২৮ অক্টোবর অছিম পরিবহনে ছাত্রদলনেতার আগুনে প্রাণ যায় নাঈমের

প্রকাশিতঃ 7:12 pm | April 27, 2024

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

রাজধানীর পল্টনে গত বছরের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশের দিন বিভিন্ন এলাকায় বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। সেদিন দিবাগত রাতে ডেমরা এলাকায় অছিম পরিবহনের একটি বাসে আগুন দিলে প্রাণ যায় এক শ্রমিকের। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে ছাত্রদল ও যুবদল নেতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ বিভাগের অ্যান্টি ইলিগ্যাল আর্মস অ্যান্ড ক্যানাইন টিম।

তারা হলেন- ছাত্রদল নেতা নুরুল ইসলাম মনির ওরফে মনির মুন্সি, নারায়নগঞ্জের যুবদল নেতা সাহেদ আহমেদ ও বিএনপি কর্মী মাহাবুবুর রহমান সোহাগ। সোহাগ মনির মুন্সির ব্যক্তিগত গাড়ি চালক। অভিযানে গাড়িতে আগুন দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে এই অগ্নিসংযোগ করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি তারা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।

শনিবার (২৭ এপ্রিল) দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসির অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বানচালের উদ্দেশ্যে রাজধানীর পল্টন এলাকায় নারকীয় তাণ্ডব চালায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তারা ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশের নামে রমনায় প্রধান বিচারপতির বাস ভবনে হামলা, পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করার মতো জঘন্য কাজসহ অসংখ্য গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৯ অক্টোবর ভোরবেলায় ডেমরা থানার দেইল্লা বাসস্ট্যান্ডে পার্কিং করে রাখা অছিম পরিবহনের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এতে ওই বাসে ঘুমিয়ে থাকা হেল্পার মো. নাইম ঘটনাস্থলে আগুনে পুড়ে মারা যান এবং অপর হেলপার মো. রবিউল আগুনে মারাত্মক আহত হন। এই ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত ও মামলার তদন্ত শুরু করে সিটিটিসি।

সংস্থাটির প্রধান বলেন, নিহত নাঈমের গ্রামের বাড়ি বরিশালের কোতয়ালি থানা এলাকায়। নিহত নাইমের বাবার নাম আলম চৌকিদার এবং মায়ের নাম পারভীন বেগম। তারা ডেমরা এলাকাতেই থাকতেন। অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতা ফেরানোর জন্যই অল্পবয়সে কাজে নামেন নাঈম। দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই বাসের ভিতর ঘুমন্ত অবস্থায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজের জীবন বিসর্জন দেন। অপর ভিকটিমের নাম মো. রবিউল। একই বাসে নাঈমের সঙ্গে ঘুমিয়ে ছিল রবিউল। ঘুমের মাঝে আচমকা আগুনের তাপে ঘুম ভেঙে যায় তার রবিউলের। কিন্তু ততক্ষণে রবিউলের শরীরেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কোনোমতে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় গাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। পরবর্তীতে পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় সে হসপিটালে ভর্তি হয়।

তদন্তভার গ্রহণের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘটনাস্থলের চারপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একটি হ্যারিয়ার গাড়ি শনাক্ত করা হয়, যা ওইদিন অগ্নিসংযোগে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই গাড়ির সূত্র ধরে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মূল অগ্নিসংযোগকারী ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার এবং ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়িটি জব্দ করা হয়।

আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামান আরও বলেন, ২৮ শে অক্টোবরের নাশকতা ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য মনির মুন্সিকে নির্দেশনা দেয় দলের হাইকমান্ড। নাশকতার মাত্রা আরও বাড়ানো এবং এমন কোনো ঘটনা ঘটানো যাতে করে জনমনে ব্যাপক আতংকের সৃষ্টি হয়। তারই অংশ হিসেবে বেশ কয়েকজনকে অগ্নিসংযোগের জন্য নিয়োগ দেয় মনির। সে নিজে বড় একটি ঘটনা ঘটানোর জন্য নারায়ণগঞ্জ যুবদলের সদস্য সচিব এবং তার বন্ধু সাহেদ আহমেদকে ডেকে নেয়। তারা দুজনে মিলে একটি পরিকল্পনা করে যেখানে তারা স্থির করে এমন একটি ঘটনা ঘটাবে যাতে জনমনে ব্যাপক আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিকল্পনারই অংশ হিসেবে ডেমরা এলাকার দেইল্লা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রাত ২ টার পর বেশ কয়েকবার গাড়ি দিয়ে ঘুরে ঘুরে রেকি করে এবং দেখতে থাকে কোন জায়গাটা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতামুক্ত। অবশেষে তারা কাঙ্ক্ষিত টার্গেট ফিক্স করে ‘বড়ভাঙ্গা’ মার্কেটে চলে যায়। সেখান থেকে তারা ২ লিটারের পানির বোতলে পেট্রোল সংগ্রহ করে রাত তিনটার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। নিরাপদ দূরত্বে গাড়ি থামিয়ে চালক মাহাবুবুর রহমান সোহাগকে গাড়িতে রেখে মনির মুন্সি ও সাহেদ পেট্রোলের বোতল নিয়ে রাস্তার পাশে পার্ক কররে রাখা অছিম পরিবহনের গাড়ির কাছে যায়। সেখানে একটি গাড়ীর ড্রাইভার সিটের পাশে থাকা খোলা গ্লাসের অংশ দিয়ে ড্রাইভার সিটে মনির মুন্সি পেট্রোল ঢেলে দেয় এবং একপর্যায়ে বোতলটি ও সেখানে ফেলে দেয়। তারপর দিয়াশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিমিষেই আগুন ছড়িয়ে পড়লে তারা দুইজন দৌড়ে পুনরায় গাড়িতে এসে ওঠে এবং দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। তারা এক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিপদ এড়ানোর জন্য উল্টো সাইডে ডেমরা এক্সপ্রেসওয়েতে উঠে সুফিয়া কামাল ব্রিজ দিয়ে ভুলতায় থাকা মনির মুন্সিদের মালিকানাধীন ‘মুন্সি পেট্রোল পাম্প’ এ রাত্রী যাপন করে। সকাল ১০টায় বাসায় ফিরে যায়।

গ্রেপ্তারকৃতদের পদের বিষয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, নুরুল ইসলাম মনির ওরফে মনির মুন্সি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতি, সাহেদ আহমেদ নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং মাহাবুবুর রহমান সোহাগ বিএনপি কর্মী এবং মনির মুন্সির ব্যক্তিগত ড্রাইভার।

নাশকতার নির্দেশদাতাদের পরিচয় জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা সবার নাম পরিচয় পেয়েছি। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তাদের গ্রেপ্তার শেষে সবাইকে জানানো হবে।

কালের আলো/বিএস/এমএইচএ

Print Friendly, PDF & Email