বিজয়ের বায়ান্নতে বর্ণিল প্যারেড স্কয়ার, বাংলাদেশের সমর সক্ষমতার অনুপম উপস্থাপন

প্রকাশিতঃ 10:01 pm | December 16, 2022

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো:

বাঙালি জাতির হাজার বছরের শৌর্য ও অবিস্মরণীয় বীরত্বগাঁথার একটি দিন। কারও দয়ার দানে নয়, সাগর-সমান রক্তের দামে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। ফলত পূব আকাশে সূর্য উঁকি দিতেই বিজয়ের বায়ান্নতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে শুরু হয় বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। সাত সকালেই বর্ণিল হয়ে উঠলো রাজধানীর প্যারেড স্কয়ার। জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জাঁকালো কুচকাওয়াজ।

আরও পড়ুন: কন্যা ও নাতনিকে নিয়ে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ উপভোগ করলেন প্রধানমন্ত্রী

যেখানে নিজেদের সমর সক্ষমতার অনন্য নজির স্থাপন করে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। চতুর্থ প্রজন্মের সমরাস্ত্র আধুনিক টাইগার মাল্টিপল লঞ্চ রকেট মিসাইল সিস্টেম (টাইগার এমএলআরএস), মিগ-২৯ যুদ্ধ বিমান, সাবমেরিন বা নিজস্ব সক্ষমতায় তৈরি ড্রোন-কী ছিল না বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজের প্রদর্শনীতে।

সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জামের অনুপম প্রদর্শন আর সুশৃঙ্খল মার্চ পাস্টের এই গতিই যেন মোটা দাগে হয়ে উঠে বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন এগিয়ে চলা বাংলাদেশের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। ঠিক যেভাবে বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে রক্ত-সাগর পেরিয়ে বাঙালি জাতি পৌঁছেছে তার বিজয়ের সোনালি তোরণে।

বাঙালি জাতির জীবনের নতুন প্রভাতের শুক্রবার (১৬ ডিসেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরের জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর মনোমুগ্ধকর কুচকাওয়াজ মুগ্ধতায় উপভোগ করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কুচকাওয়াজ প্রদর্শনীতে সমরে প্রতিরক্ষায় অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত সক্ষমতা জানান দেয় বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি।

বাংলার জলে-স্থলে-আকাশকে সুরক্ষিত রাখতে সদা প্রস্তুত বাংলার বীর সেনারা। প্রদর্শনীতে উঠে আসে নানান ক্ষেত্রে অর্জন-অগ্রযাত্রার স্মারক। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিজয় দিবস কুচকাওয়াজের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশন।

বিজয় দিবস কুচকাওয়াজের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নবম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও সাভারের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মো.শাহীনুল হক। প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নবম পদাতিক ডিভিশনের কর্নেল স্টাফ কর্নেল গোলাম মহিউদ্দিন হায়দার। এদিন সকাল ১০ টা ১৪ মিনিটে কুচকাওয়াজের অধিনায়ক মেজর জেনারেল মো.শাহীনুল হক উপঅধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো.খালেদ কামালের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কুচকাওয়াজের দায়িত্ব বুঝে নেন। প্রথমেই তাঁর কন্ঠে ধ্বনিত হয় ‘বিজয় দিবস প্যারেড অস্ত্র নামাবে…’।

সকাল ১০ টা ২৪ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অশ্বারোহী প্রহরী পরিবেষ্টিত হয়ে মিলিটারি পুলিশের মোটরশোভাযাত্রায় অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছেন। এ সময় তাকে অভ্যর্থনা জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড. এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম শাহীন ইকবাল, বিমানবাহিনী’র ভারপ্রাপ্ত প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল মো.সাইদ হোসেন, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার উজ জামান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খাজা মিয়া।

এ সময় দর্শক সারিতে ছিলেন স্পিকার ড.শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো.তাজুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, সেনাপ্রধানের স্ত্রী বেগম নুরজাহান আহমেদ প্রমুখ।

সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রায় সকাল ১০ টা ২৮ মিনিটে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অভিবাদন মঞ্চে এসে পৌঁছলে তাকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড. এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম শাহীন ইকবাল, বিমানবাহিনী’র ভারপ্রাপ্ত প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল মো.সাইদ হোসেন, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার উজ জামান উপস্থিত ছিলেন। 

১০ টা ৩৪ মিনিটে খোলা জিপে করে সুশৃঙ্খল কনটিনজেন্ট পরিদর্শন করেন সশস্ত্র বাহিনী প্রধান মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন কুচকাওয়াজ অধিনায়ক মেজর জেনারেল মো.শাহীনুল হক। এরপর শুরু হয় বর্ণিল কুচকাওয়াজ। প্রধান অতিথি হিসেবে রাষ্ট্রপতি কুচাকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন।

বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর আর দৃপ্ত পদভারে মার্চ পাস্টে এগিয়ে চলেন দেশমাতৃকার সেবায় উজ্জীবিত সশস্ত্র বাহিনীর বীর সেনারা। এই মার্চ পাস্টে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মোট ২৩ টি কন্টিনজেন্টের সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি। অংশগ্রহণ করেন বিজিবি, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড ও বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা।

সকাল ১০ টা ৫৯ মিনিটে পূর্ব আকাশের দিকে প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডের ৩০ জন অকুতোভয় ফ্রিফলার আর্মি এভিয়েশনের কাসা সিটু নাইন ফাইভ টুনাইন ডাব্লিউ বিমান থেকে ১০ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ফ্রিফল জাম্প করে গ্যালারির পূর্ব প্রান্তে অবতরণ করেন। এই ফ্রিফল দলে নেতৃত্ব দেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রওনক ইমতিয়াজ খান। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে অবতরণ করেন। তাঁর মোট জাম্পের সংখ্যা ১৩০ টি। এরপর মহামান্য রাষ্ট্রপতির পতাকা নিয়ে অবতরণ করেন মেজর মশিউর। তাঁর মোট জাম্প সংখ্যা ১৪০ টি। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য পতাকা হাতেও নেমে আসেন প্যারাট্রুপাররা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের কন্যা, বাংলাদেশের অটিজম বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি সায়মা ওয়াজেদ ও নাতনি সামা হোসাইনকে নিয়ে বিজয় দিবস কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন। কন্যা-নাতির মাঝখানে দর্শক সারিতে ফুরফুরে মেজাজেই ছিলেন সরকারপ্রধান। 

এরপর ধীর কিন্তু দৃপ্ত গতিতে এগিয়ে আসে অসীম সাহসের প্রতিভূ, বাঙালি জাতির চির আরাধ্য পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ও প্রগাঢ় দেশপ্রেম এবং চরম আত্মত্যাগের প্রতীক জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সাত বীরশ্রেষ্ঠের প্রতিকৃতি। এরপর মুক্তিযোদ্ধা কন্টিনজেন্টও অভিবাদন জানান রাষ্ট্রপতিকে। পরে এগিয়ে আসে আধুনিক সব সাজোয়া যান, যা প্রমাণ দেয় বাংলাদেশের সমর সক্ষমতাকে।

কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণকারী সম্মিলিত যান্ত্রিক বহরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ৯ আর্টিলারি ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তৌফিক হামিদ। জাতিসংঘ কন্টিনজেন্টের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ৮১ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ ব ম আব্দুল বাতিন ইমানী।

প্যারেড গ্রাউন্ডের উত্তর আকাশে ফ্লাইপাস্টের মাধ্যমে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিবাদন জানাতে উত্তর দিক থেকে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মি এভিয়েশন গ্রুপের বিমান বহর। এই সংস্থার সেনা বৈমানিকরা বিজিবি ও র‌্যাব উইং’র উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টারসমূহ পরিচালনা করেন। আর্মি এভিয়েশন গ্রুপের ফ্লাইপাস্টের নেতৃত্বে ছিলেন আর্মি এভিয়েশন গ্রুপের গ্রুপ কমান্ডার মেজর জেনারেল আই কে এম মোস্তাহসিনুল বাকী।

এ সময় ধারাভাষ্যকার বলছিলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী পরিকল্পনা ও মাননীয় সেনাপ্রধানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আর্মি এভিয়েশনের বিমান বহরে ২০১৭ ও ২০২২ সালে দু’টি অত্যাধুনিক কাসা সিটুনাইনফাইভডব্লিউ বিমান সংযোজন করা হয়।’ এরপর নেভাল এয়ার ক্রাফটের তিনটি মেরিটাইম পেট্রোল এয়ার ক্রাফট ও দু’টি মেরিটাইম হেলিকপ্টর মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে ফ্লাইপাস্টের মাধ্যমে অভিবাদন জানায়। বিমানবাহিনীর ফ্লাইপাস্ট ও অ্যারোবেটিক ডিসপ্লে মুগ্ধ করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে। বিমান বাহিনীর ফ্লাইপাস্টের নেতৃত্ব দেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. মনিরুজ্জামান হাওলাদার।

আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারসহ প্যারেড গ্রাউন্ডে আসার পথে রাজধানীর সড়কগুলোতে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বিজয় দিবসের চেতনা সম্বলিত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যানার ও বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়। এই সকল ব্যানার ও বিলবোর্ডসমূহের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধ তথা বাঙালি জাতির অমর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটানো হয়।

মহান বিজয় দিবস কুচকাওয়াজ সুষ্ঠু ও স্বার্থক করতে আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর), গণপূর্ত অধিদপ্তর, পিডিবি, ঢাকা ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, টিএন্ডটি, ডেসকো, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর, গণযোগাযোগ অধিদপ্তর, পিডব্লিউডি ও স্থাপত্য অধিদপ্তর অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে।

দিবসটি পালনের অংশ হিসেবে সকল সেনানিবাসসমূহে বাদ জুম্মা শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্বাস্থ্য এবং দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি এবং সশস্ত্র বাহিনীর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

কালের আলো/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email