙ্গলবার (১১ জুন) প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ওয়াকার-উজ-জামানকে সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়।

১৯৮৫ সালে সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ১৩তম দীর্ঘমেয়াদী কোর্সের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া ওয়াকার-উজ-জামান সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সেনা সদর দপ্তরের সামরিক সচিবের দায়িত্ব পান। এর আগে তিনি জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন নবম পদাতিক ডিভিশনকে। সেনাবাহিনীতে দীর্ঘ ৩৯ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন, একটি পদাতিক ব্রিগেড এবং পদাতিক ডিভিশনেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর বর্ণাঢ্য সামরিক জীবন কমান্ড, স্টাফ ও প্রশিক্ষকের অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। তিনি ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১০ সালের ৮ জুন পর্যন্ত ১৭ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর উপ-অধিনায়ক ও অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি তৎকালীন বিডিআর বিদ্রোহ দমনে নিষ্ঠা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি ২০১১ সালের ২৭ জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত দুই বছরেরও বেশি সময় ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ২০১৪ সালের ২ এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন বছর অতি গুরুত্বপূর্ণ নবম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে টানা তিন বছর ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের বিজয় দিবস প্যারেড এর প্যারেড কমান্ডার এর দায়িত্ব পালন করেন। এই বিরল কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘সেনাগৌরব পদক’ (এসজিপি) এ ভূষিত হন।

স্টাফ হিসেবে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত একটি ব্রিগেড, স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি এন্ড ট্যাকটিকস (এসআইএন্ডটি) এবং সেনাসদরে বিভিন্ন পদবী ও নিয়োগে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি প্রশিক্ষক হিসেবে জেসিও এনসিও একাডেমি (জেএনএ), স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি এন্ড ট্যাকটিকস ও বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব পিস সাপোর্ট এন্ড ট্রেনিং (বিপসট) এ অত্যন্ত সুনামের সাথে সকল পদবীর দেশী-বিদেশী সেনাসদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।

চলতি বছরের শুরুতেই সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) হিসেবে নিয়োগ পান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) হিসেবে ৩ বছর ১ মাস সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মিরপুরের ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজ ও যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট সার্ভিসেস কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। এছাড়াও তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘মাস্টার্স অব ডিফেন্স স্টাডিজ’ এবং যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে ‘মাস্টার্স অব আর্টস’- ইন ডিফেন্স স্টাডিজ ডিগ্রী অর্জন করেন।

অ্যাঙ্গোলা ও লাইবেরিয়ায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সিনিয়র অপারেশন অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এই উর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা। সেনাবাহিনীতে তাঁর কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি ‘অসামান্য সেবা পদক’ (ওএসপি) এ ভূষিত হন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি হিসেবে দেশে ও বিদেশে একাধিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেছেন। উজ্জ্বল করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এবং সারাহনাজ কমলিকা জামান দুই কন্যা সন্তান সামিহা রাইসা জামান ও শাইরা ইবনাত জামান এর গর্বিত জনক-জননী। ওয়াকার-উজ-জামান একজন সজ্জন, ক্রীড়ামোদি ও প্রাণবন্ত অফিসার হিসেবে সর্বমহলে সুপরিচিত।

কালের আলো/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email