প্রধানমন্ত্রী নিজে হেসেছেন, হাসিয়েছেনও

প্রকাশিতঃ 10:32 pm | September 14, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :

দু’দেশের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত রচনা করে চারদিনের ভারত সফর শেষ করে সংবাদ সম্মেলন। গণভবনের দিকেই সতের কোটি চোখ। কথা বলছেন চারবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনেক অর্জনের এই সফরে বেশ ফুরফুরা মেজাজেই দেখা গেছে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে। একের পর এক প্রশ্ন নিচ্ছেন। চেনা স্টাইলে, সহজ ও সাবলীলভাবেই সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।

আদতে কখনো সংবাদ সম্মেলনে কোন উত্তরই এড়িয়ে যান না। বিশ্লেষণ করেই কথা বলেন বাঙালির আশার বাতিঘর; যিনি ধৈর্য ও সাহসের প্রতিমূর্তি। প্রশ্ন-উত্তর পর্বে কথার প্রসঙ্গে ফাঁকে-ফাঁকে নিজে হেসেছেন। উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মী থেকে শুরু করে মন্ত্রী ও দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদেরও হাসিয়েছেন। বুধবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সরকারি বাসভবন গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বার্তা সংস্থা ইউএনবির সম্পাদক ফরিদ হোসেন যখন প্রশ্ন করেন, ‘ভারত সফর থেকে আমরা কী পেলাম?’

আরও পড়ুন: ভারত থেকে শূন্য হাতে আসেননি প্রধানমন্ত্রী

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কী পেলাম এই প্রশ্ন খুবই আপেক্ষিক। এটি আপনার নিজের ওপর নির্ভর করছে আপনি কীভাবে দেখছেন?’ সহাস্যে তিনি যখন বলে উঠেন, ‘ভাগ্যিস প্রশ্ন করেননি কী দিলাম’ বলতেই হাসির রোল পড়ে গেলো। সশব্দে হাসেন প্রধানমন্ত্রীও। অর্জনের নানাদিক বিস্তারিতভাবেই উপস্থাপন করেন।

উত্তর দেন বঙ্গবন্ধু বায়োপিকের ট্রেলার নিয়েও। সরকারপ্রধান বলেন, ‘করোনার কারণে শ্যুটিং বন্ধ ছিল। ট্রেলার দেখার পর কিছু প্রশ্ন হয়েছে। ট্রেলার যদি গ্রহণযোগ্য না হতে ফ্রান্সের কান উৎসব গ্রহণ করতো না। আসলে ৭ মার্চের ভাষণে জাতির পিতাকে দেখার পর সেটি অভিনয় করে দেখালে এটি নিতে অনেকের কষ্ট হয়। আমি মনে করে করি, যেটুকু করেছে সেটি খুবই চমৎকার হয়েছে। অনেক কিছু সংশোধন করা হয়েছে। সিনেমাকে সিনেমা হিসেবেই দেখত হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর ডান পাশে বসেছিনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী। বাম পাশে বসেছিলেন দলীয় সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

আরও পড়ুন: বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকে শিল্পীরা ভালো অভিনয় করেছে: প্রধানমন্ত্রী

একজন সিনিয়র সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের স্মৃতি.. সবাই ভুলে যায়। ছয় ঋতুর দেশ, ৬ মাস পরপর ঋতু বদলায়, মনও বদলায়। খালেদা ক্ষমতায় থাকতে যখন ভারত সফরে গেলো। সুন্দর সেজেগুজে গেছেন। তারা আদর আপ্যায়নও করেছে। কিন্তু ফিরে এসে বললো, গঙ্গার পানির কথা বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম। গঙ্গা নদীতে বাংলাদেশের অধিকারের কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিলেন।

৯৬ সালে সরকার গঠন করেই গঙ্গার পানি চুক্তি করলাম। ওরা ভুলেই যায় দেশের স্বার্থের কথা। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় পণ্য যাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে সকল পণ্য থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করে দিয়েছিল। বাংলাদেশ ভারতীয় পণ্যে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল। ভুলে গেছেন সেই কথা? সাইফুর রহমান সমস্ত কিছু ওপেন করে দিলো। তখন পুরো বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কী যাবে সেই সুবিধা নিতে পারেনি। আপনাদের এগুলো জানিয়ে দেওয়া উচিত, মনেও রাখা উচিত। দু’টি তথ্য দিলাম এগুলো একটু ব্যবহার করেন।’

‘টকের সঙ্গে একটু মিষ্টি না হলে কিন্তু টেষ্ট হয় না’ কথা প্রসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। বলতে থাকেন, ‘টকশোতে যে যার মতো কথা বলেন। আওয়ামী লীগ সরকারে আসার আগে এতো কথা বলার সুযোগ কেউ পেয়েছে কখনও? একটি টেলিভিশন একটি রেডিও। কোথায় টকশো হয় কোথায় মিষ্টি কথা? সে তেতুলের টক হোক বা রসগোল্লার মিষ্টি কোনটাই কেউ পায়নি। কথা বলার কোন অধিকার ছিল না। এখন শুনি সব কথা বলার পর বলে কথা বলার অধিকার নেই। এটাও শুনতে হয়।

আরও পড়ুন: জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করব কী না, সময় বলে দেবে : প্রধানমন্ত্রী

আজ রাস্তায় আন্দোলন, জনগণ সাড়া না দিলে সেটি আমাদের দায়িত্ব নয়। আওয়ামী লীগ বিএনপির হাতে নির্যাতিত, সে কথা ভুলে গেছেন? আওয়ামী লীগের ওপর সবাই চড়াও হয়েছে। সেই জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে একের পর এক। লাশ টানতে টানতে আর আহতের চিকিৎসা করতে করতে নাভিশ্বাস উঠেছিল আমাদের। এখন কি সেই অবস্থা আছে? আমার পার্টির কেউ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমি চাই গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকুক একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আসুক।’

টানা তিনবারের সরকারপ্রধান ওয়ান-ইলেভেনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আপনারা কি ওয়ান-ইলেভেনের কথা ভুলে গেছেন? রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক কী ব্যবসায়ী সবার নাভিশ্বাস উঠেছিল। সেখান থেকে অন্তত সবাই মুক্তি পেয়েছেন। ২০০৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার, চলার অধিকার, সমালোচনার অধিকার, প্রশংসা করার অধিকার সবই পাচ্ছেন। কাউকে কেউ মুখ বন্ধ করে রাখছে না।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশের বিষয়ে ভারতের সব দল-মত এক : প্রধানমন্ত্রী

মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা আমি দিয়েছি, এটি স্বীকার করতে হবে। আপনারা এখানে কিছু বলতে চাইলে বলতে পারেন আমি উত্তর দিবো। আমি দেশের মানুষের জন্য কাজ করি। আমার স্বার্থ এদেশের মানুষ ভালো থাকুক। ৪০ ভাগ দারিদ্র্য ২০ ভাগে নামিয়েছি। আজ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। এটি কি এতো সহজ ছিল? সুষ্ঠুভাবে সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে না পারলে, অর্থনৈতিকভাবে অগ্রগতি না হতো, গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত না হতো তাহলে কী এই অর্জন করা সম্ভব হতো? প্রশ্ন করেন প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘টার্গেট ঠিক করি যে আমি এটি করবো। সেভাবে কিন্তু করে যাচ্ছি। আজ ১৩ থেকে ১৪ বছরে মঙ্গা আছে? এটি কি এমনি এমনি হয়ে গেলো? এমনিতে হয়নি। আমরা সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়ন করেছি। তাঁর সুফল দেশের মানুষ পাচ্ছে। বেশি কিপ্টেমি না করে সেগুলো বলেন না ভালো করে। আমার বেলায় এতো কৃপণতা কেন আপনাদের?’ হাসি দিয়েই বলেন প্রধানমন্ত্রী। পরক্ষণেই তিনি বলেন, ‘ওতে আমার কিছু আসে যায় না। আমি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কাজ করছি।’

সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোন এলাকা বাদ দেইনি এমন কথা দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেই শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব জায়গাতেই কাজ করে যাচ্ছি। টকশোতে টক টক কথা বলেন। টকের সঙ্গে একটু মিষ্টি না হলে কিন্তু টেষ্ট হয় না। এটিও মনে রেখেন। সেটিই আমি বলবো।’ হাসেন প্রধানমন্ত্রী। হেসে উঠে গণভবনের গোটা হলরুম

আরও পড়ুন: আমার ব্যাপারে এত কৃপণতা কেন আপনাদের : প্রধানমন্ত্রী

ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রীর ‘জামদানি কূটনীতি’র সুফল মিলেছে। প্রধানমন্ত্রী সেখানে থাকা অবস্থায়ই দিল্লিতে আন্তর্জাতিক এক মেলায় বাংলাদেশি শাড়ির বিক্রয় কেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয়। এ বিষয়ে তাঁর কাছে জানতে চান এক সাংবাদিক। প্রধানমন্ত্রী এ সময় হেসে বলেন, অন্তত একটা বিষয়ে আমি খুশি যে আমাদের তাঁতিরা কাজ পারেন। সুফলটা তাদের হাতেই যাবে। এটা বাস্তব কথা। যখন যেখানে যাই, আমার নিজের দেশের যেটা আছে সেটাই ব্যবহার করি। নিজের দেশকে তুলে ধরার চেষ্টা করি।

দেশের পণ্যটা মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করি। দেশের পণ্য যাতে ভালো বাজার পায় সেই চেষ্টা আমি করি। করবো না কেন? আমাদের তাঁতিদের হাতে তৈরি জিনিস। কাজেই তাদের সুযোগ করে দিতে হবে। এটা আমাদের দায়িত্ব। তবে আমি খুশি হলাম এই জামদানি মেলায় তাদের কেনাবেচা যে বেড়ে গেছে। সেটা আমার জন্য খুব আনন্দের।

কালের আলো/পিএম/এনএল

Print Friendly, PDF & Email