‘বিপদে আমি না যেন করি ভয়…’

প্রকাশিতঃ 9:57 am | November 18, 2022

প্রভাষ আমিন :

বিশ্ব এক মহামন্দার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। করোনার ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এই মন্দাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। এই মন্দা ঠেকানোর একমাত্র উপায় এই মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ করা। বিশ্ববিবেক সবসময়ই যুদ্ধের বিপক্ষে। জি-২০ বৈঠকে বিশ্বনেতৃত্বও যুদ্ধ বন্ধের ডাক দিয়েছেন। ডাক দেওয়া সহজ, কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ করা কঠিন। নয় মাসে পড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের কোনও লক্ষণ নেই। কোনও একপক্ষ হার শিকার করবে তেমন ইঙ্গিতও মিলছে না। যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে ২০২৩ সালে গোটা বিশ্বকেই কঠিন এক সংকটে পড়তে হবে। গোটা বিশ্বই একটা গ্রামের মতো। এই গ্রামের কোথাও যুদ্ধ লাগলে তার ঢেউ লাগে সবখানে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক গ্রামের বাইরে নয়। তাই মন্দার ঢেউ লাগছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। আর ব্যাপারটা এমন অবশ্যম্ভাবী যে এটা লুকিয়ে রাখারও বিষয় নয়। কেউ সেই চেষ্টাও করেনি। বরং প্রধানমন্ত্রী নিজে সবার আগে সম্ভাব্য মন্দার কথা বলেছেন। বারবার তিনি মন্দা মোকাবিলায় সাশ্রয়ের কথা বলছেন। মন্দা মোকাবিলায় সরকারের সতর্কতার পাশাপাশি জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন।

মন্দার ঝাপটা বিশ্বের সব দেশেই লাগবে। প্রশ্ন হলো, আপনার অর্থনীতি কতটা সবল, সেই ঝাপটা সামাল দেওয়ার মতো সক্ষমতা আছে কিনা? ঝড় যত বড়ই হোক, সব ঘর কিন্তু তাতে ভেঙে পড়ে না। যার ঘর যত শক্ত ভিতের ওপর গড়া, তা তত টেকসই। বাংলাদেশের অর্থনীতি একদম উন্নত বিশ্বের মতো সবল হয়তো নয়, তবে মন্দার ঝড়ে উড়ে যাওয়ার মতো দুর্বলও নয়। হয়তো কিছু দিন দরজা-জানালায় খিল এঁটে বসে থাকতে হবে। কিন্তু উড়ে যাওয়ার ভয় নেই। ঝড়ের পূর্বাভাস যেহেতু আমরা পেয়েছি, তাই যতটুকু সময় আছে চেষ্টা করতে হবে ঘরটা আরও কত মজবুত করা যায়। শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানের মতো দুর্বল অর্থনীতি কিন্তু ঝড়ের প্রথম ঝাপটাতেই উড়ে গেছে।

আমাদের সমস্যা যতটা অর্থনীতিতে, তারচেয়ে বেশি রাজনীতিতে। পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে নিজের নাক কাটতেই পরোয়া নেই আমাদের। কদিন আগেও ‘বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাচ্ছে’ বলে উল্লাসে মেতে উঠেছিল একটি মহল। কিন্তু বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কা বানাতে না পেরে কিছু দিন মন খারাপ করে চুপ করে ছিল এই মহলটি। এখন আবার মাঠে নেমেছে এক বস্তা গুজব নিয়ে। ব্যাংকে টাকা নেই, এলসি খোলা যাচ্ছে না… এসব গুজব রটিয়ে বাংলাদেশের মন্দা ত্বরান্বিত করার চেষ্টা তাদের। কিন্তু একটা ব্যাপার কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকছে না, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে গেলে বা অর্থনীতি মন্দ হলে কাদের লাভ।

দেশটা তো আওয়ামী লীগেরও না, বিএনপিরও না। বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কা বানাতে পারলে বিএনপি ক্ষমতায় এসে কি তাকে উদ্ধার করতে পারবে? তাদের হাতে কি এমন জাদুর কাঠি আছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মোমেন্টাম মন্থর হয়ে গেছে, মহামন্দার শঙ্কাও আছে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি কোনোভাবেই শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো ভঙ্গুর নয়। এই কথাটা অবশ্য আমার নয়। সম্প্রতি ঘুরে যাওয়া আইএমএফ প্রতিনিধিদলের প্রধান রাহুল আনন্দ তার বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেছেন। এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু রিজার্ভ। ক’দিন আগেও রিজার্ভের বিষয়টি সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে ছিল। কিন্তু পাড়ার চায়ের দোকানেও রিজার্ভ নিয়ে ঝড় ওঠে। একটা কথা শুধু বলি, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ৮ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান সরকার সেটিকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে তুলেছিল। যুদ্ধের ধাক্কায় সেটি কমতে শুরু করে। কমতে কমতে এখন সেটি ৩৪ বিলিয়ন ডলার। রফতানি উন্নয়ন তহবিলে বিনিয়োগ বাদ দিলেও এখন সেটি ২৬ বিলিয়ন ডলার। তবে নেট রিজার্ভ যাতে কোনোভাবেই ২৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নামতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের রিজার্ভের মূল উৎস রফতানি আর রেমিট্যান্স।

মন্দার ঢেউ ইউরোপ-আমেরিকায়ও লেগেছে বলে রফতানি কমে গেছে অনেকটাই। কমছে রেমিট্যান্সও। শঙ্কাটা এখানেই। আমাদের রফতানি আরও বাড়াতে হবে। রফতানি খাতে তৈরি পোশাক নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। খুঁজতে হবে নতুন বাজারও। তবে রেমিট্যান্স কমার মূল কারণ বৈধ চ্যানেলে টাকা না পাঠিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো। করোনার সময় হুন্ডির দাপট কম ছিল বলে রেমিট্যান্সে উল্লম্ফন ঘটেছিল। এখন আবার হুন্ডির দাপট বেড়ে যাওয়ায় রেমিট্যান্স কমে গেছে। বিদেশ থেকে টাকা আসছে ঠিকই, কিন্তু সেটা বাংলাদেশের অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রবাসীরা যাতে সহজে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে পারে এবং তাতে যেন হুন্ডির চেয়ে বেশি লাভ হয়, তা নিশ্চিত করতে হব। পাশাপাশি প্রবাসীদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বিদেশি মিশনে এবং যাওয়া-আসার পথে বিমানবন্দরে তাদের সম্মান করতে হবে। যাতে দেশটাকে তারা নিজের মনে করতে পারে। এমনিতে বিমানবন্দরে প্রবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে কুকুর-বিড়ালের মতো আচরণ করা হয়। বিদেশে বাংলাদেশের মিশনে গিয়েও তারা কোনও সম্মান পান না। আরেকটা বিষয় হলো, বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে কোয়ানটিটির চেয়ে কোয়ালিটির দিকে বেশি নজর দিতে হবে। আমরা যদি বিদেশে আরও বেশি দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে পারি, তাহলে রেমিট্যান্স অনেক বাড়বে।

ব্যাংকে টাকা নেই বলে যারা গুজব ছড়াচ্ছেন, তারা একদম কিছু না জেনেই কথা বলছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, দেশে কোনও তারল্য সংকট নেই। বরং ব্যাংক ব্যবস্থায় বর্তমানে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য আছে। এট ঠিক, বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা ও আর্থিক খাতে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। আবার ছাড়ও পাচ্ছেন ঋণখেলাপিরাই। অর্থপাচারের ঘটনাও বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা বড় ক্ষত। মন্দা মোকাবিলায় আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। খালি পাচার আর ঋণের নামে লুটপাট বন্ধ করতে পারলেই মন্দা সামাল দেওয়া সম্ভব। আর বাংলাদেশের সব ব্যাংকের পারফরম্যান্স এক মানের নয়। ভালো ব্যাংক যেমন আছে, মন্দ ব্যাংকও আছে। তবে ব্যাংকে টাকা নেই, এটা মোটেই সত্যি নয়। এলসি খোলা যাচ্ছে না বলে যারা মাঠ গরম করতে চাইছেন, তারা পুরো সত্যটা বলছেন না বা জানেন না। এলসি খোলা যাচ্ছে, তবে আগের মতো সহজে নয়। রিজার্ভের পতন ঠেকাতে সরকার আমদানির ব্যাপারে সরকার একটু রক্ষণশীল হয়ে গেছে। অপ্রয়োজনীয় ও বিলাস সামগ্রী আমদানির এলসি খুলতে আপনার কষ্ট হতে পারে। তবে নিত্যপণ্য আমদানি আগের মতোই সহজ। এলসির ব্যাপারে সরকারের যে রক্ষণশীল আচরণ, তা বজায় রাখা উচিত মন্দা না থাকলেও। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে। চীন যে আজ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি, তার মূলে কিন্তু আমদানি কমিয়ে নিজস্ব শিল্পে নির্ভরতা বাড়ানো। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে পঞ্চাশের দশকে চীন সফরের অভিজ্ঞতায় তিনি লিখেছেন, তখনও চীন ব্লেড বানাতে পারেনি বলে সেখানকার পুরুষরা ক্ষুরে সেভ করতো, তবু ব্লেড আমদানি করতো না। আর আমাদের অনেকের বিদেশি পানি ছাড়াই চলে না। এই বিলাসিতা বন্ধ করতে না পারলে মন্দা কোনোদিনই যাবে না।

আসন্ন মন্দার বিষয়টি নিয়ে এ সপ্তাহের মন্ত্রিসভার বৈঠকেও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। মন্দা মোকাবিলায় ছয়টি করণীয় ঠিক করা হয়েছে– খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্য আমদানিতে উৎসে কর কমানো খাদ্য মজুত পর্যাপ্ত রাখা, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, রেমিট্যান্স বাড়ানো এবং বিদেশে দক্ষ জনবল পাঠানো। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো বা বিদেশে দক্ষ জনবল পাঠানো রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে আমরা যেটা করতে পারি সেটা হলো খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত নিশ্চিত করা। যাতে যত মন্দাই আসুক, পেটে যেন টান না পড়ে। আমাদের কৃষকরা বারবার তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। এখন সরকারকে পর্যাপ্ত সার, বীজ, সেচ সুবিধা নিয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে। আগেই বলেছি, ঝড় প্রবল হলে কিছু সময়ের জন্য আমাদের ঘরের দরজা-জানালায় খিল এঁটে বসে থাকতে হবে। তখন যাতে খাবারটা অন্তত মেলে।

তবে সুখের খবর হলো, আইএমএফ প্রতিনিধিদল ১৫ দিনের সফরে ৩০টি বৈঠক করে বাংলাদেশকে ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। আইএমএফের ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা মানে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। আইএমএফ প্রতিনিধিদল যাওয়ার পর বাংলাদেশে আসেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রাইজার। তিনিও বলেছেন, বাংলাদেশ তার অসাধারণ উন্নয়নের মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। বাংলাদেশ নিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের উচ্ছ্বাস আড়ালে রেখে যারা ব্যাংকের তারল্য সংকট খোঁজেন; তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন।

মন্দা আসছে, আসুক। আমরা মোকাবিলায় তৈরি। বিপদে ঘাবড়ে যেতে হয় না, গুজবে কান দিতে হয় না। সাহস নিয়ে মোকাবিলা করতে হয়।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Print Friendly, PDF & Email