সেই এমপি বদির অবাক ‘কান্ড’!

প্রকাশিতঃ 11:06 am | April 14, 2020

কালের আলো প্রতিবেদক:

আলোচিত-সমালোচিত সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি আবারও আলোচনায় এসছেন এই করোনা সঙ্কটের সময়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সরকারের খোলা বাজারে (ওএমএস) ১০ টাকায় কেজির কক্সবাজার জেলার টেকনাফ পৌরসভার ৬ মেট্রিক টন চাল কিনে নিয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, পৌর এলাকার দুজন ডিলারের নিকট থেকে এ পরিমাণ চাল কিনে তিনি পরে বিতরণের ব্যবস্থা করে দেন। বাজারে যেখানে কেজি ৪০ টাকা সেই চালই তিনি কিনেছেন ১০ টাকা করে। দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য দেওয়া এমন জনবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণের এরকম ঘটনাকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক রাষ্ট্রের সঙ্গে এক প্রকারের ‘অনৈতিক কাজ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি প্রভাব খাটিয়ে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ইমরানুল হক এবং উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার নুরুল আবসারকে দিয়ে ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। এক্ষেত্রে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকেও অবহিত করা হয়নি।

গত কয়েক দিন ধরে টেকনাফ সীমান্তে সরকারের খাদ্য বিভাগের ১০ টাকা কেজির চাল বিক্রি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং টেকনাফ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলার নুরুল বাশার এ বিষয়ে অভিযোগ করেন যে, ‘সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি এখনো একজন বর্তমান এমপি’র মতো ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এলাকার নানা বিতর্কিত কাজ করে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয় কর্মসূচির ১০ টাকায় কেজি চাল সাবেক এমপি বদি নিজেই কিনে নিয়ে তাঁর নামে বিতরণ করছেন।’

আওয়ামী লীগ নেতা বাশার বলেন, ৬ হাজার কেজি চাল বাজার থেকে কিনতে গেলে কমপক্ষে কেজিতে ৪০ টাকা করে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা দরকার। সেই জায়গায় সাবেক এমপি বদি কেজিতে ১০ টাকা করে মাত্র ৬০ হাজার টাকায় সরকারি চাল কিনে নিজের নামে বিতরণ করে ‘জনসমর্থন’ আদায় করে নিয়েছেন। তিনি অভিযোগে আরো বলেন, বিগত ১০ বছর এমপি থাকাকালীন সময়ে তিনি সরকারের চাল এভাবেই নিজের তহবিলের নামে বিতরণ করে দল ও সরকারকে জনগণ থেকে ক্রমশ দূরে সরিয়েছেন।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন গতকাল সোমবার বিকালে বলেন ‘আমি এমন অভিযোগের বিষয়টির সত্যতা পেয়েছি। পৌর এলাকায় নিয়োজিত দুই ডিলারের নিকট থেকে সাবেক এমপি বদি চালগুলো নগদে কিনে পরে বিতরণ করেছেন। এটা করে তিনি সরকারি নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করেছেন।’

জেলা প্রশাসক বলেন, নিয়ম হচ্ছে আইডি কার্ড দেখিয়ে একটি পরিবার ৫ কেজি করে চাল কেজি প্রতি ১০ টাকা দরে কিনতে পারবেন। এতে করে একটি জনবান্ধব সরকার জনগণের সুবিধার্থে যে সুযোগ সুবিধাদি দিচ্ছে তা সরাসরি সাধারণ মানুষই উপলব্ধি করতে পারবে। অথচ সরকারের চাল সরকারি নিয়োজিত ডিলারকে এক সঙ্গে টাকা পরিশোধ করে সাবেক এমপি কর্তৃক জনগণের মাঝে বিতরণের উদ্দেশ্যটা কারো বুঝতে বাকি রইল না। যা কিনা সরকারের সঙ্গে এক প্রকারের ‘অনৈতিক কাজ’ ছাড়া আর কিছুই নয়- বলেন জেলা প্রশাসক। তিনি আরো বলেন, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ও নিয়োজিত ডিলারদ্বয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইতিমধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন- ‘জেলা প্রশাসক মহোদয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করতে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পাই। সাবেক এমপি ডিলারদ্বয়ের নিকট থেকে চালগুলো নিয়ে দুদিন আগেই বিতরণ করে দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে তার (ইউএনও) সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ না করায় এমন ঘটনাটা ঘটে গেছে।

এদিকে টেকনাফ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নুরুল আলম এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন- ‘আমি টেকনাফ পৌরসভার বাসিন্দা এবং টেকনাফ উপজেলা পরিষদের একজন নির্বাচিত চেয়ারম্যান। সরকারের এরকম খোলা বাজারে চাল বিক্রির মহৎ উদ্যোগের বিষয়টিও আমার নিকট গোপন রাখা হয়েছে।

এমন সুযোগে সাবেক এমপি সরকারি চাল নিজের টাকায় কিনে নিয়ে মানুষের কাছে বিতরণ করেছেন এমন একটা ভাব নিয়ে যা তিনি নিজের তহবিলের টাকায় দিচ্ছেন। অপরদিকে মোহাম্মদ শফিক নামের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারিকে সাবেক এমপি বদি প্রভাব খাটিয়ে ডিলার নিয়োগ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এসব বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মো. ইমরানুল হক নিশ্চিত করেন যে, নিয়োজিত ডিলার মোহাম্মদ শফিক ও মোহাম্মদ ফয়সালের নিকট থেকে বরাদ্দের ৬ মেট্রিক টন চাল সাবেক এমপি বদি নগদ টাকায় কিনে নিয়েছেন। ডিলার ফয়সাল বলেন, গত মঙ্গলবার, বৃহস্পতিবার ও রবিবার পৌর এলাকার ১২০০ উপকারভোগীর নিকট ৬ হাজার কেজি চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

কালের আলো/বিএম/ওআর

Print Friendly, PDF & Email