শেখ রাসেল সেনানিবাস; সেনাবাহিনীর ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিতঃ 11:06 pm | March 29, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:

বাঙালির জীবনের এক কঠিন অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারাবৃত সেই সময়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ঘর আলোকিত করে হেমন্তের জোৎস্না প্লাবিত রাতে জন্ম নিয়েছিলেন ছোট্ট শিশু শেখ রাসেল। নিজেও বেড়ে উঠছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের মতোই ধী-শক্তি নিয়েই। বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রাণভোমরার চোখের দ্যুতিতেই প্রকাশ পেয়েছিল দারুণ এক ব্যক্তিত্বের।

বাঙালির স্বপ্নপুরুষ বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ, সুন্দর তুলতুলে শিশুটির ইচ্ছা ছিল বড় মেয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। নিজের দু’সহোদর বড় ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামালের মতোই দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হবার। বঙ্গবন্ধু তাঁর চোখেই স্বপ্ন দেখতেন সোনার বাংলা বিনির্মাণের। কিন্তু ৭৫’র রক্তঝরা কালো রাতে ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নেয় সবার সঙ্গে তাঁরও প্রাণ। ঘাতকরা যখন গুলি করে তাকে হত্যা করে তখন তাঁর বয়স ছিল ১০ বছর।

পূরণ হয়নি শেখ রাসেলের সেনা কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন। চেতনার গভীরে চিরস্থায়ী দগদগে ক্ষত আর অন্তহীন বেদনার মহাকাব্য নিয়ে ফলত বারবার আক্ষেপ ঝরেছে বড় বোন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্ঠে। স্নেহ-মমতা আর শ্রদ্ধার মিশেলে অন্তরপূর্ণ স্বার্থক হৃদয়ে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর ভালোবাসার সারণিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বাঙালির মুক্তিদাতার কনিষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ রাসেলকে।

তাঁর নামেই শরিয়তপুরের জাজিরায় পথচলা শুরু হলো ‘শেখ রাসেল সেনানিবাস’-এর। মঙ্গলবার (২৯ মার্চ) গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে নিজের প্রাণোচ্ছ্বল ছোট ভাইয়ের নামে ‘শেখ রাসেল সেনানিবাস’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন।

উদ্বোধনের যাত্রাপথে স্বভাবতই আবেগাপ্লুত হয়েছেন। ভারী হয়েছে তাঁর কন্ঠস্বর। কলিতেই ঝরে যাওয়া ফুলের মায়াবী মুখের স্মৃতিঘেরা আঙিনায় সোনালী রোদ্দুরে শান্তির পরশ মেখেছেন। দেশপ্রেমের দৃঢ়তায় নির্মোহ বস্তুনিষ্ঠ, দিকনির্দেশনামূলক ও সুমিত ভাষায় জ্ঞানোদ্দীপক বক্তব্যে শক্তিশালী ও সক্ষম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কথা যেমন বলেছেন তেমনি দেশপ্রেমী বাহিনীটির সঙ্গে নিজের পরিবারের নিবিড়, অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের আলোকপাত করেছেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে শেখ রাসেলের নাম স্বর্ণালী আখরে যুক্ত করায় ধন্যবাদ জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমার দুই ভাইই তো আসলে সেনাবাহিনীর সদস্য ছিল (ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল)।

… সবার ছোট রাসেল তাকে আমরা হারিয়েছি। রাসেলের আকাঙ্ক্ষা ছিল সামরিক অফিসার হবে, হতে পারেনি। আমি সেনাবাহিনী প্রধান ও সদস্যদের ধন্যবাদ জানাই আজকে এই সেনানিবাসের নাম শেখ রাসেল সেনানিবাস রাখা হয়েছে। অন্তত তার আকাক্সক্ষা পূরণ না হলেও রাসেলের নামটা সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত থাকলো। ’

সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ‘শেখ রাসেল সেনানিবাস’ জাজিরা প্রান্তে উদ্বোধন ফলক উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্যও রাখেন। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর নিরাপত্তার জন্য মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে স্থাপিত হয়েছে এই সেনানিবাস। অনুষ্ঠানে পানি সম্পদ উপমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম এমপিসহ উর্ধ্বতন সামরিক-অসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বহি:শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ
কখনো যদি বাংলাদেশে বহি:শত্রুর আক্রমণ হয়, তা যথাযথভাবে প্রতিরোধ করতে সশস্ত্র বাহিনীকে সব সময় প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে, দেশ আরও উন্নত হবে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকে যে কোনো হুমকি- আমরা কারো সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই না, যুদ্ধ আমরা করবো না, জাতির পিতা আমাদের যে পররাষ্ট্র নীতি শিখিয়ে গেছেন ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ আমরা সেই নীতিতে বিশ্বাস করি। ’

কিন্তু আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কখনো যদি বহি:শত্রুর আক্রমণ হয় আমরা যেন তা যথাযথভাবে প্রতিরোধ করতে পারি এবং আমরা যেন আমাদের দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারি।’ শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়তে সরকারের নেওয়া কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীকে আমাদের আরও উন্নত-প্রশিক্ষিত, সমৃদ্ধশালী করার পদক্ষেপ নিয়েছি। আমি মনে করি আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর প্রজ্ঞা, পেশাগত দক্ষতা, কর্তব্য-নিষ্ঠা দিয়ে আমাদের দেশের সুনাম বৃদ্ধি করবে। ’

‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ এর আলোকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ্মা বহুমুখী সেতুকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই ব্রিগেড শেখ রাসেল সেনানিবাসের মাওয়া এবং জাজিরা প্রান্তে স্থানান্তরিত হয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তা বিধানে সফলভাবে আভিযানিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই সেনানিবাসের ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড ও অধীনস্থ ইউনিটগুলো নিরলসভাবে পরিশ্রম করে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। আজ শেখ রাসেল সেনানিবাস একটি পূর্ণাঙ্গ সেনানিবাস হিসেবে পরিণত হয়েছে, যেখানে সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য সব ধরনের প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক সুবিধা তৈরি করা হয়েছে।

‘শেখ রাসেল সেনানিবাস’ এর গুরুত্ব তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘এই টুকু বলবো শুধু এই নির্মাণ নয়, এই সেতুর বিধানও একান্ত ভাবে প্রয়োজন। আর সেই নিরাপত্তা বিধানের জন্যই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। যেহেতু দ্রুত শুরু হয়ে যাবে যান চলাচল, কাজেই সেতুর নিরাপত্তা একান্তভাবে অপরিহার্য। ’

নতুন এ সেনানিবাসের কারণে এ অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পদ্মা সেতুর সার্বিক নিরাপত্তা বিধান এবং সেনানিবাসের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষেরও সার্বিক উন্নয়ন হবে। কারণ আমাদের সশস্ত্র বাহিনী যেখানেই থাকুক, যেখানেই তাদের সেনানিবাস আছে সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকাগুলোতেও কিন্তু অনেক উন্নতি হয়। সেখানে স্কুল-কলেজ, চিকিৎসা কেন্দ্র বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে। আশাপাশের মানুষগুলোর আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। তারাও লাভবান হয়। ’

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে পদ্মা সেতু নির্মাণের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে সে পদ্মা সেতু আমরা নির্মাণ করেছি এবং তার কাজও প্রায় সম্পন্ন। জাতির কাছে কৃতজ্ঞ তাদের সাহসী ভূমিকা ও সমর্থন পেয়েছি বলেই এটা করা সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বন্ধুপ্রতিম দেশও আমাদের সমর্থন দিয়েছে।’

‘এই সেতু নির্মাণের ফলে আমি মনে করি আমাদের জিডিপিতে অন্তত আরও ১ ভাগ থেকে ২ ভাগ প্রবৃদ্ধি সংযুক্ত হবে। অর্থাৎ উন্নয়নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারবো সেটা আমি বিশ্বাস করি। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে আমাদের দক্ষিণ অঞ্চলের জেলাগুলো যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থারই শুধু উন্নতি হবে না, আর্থ-সামাজিক উন্নতিও হবে। তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা বা তাদের যোগাযোগ একটি সেতুর নির্মাণের মধ্যে দিয়ে একটা এলাকা উন্নত হয়। আজকে আমরা শতভাগ বিদ্যুৎ দিতে পেরেছি। আমরা প্রতিটি গৃহহারা মানুষকে ঘর তৈরি করে দিচ্ছি।’

কালের আলো/বিএস/পিএম

Print Friendly, PDF & Email