বিশ্ব শরণার্থী দিবস, নিরাপত্তার অধিকার ও বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ 10:34 am | June 21, 2022

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন :

আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস। বিশ্বব্যাপী আজকের দিনটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে ক্রমান্বয়ে শরণার্থী একটা বড় সমস্যা হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি বছর বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালনের গুরুত্ব ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে, বাংলাদেশেও বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালনের গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের পর একটা বিরাট সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী (প্রায় সাড়ে ৭ লক্ষ) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের জেনোসাইড থেকে বাঁচার জন্য বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেওয়ার পর শরণার্থী বিষয়ক আলোচনায় বিশ্ব পরিসরে বাংলাদেশের নামও এখন সমান গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। ২০১৭ সালের আগে রোহিঙ্গারা এ দেশে ছিল না, বিষয়টি তা নয় (প্রায় ৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বসবাস ছিল)। কিন্তু ২০১৭ সালের পর বিষয়টির তীব্রতা, ভয়াবহতা এবং গুরুত্ব ভিন্ন মাত্রা নেওয়ায় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও শরণার্থী বিষয়ক আলোচনায় বাংলাদেশের নাম অনিবার্যভাবে হাজির হয়। কেননা, শরণার্থী বসবাসের ঘনত্বের বিবেচনায় উখিয়ার কুতুপালং এখন সর্ববৃহৎ শরণার্থী শিবির হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ের জেনোসাইডের উদাহরণ হিসাবেও রোহিঙ্গাদের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী গণহারে আলোচনা আসে।

তাছাড়া, আন্তর্জাতিক ন্যায় বিচার আদালতে মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডিরেক্টিভস প্রভৃতি বিষয় রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বেশ আলোচনায় এনেছে। ফলে, শরণার্থী বিষয়ক বিশ্ব জনপরিসরে বাংলাদেশ এখন একটি আলোচিত নাম। সার্বিক বিবেচনায় বিশ্ব শরণার্থী দিবসের গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্যও কোনও অংশে কম নয়। যদিও বাংলাদেশ দাবি করে যে ১৯৫১ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনে বাংলাদেশ কোনও স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। অনেকে বলে থাকেন, ১৯৫১ সালে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের তো জন্মই হয়নি। কিন্তু ১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পরও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করেনি। শরণার্থী বিষয়ক ১৯৬৭ সালের প্রটোকলেও বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেনি। অথচ, বাংলাদেশ প্রায় ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার সহায়তায় এদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছে। তাই, এভাবেই বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেশনের অনুস্বাক্ষরকারী দেশ না-হলেও বিশ্ব শরণার্থী দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বাংলাদেশে কোনও অংশে কম নয়।

এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ২০ জুন থেকে বিশ্বব্যাপী বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত হয়ে আসছে। ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন স্বাক্ষরের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০১ সাল থেকে বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালন করা শুরু হয়। এখানে আরও উল্লেখ্য, ২০০০ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশ্ব শরণার্থী দিবস অনুমোদন হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিবছর জুন মাসের ২০ তারিখ মূলগতভাবে আফ্রিকার শরণার্থী দিবস হিসেবে পালিত হতো। পরবর্তী এটা আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস হিসেবে পরিচিতি পায়।

প্রতিবছর বিশ্ব শরণার্থী দিবসের জন্য জাতিসংঘ একটা ঘোষণাপত্র তৈরি করে এবং একটা থিম বা প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে। ২০২২ সালের বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে “ Whoever. Wherever. Whenever. Everyone has the right to seek safety”। যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, “যেই হোক, যেখানেই হোক, যখনই হোক না কেন, প্রত্যেকের নিরাপত্তা চাওয়া অধিকার আছে”। UN Secretary-General António Guterres, This year’s World Refugee Day affirms a fundamental tenet of our common humanity: everyone has the right to seek safety – whoever they are, wherever they come from, and whenever they are forced to flee.” বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান হারে নিরাপত্তাহীনতার কালে শরণার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে মূল প্রতিপাদ্য করে জাতিসংঘ একটি যথাযথ এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে আমি মনে করি। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ‘যে’, ‘যেখানে’ এবং ‘যখন’ শব্দ ত্রয়ের একটি সুন্দর ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। ইউএনএইচসিআর বলছে, যাকে জোর করে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে এবং যাকে নিজ দশে ছেড়ে অন্য দেশে শরণার্থী হতে বাধ্য করা হয়েছে, তাকে সম্মানের সাথে এবং ইজ্জতের সাথে ডিল করতে হবে। কেননা, কেউ স্বেচ্ছায় নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে না। তাছাড়া, নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে জীবনের নিরাপত্তা চাওয়া একজন মানুষের অধিকার এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার।

আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রাক্কালে এ ধরনের একটি প্রতিপাদ্য সত্যিই জরুরি। কেননা, আজ বিশ্বের প্রায় ৮৯.৩ মিলিয়ন মানুষকে জোর করে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। তন্মধ্যে জন্মস্থান ছেড়ে অন্য দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করেছে অর্থাৎ বর্তমানে বিশ্বে শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ২১.৩ মিলিয়ন আর প্যালেস্টাইনিয়ানসহ সর্বমোট শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৭.১ মিলিয়ন। আর বর্তমানে বিশ্বে স্টেটলেস তথা রাষ্ট্রবিহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০ মিলিয়ন। ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অনুমোদিত সর্বজনীন মানবাধিকার সনদের ঘোষণা অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের নাগরিকত্বের অধিকার আছে। তাহলে যে ১০ মিলিয়ন মানুষ আজ নাগরিকত্ব না-থাকার কারণে রাষ্ট্রবিহীন হিসেবে পরিচিত, তাদের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করা হয়েছে। রাষ্ট্রবিহীন মানুষ তো বটেই কিন্তু যাদের নাগরিকত্ব আছে কিন্তু নিজ দেশেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে, তারা যখন নিজের জীবন বাঁচাতে অন্য দেশের গিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং নিরাপত্তা প্রার্থনা করে, তখন তার নিরাপত্তা পাওয়াটা কোনও দয়া বা দাক্ষিণ্য নয়, বরং মানুষ হিসেবে এটা তার অধিকার। জাতিসংঘ ঘোষিত সর্বজনীন মানবাধিকার সদনের শর্ত অনুযায়ী একজন মানুষের যেকোনও দেশে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা তার অধিকার। এটাই আজকের বিশ্ব শরণার্থী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য।

যদিও বাংলাদেশ ১৯৫১ শরণার্থী কনভেনশনের অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র নয়, তথাপি বাংলাদেশ আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে পারে। কেননা, শরণার্থী সমস্যার একটা অন্যতম ভুক্তভোগী রাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রায় ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে একান্তই মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ এখন পড়েছে ত্রিমুখী সংকটে। একদিকে মিয়ানমার নানা তালবাহানা করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে প্রায় বন্ধ করে রেখেছে, যা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে তারা রোহিঙ্গাদের আন্তরিকতার সাথে স্বেচ্ছায় সে দেশে ফেরত নিতে চায় না। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে বাংলাদেশকে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় জনগণ রোহিঙ্গা উপস্থিতির কারণে উদ্ভূত নানা সমস্যার সাক্ষাৎ ভুক্তভোগী। তাছাড়া, রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণে বৈদেশিক সাহায্য ক্রমহ্রাসমান হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও একটা চাপ পড়ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশও রোহিঙ্গাদের আর রাখতে চাচ্ছে না। আবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশের আসে, তখন যে উত্তেজনা এবং উৎসাহ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করছিল, সেখানেও ক্রমান্বয়ে ভাটা পড়েছে। আফগান শরণার্থী সমস্যা এবং ইউক্রেনিয়ান শরণার্থী সমস্যা প্রভৃতি নিয়ে এরা এখন ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গুরুত্ব না-দিয়ে কীভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে রাখা যায় তা পরামর্শ দিচ্ছেন, যা বাংলাদেশ সরকার কোনোভাবেই গ্রহণ করছে না। এরকম একটি ত্রিমুখী সংকট নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব শরণার্থী দিবসে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে পারে। রোহিঙ্গাদের একান্তই মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষ কী রকম অমানবিক দুঃখ-কষ্টের শিকার হচ্ছে, এবং বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা উপস্থিতির কারণে কী কী ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে, সেটা যদি স্পষ্টভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা যায়, তাহলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এটা কাজে লাগতে পারে। যেহেতু রোহিঙ্গাদের বিপুল উপস্থিতির কারণে সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ, তাই বাংলাদেশকেই এই সংকটের কথা বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করতে হবে এবং বিশ্ব শরণার্থী দিবস তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হতে পারে। মনে রাখতে হবে, “বাচ্চা না-কাঁদতে নিজের মা-ও তাকে দুধ দেয় না”।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email