হাতিরঝিল বাঁচান

প্রকাশিতঃ 9:51 am | December 01, 2022

আমীন আল রশীদ

আমীন আল রশীদ :

শুক্রবার (২৫ নভেম্বর) বিকাল। রাজধানীর গুলশান থেকে ছেড়ে আসা একটি ওয়াটার ট্যাক্সি এসে থামে এফডিসি প্রান্তে। কিছুটা দূর থেকেই দেখা গেলো বেশ বড়সড় একটা মাছ ভাসছে। মৃত। কাছে আসার পরে দেখা গেলো এটি পাঙ্গাশ। সাইজ দেখে মনে হলো তিন কেজির কম নয়। দুর্গন্ধযুক্ত কালো পানিতে এরকম একটি মাছ ভাসতে দেখে কৌতূহলী অনেক যাত্রীই হাতিরঝিলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

অথচ গত ২৪ মে পরিবেশ সুরক্ষায় দেওয়া একটি রায়ে হাতিরঝিলকে ‘ঢাকার ফুসফুস’ বলে অভিহিত করেছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু সেই ফুসফুস এখন ক্যানসারে আক্রান্ত।

হাতিরঝিলের এই নৌপথের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সখ্য বহু দিনের। অফিস শেষে বাসায় ফিরি হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সিতে। গুলশান পুলিশ প্লাজা থেকে উঠে এফডিসি প্রান্তে এসে নামি। সহকর্মী ও বন্ধুদের সঙ্গে গর্ব করে বলি, ঢাকা শহরে থেকেও যাদের ট্রাফিক জ্যামের যন্ত্রণা পোহাতে হয় না, আমি সেই বিরল সৌভাগ্যবানদের একজন।

পুলিশ প্লাজা থেকে এফডিসি ঘাট—এই পথের ভাড়া এখন ২৫ টাকা। সময় লাগে ১১ থেকে ১২ মিনিট। উপরন্তু কখনও গোধূলির সোনালি আকাশ, সঙ্গে মৃদুমন্দ হাওয়া; সন্ধ্যার পরে জলের আয়নায় রঙিন আলোর প্রতিবিম্ব; রাত একটু বেশি হলে চারদিকে সুনসান নীরবতা ভেদ করে সহনীয় শব্দে জলের বুক চিরে বয়ে চলা ওয়াটার ট্যাক্সির এই যাত্রাটুকু মনের ভেতরে অনাবিল প্রশান্তি এনে দেয়। যখন ঢাকা শহরের লাখ লাখ মানুষ অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে নারকীয় জ্যামে আটকে থেকে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়ির ভেতরে হাঁসফাঁস করেন, তখন এই ওয়াটার ট্যাক্সির যাত্রীরা ঈর্ষা করার মতো স্বস্তিতে বাড়ি ফেরেন। সেই হাতিরঝিলের পানিতে এখন মাছ মরে ভেসে ওঠে।

পাঙ্গাশ মাছ ইলিশের মতো সংবেদনশীল নয় যে ডাঙায় তোলার পরেই সে মরে যাবে। বরং পাঙ্গাশ অল্প পানিতেও বেঁচে থাকে। ডাঙায় তোলার পরে সামান্য পানিতেও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকে। এমনকি পানি না থাকলেও অনেকক্ষণ টিকে থাকে। সেই মাছও যখন মরে ভেসে ওঠে, তখন এটা বুঝতে আর বাকি থাকে না যে হাতিরঝিলের পানিতে দূষণের মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বলা হয়, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যে নেমে গেলে সেখানে কোনও মাছ বা অন্য কোনও প্রাণী বাঁচতে পারে না। তার মানে হাতিরঝিলের পানিতে এখন দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যের নিচে। সম্ভবত বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর চেয়ে খারাপ অবস্থা রাজধানীর বুক চিরে বয়ে চলা এই দৃষ্টিনন্দন লেকের। শুধু তাই নয়, হাতিরঝিলের পানিতে ক্ষতিকর তিন ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পেয়েছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা, যা স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। বলা হচ্ছে, এসব জীবাণু বাতাসেও ছড়ানোর ক্ষমতা রাখে। মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে তা দেহে প্রবেশ করে পেটের পীড়াসহ নানা রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম। (আজকের পত্রিকা, ২২ অক্টোবর ২০২১)।

প্রসঙ্গত, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বেগুনবাড়ি ও গুলশান এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই জলরাশিকে আমরা ‘হাতিরঝিল লেক’ বললেও এটি আসলে নড়াই নদী। নদীটি একসময় রামপুরার পাশ দিয়ে পুবদিকে বালু নদীতে গিয়ে মিশতো। কিন্তু সেই নড়াই নদী এখন রামপুরার পাশ দিয়ে বয়ে চলা একটি ক্ষীণরেখা বা একটি ড্রেনের আকারে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ডে ‘রামপুরা খাল’। আর দখল দূষণে বিপর্যস্ত এই নদীর আরেকটি অংশ উদ্ধার করে নাম দেওয়া হয়েছে হাতিরঝিল।

রাজধানীর বড় একটি অংশের জলাবদ্ধতা নিরসন, বৃষ্টি ও বন্যার পানি ধারণ, রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি নগরের নান্দনিকতা এবং পরিবেশের উন্নয়নে হাতিরঝিল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।

২০১৩ সালে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এরপর বৃষ্টির পানি ধারণের পাশাপাশি এলাকাটি মানুষের অবসর কাটানোর উল্লেখযোগ্য একটি স্থানে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু ধীরে ধীরে এই লেকের পানি দূষিত হতে থাকে। এত বড় একটি লেকের পানি এক দুই দিন বা এক দুই মাসে দূষিত হয়নি। বছরের পর বছর এর ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ও গাফিলতিই যে একসময়ের স্বচ্ছ পানির এই আধারকে এখন নর্দমায় পরিণত করছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অথচ এই লেক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউকের। কিন্তু তারপরও এখানে কেন মাছ মরে ভেসে উঠবে; কেন এই লেকের পাশ দিয়ে কিংবা লেকের বুক চিরে ওয়াটার ট্যাক্সিতে যাতায়াতের সময় তীব্র দুর্গন্ধ এসে নাকে লাগবে?

বর্ষা মৌসুমে গন্ধ এতটা থাকে না। কারণ, তখন পানির প্রবাহ বেশি থাকে। কিন্তু হেমন্ত এবং শীতকালে পানির প্রবাহ কমে গেলে হাতিরঝিলের কয়েকটি অংশে দূষণের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিশেষ করে হোটেল সোনারগাঁওয়ের দক্ষিণ ও পূর্ব প্রান্তে। অথচ এই পাঁচতারকা হোটেলে নিয়মিত বিদেশি লোকজন আসেন। রাষ্ট্রীয় সফরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এসেও এখানে থাকেন। এত সুন্দর একটি লেকের পানির এমন কালো রঙ আর দুর্গন্ধ তাদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে কি কোনও ভালো বার্তা দেয়?

শুধু আরামদায়ক ও সময় সাশ্রয়ী নৌপথ এবং সড়ক পথে ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের যোগাযোগ সহজ করাই নয়, বরং হাতিরঝিলকে গড়েই তোলা হয়েছিল নাগরিকদের একটি বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে। যে কারণে লেকের চারপাশে প্রচুর গাছপালা, বসার জন্য দীর্ঘ সিঁড়ি ও বেঞ্চ, স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের হাঁটার জন্য পর্যাপ্ত ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। গুলশান-নিকেতন-তেজগাঁও-রামপুরা-বনশ্রী ও বাড্ডা তো বটেই, রাজধানীর আরও অনেক এলাকা থেকে প্রতিদিনই মানুষ তাদের পরিবার ও প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে হাতিরঝিলে ঘুরতে আসেন। কিন্তু এখন এখানে এলে তাদের বিব্রত হতে হয় দুর্গন্ধে।

গণমাধ্যমের খবর বলছে, ১৩টি পথ দিয়ে মগবাজার, বেগুনবাড়ী, মধুবাগ, নিকেতন, রামপুরা, বাড্ডা, তেজগাঁও, মহাখালী, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার ও কাঁঠালবাগান এলাকার পানি হাতিরঝিলে আসে। এই পানির অধিকাংশ থাকে পয়ঃবর্জ্য অমিশ্রিত। এ সমস্যা সমাধানের জন্য হাতিরঝিলে পানি নামার নয়টি পথে বর্জ্য শোধনের যন্ত্র বসানো হয়েছিল। ইতোমধ্যে কয়েকটি যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেছে। আর পানির চাপ বেশি থাকলে এই যন্ত্রগুলো কাজ করে না। (প্রথম আলো, ২৪ এপ্রিল ২০১৯)।

হাতিরঝিল বাঁচাতে হবে। এর পানি যদি এভাবে দূষিত হতে থাকে এবং পানি কমতে থাকে তাহলে এই নৌপথে যাতায়াতে মানুষের আগ্রহ কমে যাবে। অথচ এই নৌপথটি রাজধানী ঢাকার অসংখ্য মানুষের জন্য আশীর্বাদ। হাতিরঝিল লেককে কেন্দ্র করে ঢাকার বিরাট অংশেই যানজট নিরসন করা সম্ভব। যেহেতু ঢাকা শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা অধিকাংশ খালই দখল হয়ে গেছে এবং অনেকগুলোর অস্তিত্বই নেই, অতএব, যতগুলো সম্ভব খাল উদ্ধার করে হাতিরঝিলের সঙ্গে যুক্ত করে সেখানে প্রচুর ওয়াটার ট্যাক্সি চালু করা গেলে রাস্তার ওপরে অনেক চাপ কমবে। তাছাড়া নৌপথ সচল করা গেলে সেটি নগরীর পরিবেশ উন্নয়ন, বিশেষ করে বাতাস বিশুদ্ধকরণেও বিরাট ভূমিকা রাখবে; যে ঢাকা শহর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় বরাবর পৃথিবীর দূষিত নগরীর তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে। এই দূষিত নগরীর তকমা ঘোচাতে হাতিরঝিল এবং অন্যান্য খাল বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণা বলছে, ঢাকার বুক চিরে একসময় ৪০টিরও বেশি খাল প্রবাহিত হতো। কিন্তু এখন সেখানে হাতিরঝিল, গুলশান লেক ও ধানমন্ডি লেক ছাড়া আর কোনও পরিষ্কার জলাভূমি দেখা যায় না। যেগুলো আছে, সেগুলো ময়লা পানির ড্রেন। ঢাকার খালগুলোর মালিক মূলত ঢাকা জেলা প্রশাসন। কিন্তু আশির দশকে খালের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পায় ঢাকা ওয়াসা।

২০০১ সালের দিকে অধিকাংশ খাল ভরাট করে তাতে বক্স কালভার্ট নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এতে জলাবদ্ধতা না কমে উলটো বেড়ে যায়। প্রকল্পটি ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৬ সালের ১৫ জুন একনেকে ঢাকার খালগুলো থেকে বক্স কালভার্ট তুলে উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে। তখন খালের আগের রূপ ফিরিয়ে আনতে ঢাকা ওয়াসা, রাজউক ও সিটি করপোরেশনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। বাস্তবতা হলো, একটি ড্রেন বা ক্ষীণ জলরেখাকে সংস্কার করে যত দ্রুত নৌপথে রূপ দেওয়া যায়, শতভাগ দখল হয়ে যাওয়া বা অস্তিত্ব বিলীন করে দেওয়া খালকে আগের চেহারায় ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন।

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের সব খাল আনুষ্ঠানিকভাবে দুই সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দেয় ঢাকা ওয়াসা। ওই অনুষ্ঠানে দক্ষিণ সিটির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছিলেন, ‘ঢাকার খালগুলো উদ্ধারের যে অঙ্গীকার আমরা করেছিলাম, সেটার বাস্তবায়ন শুরু করতে যাচ্ছি। জানি, কাজটা অনেক কঠিন। কিন্তু অঙ্গীকার থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নেই। যদি এই কাজে সফল হতে পারি, তাহলে ভেনিসের চেয়ে কোনও অংশে কম হবে না ঢাকা শহর।’

অনুষ্ঠানে উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলামও বলেন, ‘খাল রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে ঢাকা হবে ভেনিস।’ এর কিছু দিন পরে উত্তর সিটির রূপনগর খাল পরিদর্শনে গিয়ে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, তিনি এই খাল দিয়ে নৌকা চালিয়ে তুরাগ নদীতে যেতে চান। (নিউজবাংলা, ১৯ জানুয়ারি ২০২১)।

পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহানের ভাষায়, হাতিরঝিলের বয়স একযুগ পার হয়েছে। এতদিনেও পানি দূষণমুক্ত করার ব্যবস্থা করতে পারেনি রাজউক। এটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এমন অবহেলা ক্ষমার অযোগ্য। পৃথিবীর কোনও আধুনিক দেশেই শহরের বর্জ্য এভাবে পরিশোধন ছাড়া খালে বা ঝিলে ফেলা হয় না।

পাঠকের মনে থাকার কথা, এখন ঢাকার যে বিশাল অংশ হাতিরঝিল হিসেবে চিহ্নিত, সেই পুরো এলাকাটি ছিল বস্তি, নর্দমা ও ময়লার ভাগাড়। অনেক বড় প্রকল্প নিয়ে এই এলাকাটিকে রাজধানী ঢাকার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। কিন্তু পানিদূষণ রোধ করা না গেলে অচিরেই এটি এই অঞ্চলের জনসাধারণের গলার কাঁটায় পরিণত হবে। কারণ, পানিতে দূষণ বাড়তে থাকলে হাতিরঝিলের চারপাশে যে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করেন, তাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। অতএব, খুব দ্রুত হাতিরঝিলের পানি শোধন এবং এখানে সারা বছর পানির প্রবাহ বজায় রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। পয়ঃবর্জ্য যাতে কোনোভাবেই হাতিরঝিলের পানিতে এসে না মেশে, সেজন্য এই লেকে পানি প্রবেশের প্রতিটি জায়গায় শোধনাগার নির্মাণ করতে হবে। যেগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে সেগুলো সচল করতে হবে। কিন্তু অচল হলেই নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন কেনাকাটা এবং নতুন কেনাকাটা মানেই নতুন করে পার্সেন্টিজের ভাগবাটোয়ারার উদ্দেশ্যে যদি সচল যন্ত্রও অচল করে রাখা হয় কিংবা সঠিক নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা করা না হয়, তাহলে প্রকল্পের পর প্রকল্প পাস হবে; কেনাকাটা হবে, কিন্তু হাতিরঝিলের পানিতে ঠিকই মাছ মরে ভেসে উঠবে।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

Print Friendly, PDF & Email